সৃজনশীল প্রশ্নঃ বার কাউন্সিল ২০২২ লিখিত
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২২: পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার
সৃজনশীল সমস্যাভিত্তিক প্রশ্ন: ‘M’, একজন প্র্যাকটিসিং আইনজীবী, স্থানীয় থানার ওসির সাথে এই মর্মে চুক্তি করেন যে, থানায় যত আসামি গ্রেপ্তার হয়ে আসবে তাদেরকে ‘M’-এর চেম্বারে পাঠালে ফি বাবদ আয়ের অর্ধেক উক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে কমিশন হিসেবে প্রদান করবেন। ‘M’-এর এই অনৈতিক আচরণের ফলে আপনার আইন পেশা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় The Canons of Professional Conduct and Etiquette অনুযায়ী ‘M’-এর অপরাধ ও দায় বিশ্লেষণ করুন এবং বার কাউন্সিলে দাখিলের জন্য একটি নালিশী দরখাস্ত মুসাবিদা প্রস্তুত করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও ক্যাননসের সরাসরি লঙ্ঘন
আইন পেশা মেধা, সততা ও যোগ্যতার ওপর প্রতিষ্ঠিত; কোনো প্রকার দালালি বা বাণিজ্যিক কমিশন বাণিজ্যের ওপর নয়। ‘M’-এর কৃত আচরণটি আইন পেশার পবিত্রতা ধ্বংসকারী এবং The Canons of Professional Conduct and Etiquette-এর একাধিক বিধির চরম লঙ্ঘন:
- দালাল বা অসদুপায়ে মক্কেল সংগ্রহ নিষিদ্ধ (Chapter II, Rule 15): বিধি ১৫ অনুযায়ী কোনো আইনজীবী বিজ্ঞাপন, প্রচারপত্র, দালাল (Touters) বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে মক্কেল শিকার বা ওকালতনামা সংগ্রহ করতে পারবেন না। পুলিশের মাধ্যমে মক্কেল পাঠানো সরাসরি দালাল প্রথার অন্তর্ভুক্ত।
- আইনজীবী ছাড়া অন্য কারো সাথে ফি ভাগাভাগি নিষিদ্ধ (Chapter II, Rule 16): বিধি ১৬ অনুযায়ী কোনো আইনজীবী তার পেশাগত অর্জিত ফি কোনো পুলিশ অফিসার, দালাল বা অ-আইনজীবীর সাথে ভাগাভাগি (Fee sharing) করতে পারবেন না।
- পেশাগত অসদাচরণ (Professional Misconduct): The Bar Council Order, 1972-এর অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী এই রূপ আচরণ চরম পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে গণ্য।
২. সংক্ষুব্ধ আইনজীবীর আইনি পদক্ষেপ ও অধিকার
যেহেতু ‘M’-এর এই অবৈধ সিন্ডিকেটের কারণে সৎ আইনজীবীদের স্বাধীন পেশা ও জীবিকা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেহেতু The Bar Council Order, 1972-এর অনুচ্ছেদ ৩২ ও ৩৩ অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ আইনজীবী হিসেবে মহামান্য বার কাউন্সিলে অভিযোগ দাখিল করার পূর্ণ আইনি অধিকার রয়েছে। বার কাউন্সিল অভিযোগটি আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করবে এবং অনুচ্ছেদ ৩৪ অনুযায়ী ‘M’-এর সনদ স্থায়ীভাবে বাতিল হতে পারে।
৩. বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে নালিশী দরখাস্তের আনুষ্ঠানিক মুসাবিদা (Complaint Draft)
বরাবর,
মাননীয় চেয়ারম্যান ও সচিব মহোদয়
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, বার কাউন্সিল ভবন, ঢাকা।
অভিযোগকারী:
অ্যাডভোকেট এক্স, পিতা- মৃত ওয়াই, সদস্য, জেলা আইনজীবী সমিতি, ঢাকা।
-বনাম-
অভিযুক্ত আইনজীবী:
অ্যাডভোকেট ‘M’, পিতা- জেড, সদস্য, জেলা আইনজীবী সমিতি, ঢাকা।
The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972-এর Article 32 ও 33 এবং Canons of Professional Conduct-এর Chapter II, Rules 15 ও 16 লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নালিশী দরখাস্ত।
বিনীত নিবেদন এই যে—
১. অভিযোগকারী বিগত ১০ বছর যাবৎ ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে সুনামের সহিত পেশাগত সততা বজায় রেখে আইন ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।
২. অভিযুক্ত অ্যাডভোকেট ‘M’ একই বারের সদস্য হয়েও অত্যন্ত অসৎ ও অনৈতিক উদ্দেশ্যে স্থানীয় কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে গোপন অবৈধ চুক্তি করেছেন। চুক্তি অনুযায়ী থানায় গ্রেপ্তার হওয়া সকল আসামিকে জোরপূর্বক ‘M’-এর চেম্বারে পাঠানো হয় এবং মক্কেলদের নিকট হতে গৃহীত ফি-র ৫০% পুলিশ অফিসারকে কমিশন হিসেবে প্রদান করা হয়।
৩. অভিযুক্তের উক্তরূপ অনৈতিক দালাল নির্ভর কার্যক্রমের প্রত্যক্ষ প্রমাণ ও অডিও রেকর্ড অভিযোগকারীর নিকট সংরক্ষিত রয়েছে। অভিযুক্তের এহেন আচরণের ফলে অত্র বারের সৎ আইনজীবীদের সাধারণ প্র্যাকটিস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সমগ্র আইনজীবী সমাজের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।
