বেদখল ব্যক্তির খাস দখল ব্যতিরেকে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা: ৪২ ধারার শর্তাংশ ও রক্ষণীয়তা | বার কাউন্সিল লিখিত ২০১২
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১২: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭
প্রশ্ন: ৭ কোনো ব্যক্তি যদি স্থাবর সম্পত্তি হইতে বেদখল হইয়া যায়, তবে সে কি উক্ত সম্পত্তিতে খাস দখল পুনরুদ্ধারের প্রার্থনা না করিয়া কেবল ৪২ ধারায় স্বত্ব ঘোষণার (Declaration of Title) মোকদ্দমা করিতে পারে? ৪২ ধারার শর্তাংশ (Proviso to Section 42) এবং সুপ্রিম কোর্টের নজিরের আলোকে আরজির রক্ষণীয়তা বিশ্লেষণ করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও ৪২ ধারার সাধারণ নীতি
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৪২ ধারায় ঘোষণামূলক ডিক্রি (Declaratory Decree) প্রদানের ক্ষমতা আদালতকে অর্পণ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যখন কোনো আইনি চরিত্র (Legal Character) বা সম্পত্তিতে কোনো স্বত্বের অধিকারী হয় এবং অন্য কেউ তা অস্বীকার করে, তখন আদালত উক্ত স্বত্বের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারেন। কিন্তু ঘোষণা নিছক একটি স্বীকৃতিমূলক প্রতিকার; এটি কোনো বাস্তব শারীরিক দখল বা কার্যকর ডিক্রি কার্যকর করে না।
২. ৪২ ধারার শর্তাংশের সংবিধিবদ্ধ কঠোর বাধা (Proviso to Section 42)
৪২ ধারার শর্তাংশে অত্যন্ত স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক ভাষায় বলা হয়েছে:
“Provided that no Court shall make any such declaration where the plaintiff, being able to seek further relief than a mere declaration of title, omits to do so.”
অর্থাৎ, বাদী যেখানে কেবল স্বত্ব ঘোষণার চেয়েও অতিরিক্ত বা আনুষঙ্গিক কোনো কার্যকর প্রতিকার (Further / Consequential Relief) প্রার্থনা করতে আইনত সক্ষম ছিল, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে তা বর্জন বা পরিহার করেছে, সেখানে আদালত কোনো অবস্থাতেই নিছক স্বত্ব ঘোষণার ডিক্রি প্রদান করবেন না।
৩. বেদখল ব্যক্তির আরজির আইনগত রক্ষণীয়তার মূল্যায়ন
আলোচ্য পরিস্থিতিতে বাদী জমি থেকে সম্পূর্ণ বেদখল (Dispossessed) অবস্থায় রয়েছেন। বেদখল হওয়ার কারণে বাদীর সামনে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারার অধীনে খাস দখল পুনরুদ্ধারের (Recovery of Possession) প্রার্থনা করার পূর্ণ সক্ষমতা ও অধিকার রয়েছে। কিন্তু বাদী যদি দখল পুনরুদ্ধারের প্রার্থনা না করে কেবল ৪২ ধারায় ঘোষণা চান, তবে নিম্নোক্ত পরিণতি ঘটবে:
- ৪২ ধারার শর্তাংশের প্রত্যক্ষ লঙ্ঘনের কারণে মোকদ্দমাটি আইনত বারিত ও অচল (Barred and Not Maintainable) হবে।
- আদালত কেবল একটি কাগুজে ঘোষণা দিয়ে বাদীর প্রকৃত কোনো উপকার করতে পারবেন না, কারণ বিবাদী জমিতে শারীরিক দখলে বহাল থাকবে।
- অধিকন্তু, ৮ ধারার খাস দখলের অ্যাড-ভ্যালেরম কোর্ট ফি ফাঁকি দেওয়ার অসৎ কৌশলকে আদালত কখনোই প্রশ্রয় দেবেন না।
বাদীর করণীয়: বাদীকে অবশ্যই একই আরজিতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার সাথে ৮ ধারা সমন্বয় করে স্বত্ব সাব্যস্তপূর্বক খাস দখল পুনরুদ্ধারের (Declaration of title with recovery of possession) যৌথ প্রার্থনা করতে হবে এবং দখল উদ্ধারের ওপর মূল্যানুপাতিক কোর্ট ফি প্রদান করতে হবে।
৪. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)
- মো: মহিউদ্দিন বনাম সিরাজুল হক (52 DLR 505): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, বেদখল ব্যক্তি যদি খাস দখলের প্রার্থনা না করে কেবল স্বত্ব ঘোষণা চায়, তবে ৪২ ধারার শর্তাংশ প্রয়োগ করে বিজ্ঞ আদালত মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ করে দিতে আইনত বাধ্য।
- আব্দুল লতিফ বনাম আমিনা খাতুন (38 DLR 144): হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেন যে, আনুষঙ্গিক প্রতিকার এড়িয়ে কোর্ট ফি ফাঁকি দিয়ে কেবল ঘোষণা মামলা পরিচালনা আইনের চোখে আদালত প্রক্রিয়ার অপব্যবহার।
