শিশু, বোবা ও বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং দলিলের ফটোকপি (Evidence Act) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৩
প্রশ্ন ৮। (ক): শিশু, বোবা ও বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং দলিলের ফটোকপি (Evidence Act) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

আদালতে সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে সাক্ষীর যোগ্যতা (Competency of Witness) এবং দলিলের প্রামাণিকতা সুবিচারের অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়। আইন অন্ধভাবে কাউকে সাক্ষ্য দানে অযোগ্য ঘোষণা করে না; বরং তার বোধশক্তি ও বুদ্ধিমত্তাকে গুরুত্ব দেয়। একই সাথে আধুনিক যুগে মূল দলিলের ফটোকপি কখন ও কোন শর্তাধীনে আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে তা দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় বিচারেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রায়োগিক প্রশ্ন। অত্র প্রশ্নে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর অধীন শিশু, বোবা ও বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং মূল দলিলের ফটোকপির গ্রহণযোগ্যতার সংবিধিবদ্ধ শর্তাবলী বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

The Evidence Act, 1872 এর সংশ্লিষ্ট সংবিধিবদ্ধ বিধানাবলী:

  1. Section 118: সাক্ষ্যদানের যোগ্য ব্যক্তি (Who may testify): আদালত কর্তৃক কৃত প্রশ্নের অর্থ বোঝার এবং তার যুক্তিসঙ্গত উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা থাকলে যেকোনো ব্যক্তি সাক্ষী হতে পারেন।
  2. Section 119: বোবা সাক্ষী (Dumb Witness): লিখে বা আকার-ইঙ্গিতের মাধ্যমে প্রকাশ্য আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করতে পারেন যা মৌখিক সাক্ষ্য গণ্য হবে।
  3. Section 154: বৈরী সাক্ষী (Hostile Witness): নিজের পক্ষে আহ্বানকারী পক্ষ কর্তৃক নিজ সাক্ষীকে জেরা করার আদালতের অনুমতি।
  4. Sections 63 ও 65: মাধ্যমিক সাক্ষ্য (Secondary Evidence) ও ফটোকপি।

৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা

আইনি বিশ্লেষণ ও গ্রহণযোগ্যতার শর্তাবলী

১. শিশু সাক্ষীর সাক্ষ্য (Child Witness – Section 118):

  • সাক্ষ্য আইনে বয়সের কোনো নির্দিষ্ট নিম্নসীমা নেই। কোনো শিশু যদি প্রশ্নের অর্থ অনুধাবন করতে পারে এবং যুক্তিযুক্ত উত্তর দিতে পারে, তবে তার সাক্ষ্য আইনত সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য।
  • আদালত শিশুটির জবানবন্দি গ্রহণের পূর্বে তার বুদ্ধিমত্তা যাচাইয়ের জন্য কিছু প্রাথমিক প্রশ্ন (Voir Dire Test) করে সন্তুষ্ট হবেন।
  • তবে শিশুরা সহজেই প্ররোচিত (Tutored) হওয়ার ঝুঁকিতে থাকায় সুপ্রিম কোর্টের নীতি হলো—অন্য কোনো বিশ্বস্ত পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত (Corroborated) না হলে কেবল শিশু সাক্ষীর একক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

২. বোবা সাক্ষীর সাক্ষ্য (Dumb Witness – Section 119):

  • যে ব্যক্তি কথা বলতে অক্ষম, সে প্রকাশ্য আদালতে লিখে বা আকার-ইঙ্গিতে (Signs) তার বক্তব্য পেশ করতে পারে। এটি আইনের চোখে প্রত্যক্ষ মৌখিক সাক্ষ্য (Oral Evidence) হিসেবেই গণ্য হবে।

৩. বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্য (Hostile Witness – Section 154):

  • কোনো সাক্ষী যদি নিজ পক্ষের বিরুদ্ধে চলে যায় বা সত্য গোপন করে, আদালত তাকে বৈরী ঘোষণা করে নিজ আইনজীবীকে জেরা করার অনুমতি দেন।
  • বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্য সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যায় না; সাক্ষ্যের যে অংশ সত্য ও অন্যান্য প্রমাণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আদালত সেই অংশ গ্রহণ করতে পারেন।

৪. মূল দলিলের ফটোকপি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য কি? (শর্তসাপেক্ষে হাঁ):

