সুনির্দিষ্ট প্রতিকারের পদ্ধতি, স্থাবর চুক্তি বলবৎকরণের শর্ত ও বিকল্প প্রতিকার (SRA Sec 5, 12, 19) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০
📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন
প্রশ্ন ৩। (ক): The Specific Relief Act, 1877 এর অধীনে মঞ্জুরযোগ্য বিভিন্ন প্রকার সুনির্দিষ্ট প্রতিকার সংক্ষেপে বর্ণনা করুন। স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তি সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎ করার প্রতিকার পেতে হলে কোন কোন শর্ত পূরণ করতে হবে? এ ধরণের মোকদ্দমায় কী কী সুনির্দিষ্ট প্রতিকার বিকল্প হিসেবে প্রার্থনা করা যায়?
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (The Specific Relief Act, 1877)-এর মূল উদ্দেশ্য হলো অধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ করা এবং পক্ষগণ প্রকৃতপক্ষে যে অধিকার পাওয়ার যোগ্য তা হুবহু বাস্তবায়ন করা। সাধারণ আইনের মতো কেবল ক্ষতিপূরণ না দিয়ে নির্দিষ্ট বস্তু বা কর্ম সম্পাদন নিশ্চিত করাই এর দর্শন। অত্র প্রশ্নে আইনে বর্ণিত ৫ প্রকার প্রতিকার, স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তি বলবৎকরণের আবশ্যিক শর্ত এবং এই মোকদ্দমায় প্রার্থিত বিকল্প প্রতিকারসমূহ বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়েছে।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী
- The Specific Relief Act, 1877:
- Section 5: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার প্রদানের ৫টি পদ্ধতি (Modes of granting specific relief)।
- Section 12: যেসব ক্ষেত্রে চুক্তি সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎ করা যায়।
- Section 19: চুক্তি বলবৎকরণের পাশাপাশি বা বিকল্প হিসেবে ক্ষতিপূরণ মঞ্জুরির ক্ষমতা।
- Section 22: চুক্তি বলবৎকরণ আদালতের একচ্ছত্র নয়, বরং সুবিবেচনামূলক ক্ষমতা (Discretionary power)।
- Section 29: চুক্তিভঙ্গের ক্ষতিপূরণের মামলা বারিত হওয়া।
৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা
ক. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার প্রদানের ৫টি পদ্ধতি (Section 5):
- দখল গ্রহণ ও অর্পণ (Taking possession and delivering): বিরোধীয় সম্পত্তির দখল দাবিদারের অনুকূলে সমর্পণ করা (ধারা ৮, ৯, ১০, ১১)।
- বাধ্যতামূলক আদেশ (Ordering the party to do the act): যে পক্ষ যা সম্পাদন করতে বাধ্য, তাকে তা করার সরাসরি নির্দেশ প্রদান করা (যেমন চুক্তি বলবৎকরণ – ধারা ১২)।
- নিষেধাজ্ঞা আদেশ (Preventing the party from doing an act): কোনো পক্ষকে অন্যায় বা চুক্তিভঙ্গমূলক কাজ করা থেকে বিরত রাখা (নিরোধক প্রতিকার বা নিষেধাজ্ঞা – ধারা ৫২-৫৭)।
- স্বত্ব ঘোষণা (Determining and declaring rights): অধিকার বা মর্যাদা ঘোষণা করা (ঘোষণামূলক ডিক্রি – ধারা ৪২, ৪৩)।
- রিসিভার নিয়োগ (Appointing a Receiver): সম্পত্তি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য রিসিভার নিয়োগ করা (ধারা ৪৪)।
খ. স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তি বলবৎ করার শর্তাবলি (Conditions under Section 12):
স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তি (বা বায়না চুক্তি) সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎ করাতে হলে বাদীকে নিম্নলিখিত শর্তসমূহ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে:
- বৈধ ও বলবৎযোগ্য চুক্তি: পক্ষগণের চুক্তি সম্পাদনের যোগ্যতা, স্বেচ্ছাসম্মতি ও বৈধ পণ বিদ্যমান থাকতে হবে।
- রেজিস্ট্রিকৃত বায়না চুক্তি: সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৪এ ধারা এবং রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭এ ধারা মতে বায়নাপত্র অবশ্যই রেজিস্ট্রি হতে হবে।
- আর্থিক ক্ষতিপূরণ অপর্যাপ্ত (No standard for ascertaining damage): স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত চুক্তিভঙ্গের ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতিপূরণ পর্যাপ্ত প্রতিকার নয়—এই সংবিধিবদ্ধ অনুমান আদালত গ্রহণ করেন (Explanation to Section 12)।