৫. উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বেদখল ব্যক্তির খাস দখল ব্যতিরেকে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা ৪২ ধারার শর্তাংশের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার কারণে কোনোভাবেই রক্ষণীয় নয়। বাদীর উচিত আরজি সংশোধন করে ৮ ধারার খাস দখলের প্রার্থনা অন্তর্ভুক্ত করা।
৩.১. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ও ৪২ ধারার যৌথ আরজির খসড়া
বেদখল বাদীকে আরজি বাতিল হওয়া থেকে রক্ষা পেতে কীভাবে আরজি সাজাতে হবে তার আনুষ্ঠানিক ড্রাফট নিম্নে প্রদত্ত হলো:
বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ আদালত, সদর, ঢাকা
দেওয়ানি মোকদ্দমা নং ……… / ২০২৪
বাদী: মো: আব্দুর রহিম
— বনাম —
বিবাদী: মো: কামাল উদ্দিন
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ও ৮ ধারা মতে স্বত্ব সাব্যস্তপূর্বক খাস দখল পুনরুদ্ধারের আরজি
বাদী বিনীতভাবে নিবেদন করিতেছে যে, বিবাদী বাদীকে গত ১০/০২/২০২৩ তারিখে জোরপূর্বক জমি হইতে বেদখল করিয়াছে। অতএব বাদী ৪২ ধারায় স্বত্ব ঘোষণা এবং ৮ ধারায় আদালতের বেলীফের মাধ্যমে বিবাদীকে উচ্ছেদপূর্বক খাস দখল হস্তান্তরের যৌথ প্রতিকার প্রার্থনা করিতেছে এবং উক্ত খাস দখলের বাজারমূল্যের ওপর প্রয়োজনীয় পূর্ণ অ্যাড-ভ্যালেরম কোর্ট ফি দাখিল করিল।
৩.২. বিবাদী কর্তৃক আরজি প্রত্যাখ্যানের আবেদনের ড্রাফট (Order VII Rule 11(d) CPC)
বাদী যদি বেদখল অবস্থায় খাস দখল না চেয়ে কেবল ৪২ ধারায় ঘোষণা মামলা করে, তবে বিবাদী আরজি প্রত্যাখ্যানের জন্য আদালতে নিম্নোক্ত দরখাস্ত পেশ করতে পারেন:
বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ আদালত, ঢাকা
দেওয়ানি মোকদ্দমা নং ……… / ২০২৪
বিবাদী (দরখাস্তকারী): মো: কামাল উদ্দিন — বনাম — বাদী: মো: আব্দুর রহিম
দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৭ নিয়ম ১১(ঘ) মতে আরজি প্রত্যাখ্যানের দরখাস্ত
বিবাদী পক্ষ বিনীত নিবেদন করিতেছে যে, আরজির বক্তব্য পাঠেই স্পষ্ট যে বাদী তপশিল জমিতে দখলে নাই এবং তিনি বেদখল অবস্থায় রহিয়াছেন। এমতাবস্থায় সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার শর্তাংশ অনুযায়ী খাস দখলের প্রতিকার প্রার্থনা না করায় অত্র মোকদ্দমা আইন দ্বারা সরাসরি বারিত (Barred by law)। অতএব আরজিটি আদেশ ৭ নিয়ম ১১(ঘ) অনুযায়ী সরাসরি প্রত্যাখ্যানের মর্জি হয়।
৩.২. বিবাদী কর্তৃক আরজি প্রত্যাখ্যানের আবেদনের ড্রাফট (Order VII Rule 11(d) CPC)
বাদী যদি বেদখল অবস্থায় খাস দখল না চেয়ে কেবল ৪২ ধারায় ঘোষণা মামলা করে, তবে বিবাদী আরজি প্রত্যাখ্যানের জন্য আদালতে নিম্নোক্ত দরখাস্ত পেশ করতে পারেন:
বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ আদালত, ঢাকা
দেওয়ানি মোকদ্দমা নং ……… / ২০২৪
বিবাদী (দরখাস্তকারী): মো: কামাল উদ্দিন — বনাম — বাদী: মো: আব্দুর রহিম
দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৭ নিয়ম ১১(ঘ) মতে আরজি প্রত্যাখ্যানের দরখাস্ত
বিবাদী পক্ষ বিনীত নিবেদন করিতেছে যে, আরজির বক্তব্য পাঠেই স্পষ্ট যে বাদী তপশিল জমিতে দখলে নাই এবং তিনি বেদখল অবস্থায় রহিয়াছেন। এমতাবস্থায় সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার শর্তাংশ অনুযায়ী খাস দখলের প্রতিকার প্রার্থনা না করায় অত্র মোকদ্দমা আইন দ্বারা সরাসরি বারিত (Barred by law)। অতএব আরজিটি আদেশ ৭ নিয়ম ১১(ঘ) অনুযায়ী সরাসরি প্রত্যাখ্যানের মর্জি হয়।
📌 সম্পর্কিত আইনি প্রস্তুতি ও সহায়িকা লিংক:
- ২০১২ সালের বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ মডেল সমাধান দেখুন
- দেওয়ানী কার্যবিধি (CPC) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও আইনি আলোচনা
- বার কাউন্সিল ও জুডিশিয়ারি দেওয়ানী কার্যবিধি (CPC) অনলাইন মডেল টেস্ট দিন
- বার কাউন্সিল বিগত সকল লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংক ও ১০০% পূর্ণাঙ্গ সমাধান ব্যাংক
