অজ্ঞান অবস্থায় বৃদ্ধের দানপত্র দলিল বাতিল ও বোনদের আইনি প্রতিকার – বার কাউন্সিল ২০১১

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১১: প্রশ্ন ৬ এর পূর্ণাঙ্গ মডেল সমাধান

মূল প্রশ্ন:

৬. রহমত আলী ৮০ বছর বয়সে পুত্র শরাফত ও ২ কন্যা আমেনা ও রমিহা এবং সিলেট শহরে একমাত্র বাড়ি রেখে মারা যান। শরাফত একটি দানপত্র দলিল অনুযায়ী বাড়িটি দাবী করে। দুই বোন আপনাকে জানায় যে, দলিলটি প্রতারণামূলক; তাদের পিতা যখন অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন তখন আঙ্গুলের ছাপ নেয়া হয়েছে। শরাফতের বোনদের পরামর্শ দিন। তাদের আইনগত কি প্রতিকার আছে। সংশ্লিষ্ট আইন উল্লেখপূর্বক আলোচনা করুন।

১. ঘটনার সারসংক্ষেপ ও আইনি বিরোধের স্বরূপ

মৃত রহমত আলীর ওয়ারিশ হচ্ছেন তার এক পুত্র শরাফত এবং দুই কন্যা আমেনা ও রমিহা। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী পিতৃকুল সম্পত্তিতে কন্যারাও নির্দিষ্ট অংশের (কোরানিক শেয়ারার ও রেসিডুয়ারি নীতিতে) হকদার। কিন্তু পুত্র শরাফত পিতাকে অজ্ঞানাবস্থায় রেখে প্রতারণামূলকভাবে বৃদ্ধের টিপসহি নিয়ে একটি কথিত হেবা বা দানপত্র দলিল তৈরি করে সম্পূর্ণ বাড়ি আত্মসাতের অপচেষ্টা করছে।

২. শরাফতের দুই বোনকে প্রদত্ত আইনি পরামর্শ ও সম্ভাব্য প্রতিকার

আমেনা ও রমিহাকে দেওয়ানী আদালতে নিম্নলিখিত কার্যকর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করতে হবে:

ক) দলিল বাতিলের মামলা (Cancellation of Instrument – Section 39, Specific Relief Act, 1877):

  • সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারা অনুযায়ী যে কোনো লিখিত দলিল যদি বাতিলযোগ্য (voidable) বা বাতিল (void) হয় এবং উক্ত দলিল বহাল থাকলে যদি বাদীর মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে বাদী উক্ত দলিল বাতিল বা খারিজের জন্য মামলা দায়ের করতে পারেন।
  • যেহেতু পিতা অজ্ঞানাবস্থায় ছিলেন, সেহেতু তার মুক্ত সম্মতি (Free Consent – Section 14, Contract Act) ছিল না এবং মুসলিম আইন অনুযায়ী হেবার অন্যতম শর্ত হলো দাতার সুস্থ মস্তিষ্কে স্বেচ্ছায় ঘোষণা। প্রতারণামূলকভাবে সংগৃহীত এই দানপত্রটি শুরু থেকেই বাতিল (Void ab initio)।

খ) বিকল্প প্রতিকার: দলিলটি অকার্যকর ও অবৈধ ঘোষণার মামলা (Section 42, S.R. Act):

যেহেতু বোনেরা উক্ত দলিলে স্বাক্ষরকারী বা পক্ষ নন, সেহেতু তারা সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা মোতাবেক মামলা করতে পারেন এই মর্মে ঘোষণার জন্য যে—কথিত দানপত্র দলিলটি জাল, প্রতারণামূলক, বেআইনি এবং তাদের পিতৃস্বত্বের ওপর কোনোভাবেই বাধ্যকর নয়।

গ) বাটোয়ারা বা বণ্টন মোকদ্দমা (Suit for Partition under Partition Act, 1893):

দলিল বাতিলের পাশাপাশি বোনেরা একই মোকদ্দমায় বা পৃথকভাবে পিতার রেখে যাওয়া সিলেট শহরের বাড়ির ৩ ভাগের ২ ভাগ হিস্যা (পুত্র পাবে ২ অংশ, প্রতি কন্যা পাবে ১ অংশ হারে) চিহ্নিত করে নিজ নিজ অংশ পৃথক দখলের জন্য বাটোয়ারা ডিক্রি প্রার্থনা করবেন।

ঘ) অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction under Order XXXIX, Rules 1 & 2 CPC):

মামলা দায়েরের সাথে সাথে দেওয়ানী কার্যবিধির ৩৯ আদেশ, ১ ও ২ বিধি মোতাবেক আবেদন করতে হবে যেন মামলা নিষ্পত্তির পূর্বে শরাফত বাড়িটি অন্য কারো নিকট বিক্রয়, হস্তান্তর, ধ্বংস বা রূপান্তর করতে না পারে।

৩. তামাদি মেয়াদ (Limitation Period)

তামাদি আইন, ১৯০৮ এর অনুচ্ছেদ ৯১ ও ৯৫ অনুযায়ী দলিল বাতিলের মামলা দায়েরের সময়সীমা হলো ৩ (তিন) বছর, যা গণনা শুরু হবে প্রতারণার ঘটনা বাদীদের জ্ঞাতসারে আসার তারিখ হতে। অতএব কালবিলম্ব না করে দ্রুত মামলা দায়ের করতে হবে।

৪. প্রমাণের দায়ভার (Burden of Proof) ও উচ্চ আদালতের নজির

সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ১১১ ধারা অনুযায়ী যখন কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তির সাথে সক্রিয় বিশ্বাসের সম্পর্কে (Fiduciary relationship) থাকে এবং তার অসুস্থতা বা দুর্বলতার সুযোগ নেয়, তখন দলিলের সততা প্রমাণের দায়ভার যিনি দলিলটির সুবিধাভোগী (অর্থাৎ পুত্র শরাফতের) তার ওপর বর্তায়।

  • Abdul Hamid vs. Nur Mohammad (34 DLR 287): অতি বৃদ্ধ, অসুস্থ বা মুমূর্ষু ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া দলিল স্বতঃসিদ্ধভাবে সন্দেহযুক্ত; গ্রহীতাকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে যে দাতা সুস্থ মাথায় দলিলের মর্মার্থ বুঝে সম্মতি দিয়েছিলেন।
  • Suraiya Begum vs. Subashini Devi (51 DLR 399): পক্ষভুক্ত না হয়ে কোনো দলিলের বিরুদ্ধে স্বত্ব ঘোষণার মামলা ৪২ ধারায় গ্রহণযোগ্য এবং জাল দলিল প্রমাণে কোর্ট ফি মাত্র তিন শত টাকার নির্ধারিত হারে প্রদানযোগ্য।

৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

শরাফতের বোনদের আশ্বস্ত করতে হবে যে আইন অনুযায়ী জাল দলিলের কোনো স্থায়িত্ব নেই। তারা সিলেট জেলা জজ আদালতের অধীন সংশ্লিষ্ট সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দানপত্র দলিলটি বাতিল/বাতিলযোগ্য ঘোষণা, পিতৃসম্পত্তিতে তাদের হিস্যা অনুযায়ী স্বত্ব ঘোষণা এবং বাটোয়ারা ডিক্রির প্রার্থনায় মোকদ্দমা দায়ের করে পূর্ণ প্রতিকার পাবেন।

Related Articles

Back to top button