পূবালী ব্যাংকের ডিক্রী কার্যকর নিলাম থেকে সন্তানদের নামে সম্পত্তি খরিদ: পেশাগত অসদাচরণ বিশ্লেষণ | বার কাউন্সিল লিখিত ২০১২

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১২: পেশাগত আচরণবিধি ও ক্যাননস অব কন্ডাক্ট

প্রশ্ন: ১৮ পূবালী ব্যাংকের পক্ষে একজন আইনজীবী অর্থ ঋণ আদালত হতে একটি বন্ধকী সম্পত্তির নিলাম বিক্রয়ের ডিক্রি লাভ করেন। উক্ত ডিক্রি কার্যকরীকরণ নিলামে আইনজীবী নিজে প্রকাশ্যে দরপত্র দাখিল না করিয়া তাহার অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের নামে বেনামিতে উক্ত নিলাম সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে খরিদ করেন। উক্ত আইনজীবীর এই রূপ আচরণ কি পেশাগত অসদাচরণ (Professional Misconduct)? বার কাউন্সিল ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট এবং বার কাউন্সিল অর্ডারের আলোকে আইনি বিশ্লেষণ করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও আইনি সমস্যাটির প্রেক্ষাপট

আইন পেশা নিছক কোনো সাধারণ লাভজনক ব্যবসা নয়; এটি পরম বিশ্বাস ও বিশ্বস্ততার (Fiduciary Relationship) ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি মহৎ জনকল্যাণমূলক সেবা। মক্কেল যখন কোনো আইনজীবীকে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেন, তখন আইনজীবী মক্কেলের স্বার্থের সর্বোচ্চ ট্রাস্টি বা অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মক্কেলের স্বার্থের সাথে আইনজীবীর ব্যক্তিগত স্বার্থের কোনো সংঘাত (Conflict of Interest) সৃষ্টি হলে আইন সর্বদা মক্কেলের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। আলোচ্য সমস্যাটিতে পূবালী ব্যাংকের আইনজীবী ব্যাংকের ডিক্রিকৃত নিলাম সম্পত্তি নিজের সন্তানদের নামে খরিদ করেছেন—যা পেশাগত নৈতিকতার এক চরম লঙ্ঘন।

২. বার কাউন্সিল ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্টের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট-এর অধ্যায় ২ (Duty to Client)-এ আইনজীবীর দায়িত্ব সম্পর্কে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে:

  1. ক্যাননস অব কন্ডাক্ট Chapter II, Rule 8: “An Advocate should not purchase or stipulate for purchase by him or for his benefit, any property which is the subject-matter of any litigation in which he is professionally engaged.”
    অর্থাৎ, যে মামলায় একজন আইনজীবী পেশাগতভাবে নিয়োজিত আছেন, তিনি কোনো অবস্থাতেই উক্ত মামলার বিষয়বস্তুভুক্ত কোনো বিতর্কিত সম্পত্তি নিজে কিংবা নিজের কোনো সুবিধার জন্য অন্য কারও নামে ক্রয় করতে পারবেন না।
  2. ক্যাননস অব কন্ডাক্ট Chapter II, Rule 6: আইনজীবী কখনোই মক্কেলের স্বার্থের প্রতিকূলে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করতে পারবেন না। ব্যাংকের আইনজীবী হিসেবে তার একমাত্র পবিত্র দায়িত্ব ছিল ব্যাংকের বন্ধকী সম্পত্তি সর্বোচ্চ মূল্যে নিলামে বিক্রি করে ব্যাংকের পাওনা ঋণ আদায় নিশ্চিত করা। কিন্তু সন্তানদের নামে নামমাত্র মূল্যে সম্পত্তি খরিদ করায় আইনজীবী ব্যাংকের স্বার্থের চরম ক্ষতি করেছেন।
  3. দেওয়ানি কার্যবিধির ২১ আদেশ ৭৩ নিয়ম (Order XXI Rule 73 CPC): আদালত বা ডিক্রি জারির নিলাম পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা আইনজীবী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিলামে কোনো সম্পত্তি ক্রয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেন না।

৩. উক্ত কাজ কি পেশাগত অসদাচরণ?

সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—আইনজীবী কর্তৃক সন্তানদের নামে বেনামিতে নিলামের সম্পত্তি খরিদ করা চরমতম পেশাগত অসদাচরণ (Gross Professional Misconduct)। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের কোনো স্বাধীন আর্থিক উৎস থাকে না; সন্তানদের নামে খরিদ প্রকারান্তরে আইনজীবীর নিজের নামেই খরিদ হিসেবে গণ্য হয় (Doctrine of Benami)। এটি মক্কেল পূবালী ব্যাংকের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা এবং আদালতের প্রক্রিয়ার প্রতারণামূলক অপব্যবহার।

৪. সংক্ষুব্ধ মক্কেলের আইনি প্রতিকার ও বার কাউন্সিলে অভিযোগ (Rule 43)

