লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে অনভীষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুতে খুনের অপরাধ ও স্থানান্তরিত বিদ্বেষ নীতি (Section 301 Penal Code) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩
প্রশ্ন ৭। (খ): লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে অনভীষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুতে খুনের অপরাধ ও স্থানান্তরিত বিদ্বেষ নীতি (Section 301 Penal Code) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
ফৌজদারি আইনের এক অনন্য নীতি হলো—অপরাধীর অসৎ মানসিক উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ব্যক্তি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না; লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে কোনো তৃতীয় নির্দোষ ব্যক্তি নিহত হলেও অপরাধীর খুনের দায় বিন্দুমাত্র হ্রাস পায় না। একে সাধারণ আইনে বলা হয় ‘Doctrine of Transferred Malice’ (স্থানান্তরিত বিদ্বেষ নীতি)। অত্র সমস্যাভিত্তিক প্রশ্নে X মৃত্যু হবে জেনেও Y-এর মৃত্যু ঘটানোর উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়ে; কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গুলিতে Z-এর মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনায় X দণ্ডবিধির কোন ধারার অধীনে অপরাধ করেছে তা সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানসহ বিশ্লেষণ অত্র প্রশ্নের মূল উদ্দেশ্য।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী
The Penal Code, 1860 এর Section 301 এ স্থানান্তরিত বিদ্বেষ নীতিটি স্পষ্টভাবে সংবিধিবদ্ধ রয়েছে:
“If a person, by doing anything which he intends or knows to be likely to cause death, commits culpable homicide by causing the death of any person, whose death he neither intends nor knows himself to be likely to cause, the culpable homicide committed by the offender is of the description of which it would have been if he had caused the death of the person whose death he intended or knew to be likely to cause.”
এবং Section 302: খুনের শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড)।
৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা
আইনি বিশ্লেষণ ও X-এর অপরাধের মাত্রা
- অপরাধমূলক অভিপ্রায় (Mens Rea): X-এর মধ্যে মানুষ হত্যা করার চূড়ান্ত অপরাধমূলক অভিপ্রায় (Intention to cause death) বিদ্যমান ছিল। সে ঠাণ্ডা মাথায় অস্ত্র দিয়ে Y-কে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিল।
- স্থানান্তরিত বিদ্বেষ নীতি (Doctrine of Transferred Malice):
- আইন আসামিকে এই অজুহাত দেওয়ার সুযোগ দেয় না যে—”আমি তো Z-কে মারতে চাইনি, আমার কোনো শত্রুতা Z-এর সাথে ছিল না।”
- ধারা ৩০১ অনুযায়ী, Y-এর প্রতি X-এর যে বিদ্বেষ ও খুনের অভিপ্রায় ছিল, গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে Z-এর শরীরে বিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে সেই খুনের অভিপ্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানান্তরিত হয়ে Z-এর ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হবে।
- আইনের চোখে গণ্য হবে যে X যেন জেনেশুনেই Z-কে হত্যা করেছে।
- প্রযোজ্য ধারা ও শাস্তি:
- যেহেতু Y মারা গেলে X দণ্ডবিধির ৩০০ ধারা অনুযায়ী সরাসরি ৩০২ ধারার খুনের অপরাধে দণ্ডিত হতো, সেহেতু Z-এর মৃত্যুর ক্ষেত্রেও অপরাধটি ৩০২ ধারার খুন হিসেবেই পরিগণিত হবে।
- অতএব, X দণ্ডবিধির ধারা ৩০১ সহ পঠিতব্য ধারা ৩০২ (খুনের অপরাধ) এর অধীনে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে।
৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স
১. সম্রাট বনাম মুশাহার (AIR 1940 Pat 788): আদালত রায় দেন যে, শত্রুকে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলিতে কোনো অপরিচিত পথিক নিহত হলে দণ্ডবিধির ৩০১ ধারা মতে তা সরাসরি ৩০২ ধারার খুনের অপরাধ।
