সন্তানের সার্বিক কল্যাণই হেফাজত নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড, পিতা-মাতার আর্থিক বৈষম্য নয়: হাইকোর্ট

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০ (Guardians and Wards Act, 1890)-এর ১৭ ও ২৫ ধারার আওতায় অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের হেফাজত (Custody / Hizanat) সংক্রান্ত এক মানবিক ও যুগান্তকারী রায়ে ঘোষণা করেছেন যে, পিতা ও মাতার মধ্যে সন্তান কার জিম্মায় থাকবে তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পিতা বা মাতার ব্যক্তিগত সামাজিক মর্যাদা বা বিপুল আর্থিক বৈষম্য কোনো নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে না। আইনের একমাত্র ও চূড়ান্ত মূলনীতি হলো— “The welfare of the minor is the paramount consideration.” অর্থাৎ সন্তানের শারীরিক নিরাপত্তা, মানসিক শান্তি, শিক্ষাদীক্ষা ও আবেগগত বিকাশ যে পক্ষের কাছে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকবে, সন্তান সেখানেই থাকবে। পিতার উচ্চতর আয়ের দোহাই দিয়ে মায়ের স্নেহ ও প্রাকৃতিক সান্নিধ্য থেকে শিশুকে বিচ্ছিন্ন করা আইনত সম্পূর্ণ বেআইনি। শিশুর হেফাজত মায়ের অনুকূলেই বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (Facts of the Case)

আলোচ্য পারিবারিক মোকদ্দমাটি ঢাকা জেলার পারিবারিক আদালত (Family Court) এবং সহকারী জজ আদালতে দায়েরকৃত পারিবারিক মোকদ্দমা নং ৯৪/২০২০ থেকে উদ্ভূত। মামলার পক্ষগণ উভয়েই পেশাজীবী চিকিৎসক।

পিতা ডা. মো. নাজমুল হাসান এবং মাতা ডা. ফারজানা সুলতানার মধ্যে পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝি ও মতপার্থক্যের কারণে ২০১৯ সালে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তাদের ঔরসজাত একমাত্র পুত্রসন্তান (বয়স বর্তমানে ৭ বছর) মায়ের জিম্মায় লালিত-পালিত হচ্ছিল। মাতা ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করার পাশাপাশি সন্তানের পড়াশোনা, স্কুলিং ও স্বাস্থ্যের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান করে আসছিলেন।

পিতা ডা. নাজমুল হাসান উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালীন সময়ে দেশে ফিরে সন্তানকে নিজের পূর্ণ জিম্মায় নেওয়ার দাবি জানিয়ে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। পিতার মূল আরজি ছিল, তিনি একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী, তার বিপুল সম্পত্তি ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে যা দিয়ে তিনি সন্তানকে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা দিতে পারবেন। অন্যদিকে মাতা বাংলাদেশে কর্মরত এবং পিতা দাবি করেন যে মায়ের জিম্মায় থাকলে সন্তান উন্নত ভবিষ্যৎ থেকে বঞ্চিত হবে। পারিবারিক আদালত উভয় পক্ষের সাক্ষ্য এবং খোদ শিশুটির মানসিক অবস্থা খতিয়ে দেখে সন্তানের হেফাজত মায়ের অনুকূলেই বহাল রাখেন এবং পিতাকে প্রতি মাসে সন্তানের সাথে দেখা করার (Visitation Rights) নির্দেশ দেন। পিতা উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে আপিল করে ব্যর্থ হয়ে মহামান্য হাইকোর্টে এই সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।

২. বাদী ও বিবাদীর মুখোমুখি আইনি অবস্থান (Pleadings & Contentions)

🟢 পিতা-পিটিশনারের আইনি যুক্তি (Father’s Case)

  • মুসলিম আইনে পুত্রসন্তানের বয়স ৭ বছর অতিক্রান্ত হলে পিতার প্রাকৃতিক অভিভাবকত্ব (Natural Guardian) অগ্রাধিকার পায়।
  • পিতা আর্থিকভাবে মায়ের চেয়ে বহুগুণ সমৃদ্ধ এবং বিদেশে সন্তানের উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সক্ষম।
  • মাতা সার্বক্ষণিক পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকেন, ফলে সন্তানের সঠিক পরিচর্যা ব্যাহত হচ্ছে।

🔴 মাতা-রেসপনডেন্টের আইনি যুক্তি (Mother’s Case)

  • শিশুটির জন্মের পর থেকে পিতা প্রবাসে থাকায় মাতার কোলেই সে পরম স্নেহে বড় হয়েছে এবং মায়ের প্রতি তার গভীর আবেগীয় বন্ধন রয়েছে।
  • টাকা দিয়ে কখনো মায়ের মমতা ও স্নেহ কেনা যায় না; মাতা একজন চিকিৎসক এবং তিনি সন্তানকে মানসম্পন্ন স্কুলে পড়াচ্ছেন।
  • আর্থিক খরচ বহনের দায়িত্ব পিতার আইনগত কর্তব্য, তবে তার মানে এই নয় যে টাকা দেখিয়ে সন্তানকে ছিনিয়ে নেওয়া যাবে।

৩. অধস্তন আদালতের রায় ও সিদ্ধান্তের পর্যালোচনা (Judgments of Lower Courts)

