The Code of Criminal Procedure, 1898 অনুযায়ী সাক্ষীদের উপস্থিতিতে কোনো স্থানে তল্লাশী চালানোর সাধারণ বিধানসমূহ কী?

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২২: ফৌজদারি কার্যবিধি

প্রশ্ন: The Code of Criminal Procedure, 1898 অনুযায়ী সাক্ষীদের উপস্থিতিতে কোনো স্থানে তল্লাশি (Search in presence of witnesses) চালানোর সাধারণ আইনি বিধানসমূহ কি কি? জব্দতালিকা (Seizure List) প্রস্তুতের নিয়মাবলী ও সাক্ষ্যগত মূল্য বিশদভাবে লিখুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও তল্লাশি আইনের দর্শন

নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, বসতবাড়ির পবিত্রতা ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষার স্বার্থে পুলিশ বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের তল্লাশি ক্ষমতাকে কঠোর আইনি বিধিনিষেধের অধীনে রাখা হয়েছে। কোনো অসৎ পুলিশ কর্মকর্তা যাতে গোপনে কোনো ব্যক্তির ঘরে আলামত বা অস্ত্র রেখে দিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসাতে না পারে, সেজন্য নিরপেক্ষ স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তল্লাশি চালানো ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অন্যতম অলঙ্ঘনীয় রক্ষাকবচ।

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর ধারা ১০৩-এ এই সার্বজনীন পদ্ধতি বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।

২. ধারা ১০৩ অনুযায়ী তল্লাশির আবশ্যিক শর্তাবলী ও ধাপসমূহ

ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তল্লাশির সময় নিম্নলিখিত বিধিবদ্ধ নিয়মসমূহ নিখুঁতভাবে অনুসরণ করতে হয়:

  1. স্থানীয় গণ্যমান্য সাক্ষীদের আহ্বান (Calling Respectable Inhabitants – ধারা ১০৩(১)):
    • তল্লাশি পরিচালনার পূর্বে পুলিশ কর্মকর্তা যে এলাকায় তল্লাশি হবে, উক্ত এলাকার ২ (দুই) বা ততোধিক গণ্যমান্য ও নিরপেক্ষ অধিবাসীকে তল্লাশিতে উপস্থিত থেকে সাক্ষী থাকার জন্য লিখিত নির্দেশ বা আহ্বান জানাবেন।
    • আহ্বান সত্ত্বেও কোনো সাক্ষী যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া উপস্থিত হতে অস্বীকার করলে সে দণ্ডবিধির ১৮৭ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধী হবে।
  2. সাক্ষীদের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে তল্লাশি পরিচালনা (ধারা ১০৩(১)):
    • তল্লাশির প্রতিটি পদক্ষেপ সাক্ষীদের প্রত্যক্ষ চোখের সামনে পরিচালিত হতে হবে।
    • পুলিশ কর্মকর্তা বা তল্লাশিকারী দলের সদস্যদের নিজেদের দেহ পূর্বে সাক্ষীদের দ্বারা তল্লাশি করানো হয় যাতে কোনো পূর্বস্থাপিত আলামত নিয়ে ঘরে প্রবেশ না করা যায়।
  3. জব্দতালিকা প্রস্তুত ও স্বাক্ষর গ্রহণ (Preparation of Seizure List – ধারা ১০৩(২)):
    • তল্লাশিকালে উদ্ধারকৃত প্রতিটি বস্তু বা আলামতের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক জব্দতালিকা (Seizure List) প্রস্তুত করতে হবে।
    • উদ্ধারকৃত স্থান ও আলামতের ক্রমিক সংখ্যা উল্লেখ করে উক্ত জব্দতালিকায় উপস্থিত সাক্ষীদের স্বাক্ষর বা টিপসহি গ্রহণ করতে হবে।
    • তবে সাক্ষীদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে আদালতে নিয়মিত সাক্ষী হিসেবে তলব নাও করা হতে পারে, যদি না আদালত নির্দেশ দেন।
  4. দখলদারকে উপস্থিত থাকার অধিকার ও অনুলিপি প্রদান (ধারা ১০৩(৩)):
    • যে স্থানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে, উক্ত স্থানের দখলদার বা তার প্রতিনিধিকে তল্লাশির সময় উপস্থিত থাকার পূর্ণ অনুমতি দিতে হবে।
    • তল্লাশি শেষে প্রস্তুতকৃত জব্দতালিকার একটি সহি-স্বাক্ষরিত অনুলিপি অবিলম্বে উক্ত দখলদার বা মালিকের হাতে হস্তান্তর করতে হবে।

৩. ১০৩ ধারার ব্যতিক্রমসমূহ

১০৩ ধারা সাধারণত কোনো আবদ্ধ স্থান বা বসতবাড়ির (Closed place) তল্লাশির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। উন্মুক্ত স্থান (যেমন: রাস্তা, নদীর ঘাট, খেলার মাঠ) বা কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশির ক্ষেত্রে (ধারা ৫১) ১০৩ ধারার কঠোর শর্ত হুবহু প্রযোজ্য হয় না (ধারা ১০৩ আবদ্ধ স্থানের জন্য সুনির্দিষ্ট)।

৪. জব্দতালিকা ও তল্লাশির সাক্ষ্যগত মূল্য (Evidentiary Value)