২. জ্ঞানেন্দ্র বনাম রাষ্ট্র (1981 Cr LJ 345): বিদ্বেষ স্থানান্তরের নীতি অনুযায়ী ভিকটিম পরিবর্তন হলেও অপরাধীর দায় একই থাকে।
৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত
অতএব আইনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: X The Penal Code, 1860 এর Section 301 সহ পঠিতব্য Section 302 এর অধীন সরাসরি খুনের (Murder) অপরাধ সংঘটন করেছে এবং সে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।
🏛️ সম্পর্কিত প্রশ্নপত্র: এই প্রশ্নটি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষা ২০২৩-এর প্রশ্নপত্রে অন্তর্ভুক্ত। সম্পূর্ণ বিগত বছরের প্রশ্নব্যাংক দেখতে আমাদের মূল আর্কাইভে প্রবেশ করুন।
৪.১. স্থানান্তরিত বিদ্বেষ তত্ত্বের (Doctrine of Transferred Malice) গভীর আইনি বিশ্লেষণ
দণ্ডবিধির ৩০১ ধারায় সন্নিবেশিত এই নীতি অনুযায়ী, অপরাধী যাকে হত্যা করতে চেয়েছিল সে না মরে যদি সম্পূর্ণ অপর কোনো অনভীষ্ট ব্যক্তি মারা যায়, তবুও আইনের দৃষ্টিতে এটি সরাসরি ৩০২ ধারার খুন হিসেবে গণ্য হবে। এর পেছনে রয়েছে ৩টি মৌলিক কারণ:
- অপরাধমূলক মানসিকতা অক্ষুণ্ণ থাকা: অপরাধীর মনে মানুষ হত্যার সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক অভিপ্রায় (Mens Rea) বিদ্যমান ছিল;
- আইনের স্থানান্তর নীতি: বন্দুকের গুলি বা বিষ লক্ষ্যচ্যুত হলেও অপরাধীর বিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্য আইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনভীষ্ট ভুক্তভোগীর ওপর প্রতিস্থাপন করে দেয়;
- ৩০১ ধারা বনাম ৩০৪ক ধারা: আসামিপক্ষ দাবি করতে পারে না যে এটি নিছক অবহেলাজনিত মৃত্যু (৩০৪ক ধারা); কারণ শুরুর কাজটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, বরং সুপরিকল্পিত হত্যার প্রচেষ্টা ছিল।
৪.২. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজিরসমূহ
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ (রহিম বনাম রাষ্ট্র, 44 DLR 250) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, ক যদি খ-কে লক্ষ্য করে বিষাক্ত মিষ্টি পাঠায় কিন্তু তা খেয়ে গ মারা যায়, তবে ক ৩০১ ধারার স্থানান্তরিত বিদ্বেষ নীতি অনুযায়ী গ-কে হত্যার জন্য দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় খুনের দায়ে সমানভাবে দণ্ডিত হবে।
৪.৩. দণ্ডবিধির ৩০১ ধারার সাথে ২৯৯ ও ৩০০ ধারার উপাদানগত সমন্বয়
দণ্ডবিধির ২৯৯ ধারায় অপরাধমূলক নরহত্যার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে “মৃত্যু ঘটানোর অভিপ্রায়ে কোনো কাজ করা”। ৩০১ ধারা উক্ত অভিপ্রায়কে লক্ষ্যচ্যুত শিকারের ওপর আরোপ করে। ফলে আসামি এই আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারে না যে তার কোনো বিদ্বেষ ছিল না। যেহেতু অপরাধীর মনের ভেতরে জীবন ধ্বংস করার অসৎ মানসিকতা (Guilty Mind) পরিপূর্ণভাবে ক্রিয়াশীল ছিল, তাই আইনের চোখে ভুক্তভোগীর পরিচয় গৌণ, অপরাধমূলক কাজের ধ্বংসাত্মক রূপই প্রধান।
৪.৪. ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনার সাথে স্থানান্তরিত বিদ্বেষের পার্থক্য
স্থানান্তরিত বিদ্বেষের ক্ষেত্রে অপরাধী নিজেই কাজটি করে কিন্তু শিকার পরিবর্তিত হয়। অন্যদিকে দণ্ডবিধির ১০৭ ধারার প্ররোচনা বা ১২০ক ধারার ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তির সমন্বিত ভূমিকা থাকে। ৩০১ ধারার অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এখানে একক আসামিও অনভীষ্ট ব্যক্তির খুনের জন্য সরাসরি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়।
আইনি সিদ্ধান্ত: সুতরাং, ৩০১ ধারার স্থানান্তরিত বিদ্বেষ নীতি অপরাধীর শাস্তি এড়ানোর চক্রান্ত নস্যাৎ করে যেকোনো অনভীষ্ট ব্যক্তির খুনের ক্ষেত্রেও খুনের সমান সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে।

