দলিলের সংজ্ঞা এবং দলিলের বিষয়বস্তু প্রমাণের পদ্ধতি (Evidence Act Sections 3, 61-65) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০
📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | সাক্ষ্য আইন
প্রশ্ন ৮। (খ): The Evidence Act, 1872 অনুযায়ী দলিলের সংজ্ঞা দিন এবং দলিলের বিষয়বস্তু প্রমাণের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করুন।
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
বিচারিক আদালতে যেকোনো দেওয়ানী বা ফৌজদারি বিরোধ নিষ্পত্তিতে দালিলিক সাক্ষ্য (Documentary Evidence) অত্যন্ত সুদৃঢ় ও অগ্রগণ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ৩ ধারায় দলিলের একটি অত্যন্ত ব্যাপক ও আধুনিক সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। একইসাথে দলিলের বিষয়বস্তু প্রমাণের জন্য আইন নির্দিষ্ট পদ্ধতি (Mode of proof) নির্ধারণ করে দিয়েছে। অত্র প্রশ্নের লক্ষ্য হলো দলিলের আইনি সংজ্ঞা এবং ধারা ৬১ থেকে ৬৫ অনুযায়ী তা প্রমাণের সার্বিক পদ্ধতি বিশদভাবে আলোচনা করা।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী
- The Evidence Act, 1872:
- Section 3: দলিলের সংজ্ঞা (Interpretation Clause – Document)।
- Section 61: দলিলের বিষয়বস্তু প্রাথমিক বা গৌণ সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণের নিয়ম (Proof of contents of documents)।
- Section 62: প্রাথমিক সাক্ষ্য (Primary Evidence)।
- Section 63: গৌণ সাক্ষ্য (Secondary Evidence)।
- Section 64: সাধারণ নিয়ম—প্রাথমিক সাক্ষ্য দ্বারাই দলিল প্রমাণ করতে হবে।
- Section 65: যেসব ক্ষেত্রে গৌণ সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য (Cases in which secondary evidence may be given)।
৩. দলিলের সংজ্ঞা ও বিষয়বস্তু প্রমাণের পদ্ধতি
ক. দলিলের আইনগত সংজ্ঞা (Section 3):
The Evidence Act, 1872-এর ৩ ধারা অনুযায়ী: “দলিল বলতে বোঝায় এমন কোনো বিষয়, যা কোনো পদার্থের ওপর অক্ষর, অঙ্ক বা চিহ্নের সাহায্যে অথবা একাধিক উপায়ে এমনভাবে প্রকাশ বা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যা কোনো বিষয়কে নথিভুক্ত বা স্মরণীয় রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে।”
দৃষ্টান্ত: লেখার কাগজ, মুদ্রণ, লিথোগ্রাফি বা ফটোগ্রাফ; মানচিত্র বা নকশা; ধাতব পাত্র বা পাথরের ওপর খোদাই করা লেখা; ব্যঙ্গচিত্র (Caricature); এবং আধুনিক ব্যাখ্যানুযায়ী ইলেকট্রনিক রেকর্ড, অডিও-ভিডিও ক্লিপ ও ডিজিটাল ডেটা সবই আইনত ‘দলিল’।
খ. দলিলের বিষয়বস্তু প্রমাণের দুটি পদ্ধতি (Section 61):
সাক্ষ্য আইনের ৬১ ধারা অনুসারে দলিলের বিষয়বস্তু কেবল দুটি উপায়ে প্রমাণ করা যায়: (১) প্রাথমিক সাক্ষ্য দ্বারা, অথবা (২) গৌণ সাক্ষ্য দ্বারা।
- ১. প্রাথমিক সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণ (Primary Evidence – Section 62):
প্রাথমিক সাক্ষ্য হলো মূল দলিলটি (Original document) স্বয়ং আদালতের পরিদর্শনের জন্য উপস্থাপন করা। আইনের সাধারণ ও সার্বজনীন নীতি হলো—দলিল অবশ্যই মূল দলিল দ্বারা প্রমাণ করতে হবে (Section 64)। এটি হলো Best Evidence Rule-এর প্রতিফলন। - ২. গৌণ সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণ (Secondary Evidence – Section 63):
যেখানে মূল দলিল উপস্থাপন অসম্ভব, সেখানে আইনের অনুমতিক্রমে বিকল্প সাক্ষ্য দেওয়া যায়। গৌণ সাক্ষ্য বলতে বোঝায়:
(ক) সার্টিফাইড বা সইমোহরী নকল;
(খ) মূল দলিল থেকে যান্ত্রিক উপায়ে তৈরি কপি (যেমন ফটোকপি) এবং তার সাথে মিলিয়ে দেখা কপি;
(গ) মূল থেকে তৈরিকৃত অনুলিপি;
