স্বত্ব ঘোষণার মামলায় উচ্ছেদ রোধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত ও এফিডেভিট মুসাবিদা (Order 39 Rule 1-2 CPC) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০১২

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১২: দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮

প্রশ্ন: ৫ দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৯ নিয়ম ১ ও ২ অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction) মঞ্জুরের ৩টি অপরিহার্য আইনি শর্তাবলী কি কি? স্বত্ব ঘোষণার মোকদ্দমায় বিবাদী কর্তৃক বাদীকে জোরপূর্বক জমি হইতে উচ্ছেদের আশঙ্কায় বিজ্ঞ আদালতে দাখিলযোগ্য একটি পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত এবং এফিডেভিটের আনুষ্ঠানিক ড্রাফট প্রস্তুত করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও নিষেধাজ্ঞার ধারণা

দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ ৩৯ নিয়ম ১ ও ২ (Order XXXIX Rules 1 & 2) অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রতিকার প্রদান করা হয়। নিষেধাজ্ঞা হলো একটি বিচারিক প্রতিরোধমূলক প্রতিকার (Preventive Relief)। দেওয়ানি মামলার দীর্ঘ বিচার চলাকালে বিবাদী যেন বিরোধীয় সম্পত্তির চরিত্র নষ্ট করতে না পারে বা বাদীকে বলপূর্বক উচ্ছেদ করতে না পারে, সেজন্য মামলা নিষ্পত্তির পূর্ব পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বা সম্পত্তিকে অক্ষত রাখাই নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য।

২. অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা মঞ্জুরের ৩টি অপরিহার্য সোনালী শর্ত

বিজ্ঞ আদালত হতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা লাভ করতে হলে বাদীকে ৩টি শর্ত যুগপৎভাবে পূরণ করতে হয়:

  1. আপাতদৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য মামলা (Prima Facie Arguable Case): বাদীকে আরজি ও দলিলের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে তার পক্ষে একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য মামলা বিদ্যমান রয়েছে যা বিচারে সফল হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রাখে।
  2. অপূরণীয় ক্ষতি (Irreparable Loss / Injury): বাদীকে সন্তোষজনকভাবে প্রমাণ করতে হবে যে নিষেধাজ্ঞা না দিলে যে ক্ষতি হবে, তা পরবর্তীতে কোনো অর্থ বা ক্ষতিপূরণের দ্বারা পরিমাপ বা পূরণ করা সম্ভব নয়।
  3. সুবিধার ভারসাম্য বাদীর অনুকূলে থাকা (Balance of Inconvenience): আদালত মূল্যায়ন করবেন যে নিষেধাজ্ঞা দিলে যে অসুবিধা হবে, না দিলে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতি বাদীর হবে কি না।

৩. বিজ্ঞ সহকারী জজ আদালতে নিষেধাজ্ঞার পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক দরখাস্ত ও এফিডেভিটের খসড়া

বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ ১ম আদালত, ঢাকা

দেওয়ানি মোকদ্দমা নং ……… / ২০২৪

বাদী: মো: আব্দুল জলিল
— বনাম —
বিবাদী: মো: সেলিম হোসেন

দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৯ নিয়ম ১ ও ২ এবং ধারা ১৫১ মতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত

বাদী পক্ষ বিজ্ঞ আদালত সমীপে বিনীত নিবেদন করিতেছে যে—

  1. বাদী নিম্ন তপশিল বর্ণিত পৈত্রিক সম্পত্তিতে বৈধ মালিকানাসূত্রে শান্তিপূর্ণ বাস্তব দখলে বসবাস করিয়া আসিতেছেন এবং বিবাদী অন্যায়ভাবে বাদীর স্বত্ব অস্বীকার করায় বাদী অত্র স্বত্ব ঘোষণার মোকদ্দমা দায়ের করিয়াছেন।
  2. বিবাদী অত্যন্ত প্রভাবশালী ও দাঙ্গা-হাঙ্গামাবাজ ব্যক্তি হওয়ায় গত ১০/০১/২০২৪ তারিখে দলবল সহকারে সশস্ত্র হইয়া বাদীর জমিতে অনধিকার প্রবেশ করিয়া বাদীকে পরিবারসহ জোরপূর্বক উচ্ছেদের এবং বসতভিটার ঘরবাড়ি ভাঙিয়া ফেলার হুমকি প্রদর্শন করিয়াছে।
  3. বিবাদী কর্তৃক বাদী উচ্ছেদ হইলে বা বসতঘর ধ্বংস হইলে বাদীর এমন অপূরণীয় ক্ষতি হইবে যাহা কোনো অর্থ দ্বারা পূরণ সম্ভব নহে। সুবিধার ভারসাম্য সম্পূর্ণ বাদীর অনুকূলে রহিয়াছে।