৪. অভিযুক্তের এই কাজ Canons of Professional Conduct-এর ১৫ ও ১৬ বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং চরম পেশাগত অসদাচরণ (Professional Misconduct)।
অতএব বিনীত প্রার্থনা:
মাননীয় বার কাউন্সিল সদয় হয়ে উক্ত নালিশী দরখাস্তটি গ্রহণপূর্বক বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করে অভিযুক্ত অ্যাডভোকেট ‘M’-এর সনদ সাময়িক স্থগিত ও চূড়ান্ত শুনানিশেষে সনদ স্থায়ীভাবে বাতিল করার আদেশ দানে মর্জি হয়।
তারিখ: ২০/১০/২০২২ ইং
বিনীত নিবেদক
অ্যাডভোকেট এক্স
৪. উচ্চ আদালতের নজির
- বার কাউন্সিল বনাম অ্যাডভোকেট বশির আহমেদ (45 DLR (AD) 88): দালাল নিয়োগ করে বা সরকারি কর্মকর্তাদের অন্যায্য আর্থিক সুবিধা দিয়ে মক্কেল শিকার আইন পেশার অস্তিত্বের পরিপন্থী। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সনদ বাতিল আইনসঙ্গত।
৫. উপসংহার
সংক্ষেপে, ‘M’-এর পুলিশ নির্ভর সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্য আইন পেশার মূল নীতি ধ্বংস করে। ক্যাননসের বিধান মতে এটি অমার্জনীয় অসদাচরণ এবং বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়েরের মাধ্যমে তার পেশাগত সনদ বাতিল নিশ্চিত করাই একমাত্র আইনি প্রতিকার।
৪. বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের বিচারিক ক্ষমতা ও কার্যপদ্ধতি (অনুচ্ছেদ ৩৪-৩৬)
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল দেওয়ানি আদালতের সমান মর্যাদাসম্পন্ন একটি বিচারিক ফোরাম। কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ট্রাইব্যুনাল নিম্নোক্ত সংবিধিবদ্ধ দণ্ডাদেশ প্রদান করতে পারেন:
- আইনজীবীকে আনুষ্ঠানিক তিরস্কার বা সতর্কীকরণ (Reprimand);
- নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য তার ওকালতি সনদ ও আইন পেশা অনুশীলন স্থগিত (Suspension) করা;
- স্থায়ীভাবে তার নাম আইনজীবীদের তালিকা থেকে কর্তন এবং ওকালতি সনদ চিরতরে বাতিল (Removal from Roll);
- ট্রাইব্যুনাল তার কার্যধারা পরিচালনার জন্য সাক্ষী তলব, শপথ পাঠ ও দলিল উপস্থাপনে দেওয়ানি কার্যবিধির ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।
৫. ট্রাইব্যুনালের আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিলের বিধান (Article 34(2))
বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের রায়ে কোনো আইনজীবী সংক্ষুব্ধ হলে তিনি রায় ঘোষণার ৯০ দিনের মধ্যে মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আপিল দায়ের করতে পারেন। সুপ্রিম কোর্ট (বার কাউন্সিল বনাম মোজাম্মেল হক, 47 DLR 210) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, পেশাগত সততা রক্ষা বিচার বিভাগের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানিকালে হাইকোর্ট বিভাগ সাক্ষ্য-প্রমাণ স্বাধীনভাবে পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।
৬. বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের রিভিউ এখতিয়ার (Review Jurisdiction)
বার কাউন্সিল অর্ডার ও রুলস অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল দেওয়ানি আদালতের মতো নিজ রায়ের পুনর্বিবেচনা বা রিভিউ করতে পারেন। যদি রায়ের পর এমন কোনো নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবিষ্কৃত হয় যা পূর্বে জানা সম্ভব ছিল না, তবে সংক্ষুব্ধ আইনজীবী ৯০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের নিকট রিভিউ আবেদন করতে পারেন। তবে রিভিউ খারিজ হলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগেই চূড়ান্ত আপিল দায়ের করতে হয়।
📌 সম্পর্কিত আইনি প্রস্তুতি ও সহায়িকা লিংক:
- ২০২২ সালের বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ মডেল সমাধান দেখুন
- বার কাউন্সিল রুলস ও প্রফেশনাল এথিক্স সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও আইনি আলোচনা
- বার কাউন্সিল ও জুডিশিয়ারি বার কাউন্সিল রুলস ও প্রফেশনাল এথিক্স অনলাইন মডেল টেস্ট দিন
- বার কাউন্সিল বিগত সকল লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংক ও ১০০% পূর্ণাঙ্গ সমাধান ব্যাংক