- বাদীর প্রস্তুতি ও আন্তরিকতা (Ready and Willing): বাদী চুক্তির শর্ত পালনে (অবশিষ্ট মূল্য পরিশোধে) সর্বদাই প্রস্তুত ও ইচ্ছুক ছিলেন (Ready and willing to perform his part of the contract)।
- তামাদির মধ্যে মামলা দায়ের: তামাদি আইনের ১১৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মামলা দায়েরের নির্ধারিত ১ বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে।
গ. বায়না চুক্তি বলবৎকরণের মোকদ্দমায় বিকল্প প্রতিকারসমূহ:
The Specific Relief Act, 1877-এর ধারা ১৯ ও দেওয়ানী কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী বাদী মূল প্রতিকারের পাশাপাশি বিকল্প প্রতিকার (Alternative Relief) প্রার্থনা করতে পারেন:
- বায়নার টাকা ফেরত ও ক্ষতিপূরণ (Refund of earnest money with compensation): যদি কোনো কারণে আদালত চুক্তি বলবৎ না করেন, তবে প্রদত্ত বায়নার অর্থ সুদসহ ফেরত এবং চুক্তিভঙ্গের ক্ষতিপূরণ।
- চুক্তি রদকরণ (Rescission of Contract – Section 35): চুক্তিটি বাতিল ঘোষণা ও পক্ষদের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
- চিরস্থায়ী বা অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা: মামলা নিষ্পত্তির পূর্বে বিবাদী যাতে সম্পত্তি তৃতীয় পক্ষের নিকট হস্তান্তর বা কোনো রূপ পরিবর্তন না করে তার নিষেধাজ্ঞা।
৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির
- আব্দুল হামিদ বনাম মমতাজুল হক, ৪২ ডিএলআর (এডি) ২০৫: বায়না চুক্তি বলবৎকরণে বাদীর “Ready and willing” থাকা একটি মৌলিক পূর্বশর্ত। বাদী যদি চুক্তির নির্ধারিত সময় অবশিষ্ট টাকা পরিশোধে অপারগ বা নিষ্ক্রিয় থাকেন, তবে আদালত চুক্তি বলবৎ করতে অস্বীকার করতে পারেন।
- হাজী আব্দুর রহমান বনাম জহিরুল ইসলাম, ৪৮ ডিএলআর (এডি) ১৫৪: স্থাবর সম্পত্তির চুক্তিভঙ্গে আর্থিক ক্ষতিপূরণ কখনোই সমতুল্য বিকল্প হতে পারে না; তবে আদালতের সুবিবেচনামূলক ক্ষমতাবলে উপযুক্ত ক্ষেত্রে বিকল্প ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর করা যায়।
৫. উপসংহার
স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তি বলবৎকরণে আদালত ন্যায়পরায়ণতা, সততা এবং পক্ষগণের আচরণ পর্যালোচনা করে ডিক্রি প্রদান করেন। বাদীকে অবশ্যই স্বচ্ছ হস্তে আদালতে আসতে হয় এবং বিকল্প প্রতিকারের প্রার্থনা অন্তর্ভুক্ত রাখা বিচক্ষণ দেওয়ানী কৌশলের পরিচায়ক।
৪.১. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৫, ১২ ও ১৯ ধারার বিচারিক সমন্বয়
স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত চুক্তি বলবৎকরণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালতের বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নরূপ:
- চুক্তি বলবৎকরণ আদালতের একটি বিবেচনামূলক প্রতিকার (ধারা ২২); তবে স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে আইন অনুমান করে যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ পর্যাপ্ত নয় (ধারা ১২);
- ধারা ১৯ (বিকল্প ক্ষতিপূরণ): বাদী আরজিতে চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে ক্ষতিপূরণ ও প্রদত্ত বায়নার টাকা সুদে-আসলে ফেরত দাবি করবেন;
- সুপ্রিম কোর্ট (শামসুল হক বনাম রফিকুল ইসলাম, 54 DLR 110) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, আরজিতে ক্ষতিপূরণ চাওয়া না থাকলে আদালত স্বউদ্যোগে ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর করতে পারেন না; তাই ড্রাফটিংয়ে ধারা ১৯ অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য।
আইনি সিদ্ধান্ত: সুতরাং, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৫, ১২ ও ১৯ ধারার সঠিক সমন্বয় সাধন করে আরজিতে যুগপৎ চুক্তি বলবৎ ও বিকল্প ক্ষতিপূরণের প্রার্থনা অন্তর্ভুক্ত করা দেওয়ানি মোকদ্দমা পরিচালনার এক অবিসংবাদিত কৌশল।