(ঘ) কোনো দলিল নিজে দেখেছেন এমন ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত মৌখিক বিবরণ।
গ. যেসব ক্ষেত্রে গৌণ সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য (Section 65-এর ৭টি ক্ষেত্র):
ধারা ৬৪-এর সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবে ধারা ৬৫-তে ৭টি ক্ষেত্রে গৌণ সাক্ষ্য প্রদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে:
- (১) মূল দলিলটি প্রতিপক্ষ বা আদালতের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তির দখলে থাকলে এবং নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও সে তা উপস্থাপন না করলে।
- (২) মূল দলিলের অস্তিত্ব বা বিষয়বস্তু প্রতিপক্ষ লিখিতভাবে স্বীকার করে নিলে।
- (৩) মূল দলিলটি হারিয়ে গেলে, পুড়ে গেলে বা ধ্বংস হয়ে গেলে (বা বাদীর নিজস্ব দোষ ছাড়া উপস্থাপন অসম্ভব হলে)।
- (৪) মূল দলিলটি সহজে স্থানান্তরযোগ্য না হলে (যেমন দেয়ালে বা পাথরে খোদাই করা)।
- (৫) মূল দলিলটি কোনো সরকারি নথি বা পাবলিক ডকুমেন্ট হলে (Section 74)।
- (৬) যে দলিলের সার্টিফাইড কপি আইনত গ্রহণযোগ্য।
- (৭) মূল দলিলটি অসংখ্য হিসাবের বহি বা জটিল ভাউচার সম্বলিত হলে যা সহজে আদালতে পরীক্ষা করা যায় না।
৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির
- হাফেজ আহমেদ বনাম আব্দুল কুদ্দুস, ৪৭ ডিএলআর (এডি) ১৪১: আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, মূল দলিল নষ্ট বা হারিয়ে যাওয়ার সন্তোষজনক প্রমাণ না দিয়ে কোনো পক্ষ সরাসরি ফটোকপি বা গৌণ সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে ডিক্রি পেতে পারে না।
- রমেশ চন্দ্র বনাম রাজ্য, এআইআর ১৯৬২ সুপ্রিম কোর্ট ১৭২৩: সর্বোৎকৃষ্ট সাক্ষ্যের নীতি (Best Evidence Rule) দলিলের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রযোজ্য; প্রাথমিক সাক্ষ্যই ভিত্তি, গৌণ সাক্ষ্য হলো নিয়ন্ত্রিত ব্যতিক্রম।
৫. উপসংহার
দালিলিক সাক্ষ্য দেওয়ানী ও ফৌজদারি বিচারে অলঙ্ঘনীয় স্থান অধিকার করে আছে। সাক্ষ্য আইনের ধারা ৬১ থেকে ৬৫-এর বিধানাবলি মেনে দলিলের সত্যতা ও বিষয়বস্তু প্রমাণ করাই আদালতের সামনে কোনো দাবি প্রতিষ্ঠার একমাত্র আইনানুগ পথ।
৪.১. দলিলের বিষয়বস্তু প্রমাণের পদ্ধতি: মুখ্য বনাম গৌণ সাক্ষ্য (ধারা ৬১-৬৫)
সাক্ষ্য আইনের ৬১ ধারা অনুযায়ী দলিলের বিষয়বস্তু মুখ্য সাক্ষ্য (Primary Evidence) অথবা গৌণ সাক্ষ্য (Secondary Evidence) দ্বারা প্রমাণ করতে হয়:
- মুখ্য সাক্ষ্য (ধারা ৬২): মূল দলিলটি স্বয়ং আদালতে উপস্থাপন করা; এটি প্রমাণের সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম;
- গৌণ সাক্ষ্য (ধারা ৬৩ ও ৬৫): সার্টিফাইড কপি, মূল থেকে যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তৈরি কপি বা ফটোকপি; মূল দলিল বিনষ্ট হলে বা প্রতিপক্ষ নোটিশ সত্ত্বেও হাজির না করলে আদালত ৬৫ ধারায় গৌণ সাক্ষ্য গ্রহণের অনুমতি দেন;
- সুপ্রিম কোর্ট (আব্দুল মজিদ বনাম রাষ্ট্র, 47 DLR 332) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, গৌণ সাক্ষ্য দাখিলের পূর্বে মূল দলিলের ধ্বংস বা অনুপস্থিতির ভিত্তি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক।
৪.২. সরকারি দলিল বনাম বেসরকারি দলিলের প্রমাণের পদ্ধতি (ধারা ৭৪-৭৮)
সরকারি দলিল যেমন— আদালতের রায়, ডিক্রি, নামজারি খতিয়ান ইত্যাদি সাক্ষ্য আইনের ৭৪ ধারা মতে সরকারি কর্মকর্তা কর্তৃক সত্যায়িত সার্টিফাইড কপির মাধ্যমে সরাসরি আদালতে প্রমাণ করা যায় (ধারা ৭৬/৭৭); কিন্তু বেসরকারি দলিলের ক্ষেত্রে মূল দলিলের সম্পাদন প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক।

