সন্তানসহ কূপে ঝাঁপ দেওয়া নারী: ধারা ৩০২ বনাম ৩০৪এ আপীল যুক্তি | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৬

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৬
প্রশ্ন ৬। (ক): প-কে তার স্বামী প্রতিনিয়ত নির্যাতন করত। একদা গভীর রাতে স্বামীর সাথে বিবাদের পর প ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পথিমধ্যে প পেছন থেকে কারো পায়ের শব্দ শুনে ঘাবড়ে যায় এবং তার কোলে থাকা শিশু বাচ্চাসহ একটি কূপে ঝাঁপ দেয়। ফলশ্রুতিতে শিশুটি মারা যায়। বিচারিক আদালত প এর কাজটি “so imminently dangerous that it must, in all probability, cause death” সাব্যস্ত করে প কে The Penal Code, 1860 এর ৩০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে। আপীল আদালতে আপনি প এর পক্ষে কী যুক্তি উপস্থাপন করবেন? [১০]

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

অত্র সমস্যাটি ফৌজদারি আইনশাস্ত্রের একটি ক্লাসিক ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিচারিক নজিরের ওপর প্রতিষ্ঠিত। একজন চরম নির্যাতিত নারী স্বামীর পাশবিক অত্যাচার থেকে জীবন বাঁচাতে গভীর রাতে বের হয়ে আতঙ্কের বশবর্তী হয়ে শিশুসহ কূপে ঝাঁপ দিলে শিশুর মৃত্যু ঘটে। বিচারিক আদালত দণ্ডবিধির ৩০০ ধারার চতুর্থ দফা প্রয়োগ করে ৩০২ ধারায় খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে। আপীল আদালতে আসামীর পক্ষে আইন ও নজিরভিত্তিক যুক্তি উপস্থাপনই অত্র উত্তরের মূল প্রতিপাদ্য।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইনি বিধানাবলী (Statutory Provisions)

  • The Penal Code, 1860:
    • Section 299 & 300 (Fourthly): অপরাধজনক নরহত্যা ও খুনের সংজ্ঞা। চতুর্থ দফায় অত্যন্ত আসন্ন বিপদ ও মৃত্যুর নিশ্চিত সম্ভাবনার জ্ঞান।
    • Section 302: খুনের শাস্তি।
    • Section 304 (Part II): অপরাধজনক নরহত্যা যা খুন নয় (মৃত্যু ঘটানোর অভিপ্রায়হীন কিন্তু জ্ঞানের উপস্থিতি)।
    • Section 304A: বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু ঘটানো (Causing death by negligence)।
    • Section 81 & 84: বৃহত্তর অনিষ্ট রোধ ও চরম মানসিক বিহ্বলতার আত্মরক্ষা নীতি।

৩. আপীল আদালতে প-এর পক্ষে উপস্থাপনযোগ্য আইনি যুক্তিসমূহ

আপীল আদালতে আসামী প-এর আইনজীবী হিসেবে নিম্নোক্ত অকাট্য আইনি যুক্তিগুলো তুলে ধরতে হবে:

১. খুনের কোনো অপরাধমূলক অভিপ্রায় (Mens Rea) ছিল না

দণ্ডবিধির ৩০০ ধারায় খুন সাব্যস্ত হতে হলে আসামীর অন্তরে মৃত্যু ঘটানোর সুনির্দিষ্ট অভিপ্রায় (Intention to cause death) থাকতে হয়। প তার সন্তানকে হত্যার উদ্দেশ্যে কূপে ঝাঁপ দেয়নি; বরং স্বামীর অব্যাহত নির্যাতন এবং গভীর রাতে অজ্ঞাত পদশব্দ শুনে সম্ভ্রম ও জীবন বাঁচানোর এক চরম ভীতি ও আতঙ্কে (State of panic and panic-stricken reflex) বিহ্বল হয়ে এই কাজ করেছে।

২. ৩০০ ধারার চতুর্থ দফা এখানে ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে

বিচারিক আদালত ৩০০ ধারার ৪ নম্বর দফা (“so imminently dangerous…”) প্রয়োগ করেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত আইন হলো—চতুর্থ দফা কেবল তখনই প্রযোজ্য হয় যখন কাজটি কোনো প্রকার কারণ বা আত্মরক্ষার অজুহাত ব্যতিরেকে (without any excuse for incurring the risk) সম্পূর্ণ ঠান্ডা মাথায় বেপরোয়াভাবে করা হয়। প-এর ক্ষেত্রে অবিরত গার্হস্থ্য নির্যাতন এবং গভীর রাতের তীব্র আতঙ্ক ছিল একটি বাস্তব ‘Excuse’, যা চতুর্থ দফার আওতা থেকে তাকে বের করে আনে।

৩. তাৎক্ষণিক আতঙ্কের প্রতিফলন (Doctrine of Panic / Agony of the Moment)

আইন স্বীকার করে যে, কোনো ব্যক্তি যখন অন্যের অন্যায় আচরণের কারণে চরম প্রাণভয়ে আতঙ্কিত হয়, তখন তার যুক্তিসঙ্গত বিচারবুদ্ধি সাময়িকভাবে লোপ পায়। পেছনে পায়ের শব্দ শুনে প ভেবেছিল আক্রমণকারী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এই চরম আতঙ্কে শিশুসহ কূপে ঝাঁপ দেওয়া কোনো পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নয়।

৪. উপযুক্ত বিকল্প ধারা: ধারা ৩০৪ (অংশ ২) অথবা ৩০৪এ

  • প-এর কৃতকর্মটি সর্বোচ্চ দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারার ২য় অংশ (অভিপ্রায়হীন কিন্তু জ্ঞানসম্পন্ন অপরাধজনক নরহত্যা যা খুন নয়) অথবা ধারা ৩০৪এ (চরম ভীতিজনিত অসাবধানতা ও অবহেলা)-এর আওতায় আনা যেতে পারে।
  • ৩০২ ধারার খুনের সাজা কোনোভাবেই আইনসঙ্গত নয় এবং এটি বাতিলযোগ্য।

৪. বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স

১. গিয়ারসিবাই বনাম স্টেট (AIR 1953 MB 61 – Full Bench): এ জাতীয় একটি হুবহু মামলায় মধ্যভারত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ রায় দেন যে, স্বামীর নির্মম অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ভয়ে সন্তানসহ কূপে ঝাঁপ দেওয়া নারী খুনের (Section 302) অপরাধে দোষী হবে না। তার কোনো হত্যার অভিপ্রায় ছিল না; এটি সর্বোচ্চ ধারা ৩০৪ অংশ ২ এর আওতায় আসতে পারে।

২. মোসাম্মৎ সোমারিয়া বনাম রাষ্ট্র (1975 Cri LJ 840): আদালত রায় দেন যে, আতঙ্কের মুখে কূপে ঝাঁপ দেওয়ার ঘটনায় ৩০২ ধারার সাজা বাতিলপূর্বক সাজা কমিয়ে লঘুদণ্ডে রূপান্তরযোগ্য।

৩. কুইন-এমপ্রেস বনাম কাদা (ILR 20 All 115): আতঙ্কের বশে সন্তানসহ ঝাঁপ দেওয়াকে আত্মহত্যার উদ্যোগ ও নরহত্যা হিসেবে গণ্য করা হলেও খুনের অভিপ্রায় অনুপস্থিত হিসেবে স্বীকৃত।

৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি প্রার্থনা

অতএব, আপীল আদালতে বিনীত প্রার্থনা হবে—বিচারিক আদালত কর্তৃক প-এর বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় প্রদত্ত খুনের সাজা আইনত ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় তা বাতিল করে প-কে ৩০২ ধারার অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হোক এবং সর্বোচ্চ সহানুভূতি বিবেচনায় লঘু ধারায় (৩০৪ পার্ট ২ বা ৩০৪এ) রূপান্তর করে ইতিমধ্যে খাটা হাজতবাসকে পর্যাপ্ত সাজা হিসেবে গণ্যপূর্বক তাকে অবিলম্বে মুক্তি প্রদান করা হোক।

Related Articles

Back to top button