আদালতে আলামত প্রমাণের ক্ষেত্রে জব্দতালিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক সাক্ষ্য:

  • সরাসরি মূল সাক্ষ্য নয়: জব্দতালিকা নিজে কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য নয়; এটি প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা বা জব্দতালিকার সাক্ষীদের মৌখিক সাক্ষ্যের দ্বারা আদালতে সমর্থিত ও প্রমাণিত হতে হয়।
  • ১০৩ ধারার ত্রুটির ফলাফল: যদি পুলিশ স্থানীয় সাক্ষীদের না ডেকে দূরবর্তী এলাকার সাক্ষী বা নিজস্ব ‘স্টক উইটনেস’ দিয়ে জব্দতালিকা তৈরি করে, তবে বিচার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না। তবে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায় এবং আদালত সন্দেহের সুবিধা (Benefit of doubt) আসামির অনুকূলে প্রদান করেন।

৫. উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী নজিরসমূহ

  • মোফাজ্জল হোসেন বনাম রাষ্ট্র (42 DLR 214): হাইকোর্ট বিভাগ সুস্পষ্টভাবে রায় দেন যে, ১০৩ ধারার বিধান নিছক কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা নয়; নিরপেক্ষ স্থানীয় সাক্ষীদের বাদ দিয়ে তল্লাশি চালালে উদ্ধারের সত্যতা সন্দেহাতীতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
  • আয়নাল হক বনাম রাষ্ট্র (53 DLR 122): জব্দতালিকার সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে রাষ্ট্রপক্ষের অবহেলা এবং জব্দতালিকায় বৈপরীত্য আসামির খালাস পাওয়ার শক্তিশালী ভিত্তি।

৬. উপসংহার

সারসংক্ষেপে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা হলো তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার একটি প্রধান আইনি হাতিয়ার। তল্লাশি ও জব্দতালিকা আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে সম্পাদন করাই প্রসিকিউশনের মামলা প্রমাণের প্রধান সোপান।

৪. ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার অপরিহার্য উপাদান ও জব্দতালিকার সংবিধিবদ্ধ নিয়মাবলী

তল্লাশি ও মালামাল জব্দ করার স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা অনুযায়ী পুলিশ বা তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নিম্নোক্ত কঠোর নিয়মাবলী অনুসরণ করতে হবে:

  • এলাকার গণ্যমান্য সাক্ষী (Respectable Inhabitants of the Locality): তল্লাশি শুরুর পূর্বেই সংশ্লিষ্ট এলাকার অন্তত দুইজন বা ততোধিক নিরপেক্ষ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানাতে হবে;
  • সাক্ষীদের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি: তল্লাশির পুরো প্রক্রিয়াটি সাক্ষীদের প্রত্যক্ষ দৃষ্টির সামনে সম্পন্ন হতে হবে; কোনো গোপন তল্লাশি গ্রহণযোগ্য নয়;
  • জব্দতালিকা প্রস্তুত ও স্বাক্ষর (Seizure List): উদ্ধারকৃত সকল মালামালের সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে তাতে সাক্ষীদের স্বাক্ষর বা টিপসহি গ্রহণ করতে হবে;
  • অনুলিপি হস্তান্তর: তল্লাশিকৃত স্থানের মালিক বা দখলদারকে উক্ত প্রস্তুতকৃত জব্দতালিকার একটি অনুলিপি অবিলম্বে বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে (উপধারা ৩)।

৫. ১০৩ ধারার ব্যত্যয়ের সাক্ষ্যিক প্রভাব ও সুপ্রিম কোর্টের অনুশাসন

পুলিশ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে স্থানীয় সাক্ষীদের না ডেকে কেবল নিজেদের পুলিশ সদস্যদের সাক্ষী রেখে তল্লাশি চালায়, তবে উক্ত উদ্ধার কার্যক্রম অত্যন্ত সন্দেহজনক হয়ে পড়ে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ (রাষ্ট্র বনাম মোতালেব, 52 DLR 215) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, ১০৩ ধারার বিধানাবলী আনুষ্ঠানিক কোনো বিষয় নয়, এটি নাগরিকের গৃহ ও সম্পত্তির সুরক্ষায় আইনের মৌলিক সুরক্ষা; যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা ছাড়া স্থানীয় নিরপেক্ষ সাক্ষীর অনুপস্থিতিতে উদ্ধারকৃত আলামতের ভিত্তিতে আসামিকে সাজা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ।

৬. তল্লাশিকালে বলপ্রয়োগ ও মহিলাদের সম্মান রক্ষার সংবিধিবদ্ধ সুরক্ষা (ধারা ১০২ ও ৪৮)

ফৌজদারি কার্যবিধির ১০২ ও ৪৮ ধারা অনুযায়ী তল্লাশি পরিচালনাকালে যদি কোনো আবদ্ধ গৃহে এমন কোনো মহিলা অবস্থান করেন যিনি পর্দা রক্ষা করে চলেন, তবে পুলিশ বা তল্লাশিকারীকে উক্ত গৃহের দরজা ভেঙে প্রবেশের পূর্বে উক্ত মহিলাকে সেখান থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার পর্যাপ্ত নোটিশ ও সুযোগ প্রদান করতে হবে। তল্লাশির নামে কোনো নাগরিকের মানবিক মর্যাদা ও গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ণ করা যাবে না।

Related Articles

Back to top button