প্রার্থনা: অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে, অত্র মোকদ্দমা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিবাদী যাহাতে তপশিল জমিতে প্রবেশ করিয়া বাদীকে উচ্ছেদ বা কোনো প্রকার সীমানা পরিবর্তন না করিতে পারে, সেই মর্মে বিবাদীর বিরুদ্ধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশদানে বিজ্ঞ আদালতের মর্জি হয়।

তপশিল সম্পত্তি: ঢাকা জেলা, তেজগাঁও থানাধীন, মৌজা- তেজকুনিপাড়া, সিএস ও এসএ দাগ নং- ১২০, জমির পরিমাণ- ৫ (পাঁচ) শতাংশ বসতভিটা।


হলফনামা (Affidavit)

আমি মো: আব্দুল জলিল, পিতা- মৃত কাশেম আলী, বয়স- ৫৫ বছর, ধর্ম- ইসলাম, পেশা- ব্যবসা, সাং- ঢাকা, এই মর্মে শপথপূর্বক ঘোষণা করিতেছি যে, উপরোক্ত ১ হতে ৩ নং অনুচ্ছেদের সকল তথ্য আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সত্য। অদ্য নোটারি পাবলিকের সামনে স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর করিলাম।

৩.১. আদেশ ৩৯ নিয়ম ২(ক) – নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের শাস্তি (Disobedience of Injunction)

বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক কোনো পক্ষের অনুকূলে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রদানের পর বিবাদী যদি জেনেশুনে উক্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাদীর সম্পত্তিতে প্রবেশ বা কোনো ভাঙচুর চালায়, তবে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৯ নিয়ম ২(ক) অনুযায়ী বিজ্ঞ আদালত বিবাদীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন:

  • বিবাদীর সম্পত্তি সর্বোচ্চ ১ বছরের জন্য ক্রোক (Attachment) রাখার আদেশ প্রদান করতে পারেন; এবং
  • বিবাদীকে সর্বোচ্চ ৬ (ছয়) মাস পর্যন্ত দেওয়ানি কারাগারে (Civil Imprisonment) আটক রাখার কঠোর দণ্ড প্রদান করতে পারেন।

সুপ্রিম কোর্ট (মকবুল হোসেন বনাম রাষ্ট্র, 42 DLR 332) রায়ে সিদ্ধান্ত দেন যে, আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশ অমান্য করা আদালতের মর্যাদার চরম অবমাননা এবং এর জন্য আদালত কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য।

৪. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)

  • দেলোয়ার হোসেন বনাম মোসা: রাবেয়া খাতুন (45 DLR (AD) 120): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে দখলই প্রধান ভিত্তি; দখলে থাকা পক্ষকে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় উচ্ছেদ করা আদালতের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • হাজী মজিবুর রহমান বনাম আব্দুল লতিফ (36 DLR 245): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, তিনটি শর্তের একটিও অনুপস্থিত থাকলে আদালত নিষেধাজ্ঞা মঞ্জুর করতে পারেন না।

৫. উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, স্বত্ব ঘোষণার মামলায় উচ্ছেদ রোধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ন্যায়বিচার ও সম্পত্তির অক্ষত অবস্থা রক্ষার প্রধানতম আইনি হাতিয়ার।

৩.১. আদেশ ৩৯ নিয়ম ২(ক) – নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের শাস্তি (Disobedience of Injunction)

বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক কোনো পক্ষের অনুকূলে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রদানের পর বিবাদী যদি জেনেশুনে উক্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাদীর সম্পত্তিতে প্রবেশ বা কোনো ভাঙচুর চালায়, তবে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৯ নিয়ম ২(ক) অনুযায়ী বিজ্ঞ আদালত বিবাদীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন:

  • বিবাদীর সম্পত্তি সর্বোচ্চ ১ বছরের জন্য ক্রোক (Attachment) রাখার আদেশ প্রদান করতে পারেন; এবং
  • বিবাদীকে সর্বোচ্চ ৬ (ছয়) মাস পর্যন্ত দেওয়ানি কারাগারে (Civil Imprisonment) আটক রাখার কঠোর দণ্ড প্রদান করতে পারেন।

সুপ্রিম কোর্ট (মকবুল হোসেন বনাম রাষ্ট্র, 42 DLR 332) রায়ে সিদ্ধান্ত দেন যে, আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশ অমান্য করা আদালতের মর্যাদার চরম অবমাননা এবং এর জন্য আদালত কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য।

Related Articles

Back to top button