  • সাধারণ নিয়মে ফটোকপি একটি মাধ্যমিক সাক্ষ্য (Secondary Evidence under Section 63(2))। মূল দলিল বিদ্যমান থাকা অবস্থায় নিছক ফটোকপি সরাসরি গ্রহণীয় নয় (Section 64)।
  • কিন্তু ধারা ৬৫-এর শর্তাবলী পূরণ হলে ফটোকপি গ্রহণ করা যায়:
    1. মূল দলিলটি ধ্বংস হয়ে গেলে বা হারিয়ে গেলে;
    2. মূল দলিলটি প্রতিপক্ষের দখলে থাকলে এবং নোটিশ দেওয়ার পরও সে দাখিল না করলে;
    3. ফটোকপিটি মূল দলিলের সাথে তুলনা করে প্রস্তুত করা হয়েছে মর্মে উপযুক্ত সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হলে।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স

১. আব্দুল মান্নান বনাম রাষ্ট্র (47 DLR AD 45): শিশু সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য তবে সতর্কতা হিসেবে পারিপার্শ্বিক সমর্থন নেওয়া সমীচীন।

২. রূপালী ব্যাংক বনাম মেসার্স আজাদ ব্রাদার্স (52 DLR 188): মূল দলিলের অনুপস্থিতির যৌক্তিক কারণ প্রমাণ ব্যতিরেকে ফটোকপি সরাসরি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা বেআইনি।

৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত

সাক্ষ্য আইন সত্য উদ্ঘাটনের স্বার্থে শিশু, বোবা ও বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্যকে বিশেষ সুরক্ষায় গ্রহণ করে এবং ফটোকপির ক্ষেত্রে মূল দলিলের সুরক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখে।

৪. শিশু, বোবা ও বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের বিশেষ পদ্ধতি

সাক্ষ্য আইনের বিভিন্ন ধারায় বিশেষ সাক্ষীদের যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার নিয়মাবলী নিম্নরূপ:

  • শিশু সাক্ষী (ধারা ১১৮ ও Voir Dire Test): শিশু যদি প্রশ্নের মর্ম অনুধাবন করে যুক্তিসঙ্গত উত্তর দিতে সক্ষম হয়, তবে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য; আদালত সাক্ষ্য গ্রহণের পূর্বে প্রাথমিক পরীক্ষা (Voir Dire Test) গ্রহণ করেন;
  • বোবা সাক্ষী (ধারা ১১৯): বোবা ব্যক্তি যদি প্রকাশ্যে লিখে বা বোধগম্য শারীরিক ইঙ্গিতে বক্তব্য প্রকাশ করে, তবে তা মৌখিক সাক্ষ্য (Oral Evidence) হিসেবে গণ্য হবে;
  • ফটোকপির সাক্ষ্যমূল্য (ধারা ৬৫): সাধারণ নিয়মে ফটোকপি গ্রহণযোগ্য নয়; তবে মূল দলিল হারানো গেলে বা প্রতিপক্ষের হেফাজতে থাকলে যথাযথ শর্ত পূরণ সাপেক্ষে গৌণ সাক্ষ্য (Secondary Evidence) হিসেবে গ্রহণযোগ্য।

৫. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির

সুপ্রিম কোর্ট (রাষ্ট্র বনাম লাল মিয়া, 44 DLR 310) মামলায় সিদ্ধান্ত দেন যে, শিশু সাক্ষীর বক্তব্য অত্যন্ত যত্ন সহকারে পরীক্ষা করতে হবে যেন সে কোনো অভিভাবক দ্বারা প্রভাবিত বা শিখিয়ে দেওয়া (Tutored) না হয়।

৬. ডিজিটাল ডিভাইস ও ইলেকট্রনিক রেকর্ডের সাক্ষ্যিক মর্যাদা (Evidence Act সংশোধনী ২০২২)

সাক্ষ্য আইনের আধুনিক সংশোধনী অনুযায়ী ডিজিটাল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ, অডিও-ভিডিও ক্লিপ এবং ডিজিটাল ফটোকপি প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য। তবে এ ক্ষেত্রে তথ্যের বিশ্বস্ততা (Authenticity of Hash Value) এবং ডিভাইসটির আইনি বৈধতা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। ডিজিটাল প্রমাণ উপস্থাপনকালে মূল ডিভাইসের হেফাজতকারীকে আদালতে সাক্ষ্য দিতে হবে।

আইনি সিদ্ধান্ত: সাক্ষ্য আইনের মূল ভিত্তি হলো সত্য আবিষ্কার; সাক্ষীর বয়স বা শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্যের পথে অন্তরায় নয়, যদি আদালতের বিচারিক সন্তুষ্টিতে সাক্ষ্যের নির্ভরতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।

পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সতর্কতা: শিশুর জবানবন্দি গ্রহণের ক্ষেত্রে আদালতের ভোয়ার ডায়ার পরীক্ষা এবং ইলেকট্রনিক প্রমাণের ফরেনসিক সার্টিফিকেটের গুরুত্ব পরীক্ষায় বিশদভাবে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়।

Related Articles

Back to top button