পূবালী ব্যাংক বা যে কোনো সংক্ষুব্ধ নাগরিক বার কাউন্সিল রুলসের রুল ৪৩ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট হলফনামা সহকারে বার কাউন্সিলে লিখিত নালিশ পেশ করতে পারেন। বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল অনুচ্ছেদ ৩৪ অনুযায়ী নিম্নোক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন:

  • আইনজীবীর ওকালতি সনদ নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য স্থগিত (Suspension); অথবা
  • চরম বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে আইনজীবী তালিকা হতে নাম চিরতরে কর্তন করে ওকালতি সনদ চিরতরে বাতিল (Removal from Practice);
  • অর্থ ঋণ আদালত উক্ত নিলাম বিক্রয় বাতিল ঘোষণা করে পুনরায় উন্মুক্ত নিলামের নির্দেশ দেবেন।

৫. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)

  • পূবালী ব্যাংক লিমিটেড বনাম অ্যাডভোকেট মো: ফজলুর রহমান (45 DLR (AD) 188): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী কর্তৃক নিলামের সম্পত্তি আত্মীয়স্বজনের নামে কেনা চরম অসদাচরণ; উক্ত নিলাম বিক্রয় শুরু থেকেই বাতিল (Void ab initio)।
  • কাউন্সিল অব ল সোসাইটি বনাম মো: ইউসুফ (32 DLR 110): আদালত রায় দেন যে, মক্কেলের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের শাস্তি হলো ওকালতি সনদ চিরতরে বাতিল।

৬. উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, পূবালী ব্যাংকের ডিক্রী কার্যকর নিলাম থেকে সন্তানদের নামে সম্পত্তি খরিদ পেশাগত নৈতিকতা ও আইনের শাসনের চরম পরিপন্থী। এ ধরনের কাজের বিরুদ্ধে বার কাউন্সিলের কঠোর শাস্তিমূলক অবস্থান আইন পেশার পবিত্রতা রক্ষা করতে অপরিহার্য।

৪.১. পূবালী ব্যাংক কর্তৃক বার কাউন্সিলে দাখিলযোগ্য নালিশী দরখাস্তের আনুষ্ঠানিক খসড়া (Rule 43)

বরাবর, সম্মানিত সচিব, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, ঢাকা

অভিযোগকারী: পূবালী ব্যাংক লিমিটেড, পক্ষে উপ-মহাব্যবস্থাপক
— বনাম —
অভিযুক্ত আইনজীবী: জনাব ………….., অ্যাডভোকেট, ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন (ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী)।

বার কাউন্সিল রুলস-এর রুল ৪৩ মতে পেশাগত অসদাচরণের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নালিশ

বিনীত নিবেদন এই যে, অভিযুক্ত আইনজীবী ব্যাংকের অর্থ ঋণ মামলা নং ১২/২০২০ পরিচালনাকালে ডিক্রিকৃত বন্ধকী সম্পত্তি নিলাম বিক্রয়ের সময় ব্যাংকের স্বার্থ সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়া নামমাত্র মূল্যে গোপনে নিজ অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের নামে খরিদ করিয়াছেন। উক্ত আচরণ ক্যাননস অব কন্ডাক্ট Chapter II Rule 8-এর প্রত্যক্ষ লঙ্ঘন এবং মক্কেলের আস্থার প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা। অতএব, বিষয়টি বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করিয়া অভিযুক্ত আইনজীবীর ওকালতি সনদ চিরতরে বাতিলের আদেশদানে মর্জি হয়।

৪.২. অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩ ধারার নিলামের বাধ্যবাধকতা

অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩ ধারা অনুযায়ী ডিক্রি কার্যকরীকরণে নিলাম বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কঠোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে:

  • নিলামের বিজ্ঞপ্তি বহুল প্রচারিত অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ করতে হয়;
  • আইনজীবী বা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট যে কোনো প্রতিনিধি সরাসরি বা পরিবারের মাধ্যমে দরপত্র দাখিল করতে আইনত বারিত;
  • স্বার্থের সংঘাত ঘটিয়ে নামমাত্র মূল্যে খরিদ করা হলে উক্ত নিলাম বিক্রয় অর্থ ঋণ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বা দরখাস্তের প্রেক্ষিতে বাতিল করতে বাধ্য (পূবালী ব্যাংক বনাম মো: সোলায়মান, 45 DLR (AD) 188)।

৪.২. অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩ ধারার নিলামের বাধ্যবাধকতা

অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩ ধারা অনুযায়ী ডিক্রি কার্যকরীকরণে নিলাম বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কঠোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে:

  • নিলামের বিজ্ঞপ্তি বহুল প্রচারিত অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ করতে হয়;
  • আইনজীবী বা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট যে কোনো প্রতিনিধি সরাসরি বা পরিবারের মাধ্যমে দরপত্র দাখিল করতে আইনত বারিত;
  • স্বার্থের সংঘাত ঘটিয়ে নামমাত্র মূল্যে খরিদ করা হলে উক্ত নিলাম বিক্রয় অর্থ ঋণ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বা দরখাস্তের প্রেক্ষিতে বাতিল করতে বাধ্য (পূবালী ব্যাংক বনাম মো: সোলায়মান, 45 DLR (AD) 188)।

Related Articles

Back to top button