পারিবারিক আদালত এবং জেলা জজ আদালত উভয় আদালতই সুস্পষ্টভাবে দেখতে পান যে শিশুটি পিতার চেয়ে মায়ের সাথে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। পিতা দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকায় সন্তানের সাথে তার কোনো গভীর আত্মিক সংযোগ গড়ে ওঠেনি। হঠাৎ করে সন্তানকে মায়ের কোল থেকে বিচ্ছিন্ন করে যুক্তরাজ্যে নিয়ে গেলে শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। ফলে উভয় আদালতই হেফাজত মায়ের হাতে রাখার রায় দেন।

৪. হাইকোর্ট বিভাগের গভীর আইনি পর্যবেক্ষণ ও নজির বিশ্লেষণ (High Court’s Reasoning & Ratio Decidendi)

মাননীয় বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইনের ১৭ ধারার আইনি নীতি এবং বাংলাদেশ ও উপমহাদেশীয় সুপ্রিম কোর্টের নজিরসমূহ তুলে ধরেন:

📌 মুসলিম ব্যক্তিগত আইন বনাম শিশুর কল্যাণ:

আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত (Abu Baker Siddique vs. Ayesha Guha, 38 DLR (AD) 106) স্মরণ করিয়ে দিয়ে আদালত বলেন, মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে ৭ বছর পর পিতার জিম্মায় যাওয়ার যে সাধারণ ধারণা রয়েছে, তা কোনো অপরিবর্তনীয় কঠোর নিয়ম নয়। ১৮৯০ সালের অভিভাবক আইনের ১৭ ধারার আলোকে যদি আদালত দেখে যে মায়ের জিম্মায় থাকাই শিশুর জন্য অধিকতর কল্যাণকর, তবে আদালত ব্যক্তিগত আইনের সীমানা অতিক্রম করে মায়ের কাছেই হেফাজত বহাল রাখবেন।

📌 পিতার আর্থিক প্রাচুর্য সন্তানের ভালোবাসার বিকল্প নয়:

আদালত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পর্যবেক্ষণ করেন যে— “Wealth and material luxury cannot be a substitute for a mother’s natural affection and constant care.” পিতার প্রচুর অর্থ থাকতে পারে, কিন্তু সন্তানের শারীরিক ও মানসিক পরিপক্বতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মায়ের পরম মমতার চেয়ে বড় কোনো ফ্যাক্টর হতে পারে না।

৫. হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় ও দিকনির্দেশনা (Final Verdict & Directions)

মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ পিতার রিভিশন আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেন এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্রের হেফাজত মায়ের জিম্মায় পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল রাখেন। তবে পিতা যাতে সন্তানের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত না হন, সেজন্য পিতাকে প্রতি মাসের প্রথম ও তৃতীয় শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সন্তানের সাথে সাক্ষাৎ ও সময় কাটানোর বিস্তারিত দিকনির্দেশনা (Visitation Schedule) প্রদান করা হয়। এছাড়া সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় বহন করার জন্য পিতাকে নিয়মিত ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ বহাল রাখা হয়।

৬. রায়ের মূল আইনি শিক্ষা ও নজির (Core Legal Principles & Ratio)

  • শিশুর কল্যাণই সর্বোচ্চ আইন: হেফাজতের মামলায় পিতা বা মাতার কোনো পক্ষীয় জেদ বা অধিকার নয়, শিশুর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা এবং কল্যাণই আদালতের একমাত্র বিবেচনা।
  • আর্থিক বৈষম্য বিবেচ্য নয়: মা কম আয় করলেও বা চাকরিজীবী হলেও শিশুর ওপর থেকে তার হেফাজত কেড়ে নেওয়া যাবে না।
  • সাক্ষাৎকারের ভারসাম্যপূর্ণ অধিকার: হেফাজত একজনের কাছে থাকলেও অপর অভিভাবকের দেখা করার অধিকার সুনিশ্চিত করা আদালতের দায়িত্ব।

৭. সাধারণ নাগরিক ও আইনজীবীদের জন্য ৫টি জরুরি সতর্কতা ও করণীয়

  1. সন্তানকে ব্যক্তিগত বিরোধের অস্ত্র না বানানো: দাম্পত্য কলহের জেরে সন্তানকে অপর পক্ষের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তোলা থেকে বিরত থাকুন; আদালত এটি গুরুত্বের সাথে লক্ষ্য করে।
  2. শিশুর ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া: শিশু বোঝার মতো বয়সে পৌঁছালে আদালত একান্তে তার মতামত গ্রহণ করে, তাই জোর করে সন্তানকে নিজের কাছে টানার চেষ্টা হিতে বিপরীত হতে পারে।
  3. ভরণপোষণ নিয়মিত পরিশোধ: পিতার মনে রাখা আবশ্যক যে সন্তান যার কাছেই থাকুক, তার ভরণপোষণ প্রদান পিতার বাধ্যতামূলক আইনগত দায়িত্ব।
  4. ভিজিটেশন রাইটস স্পষ্ট করা: পারিবারিক আদালতের ডিক্রিতে দেখা করার দিন, সময় ও স্থান সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করে নেওয়া উচিত যাতে পরবর্তীতে সংঘাত না হয়।
  5. মায়ের পুনঃবিবাহে আইনি সুরক্ষা: মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে হলেই সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাবার কাছে চলে যায় না, যদি সৎপিতার ঘরে শিশুর কোনো অযত্ন বা ঝুঁকি না থাকে।

📋 মামলার পরিচিতি ও অফিশিয়াল সুপ্রিম কোর্ট রেফারেন্স
মামলার নম্বর Civil Revision No. 3812 of 2023
আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (মাননীয় বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী)
পক্ষগণ ডা. মো. নাজমুল হাসান (পিতা-দরখাস্তকারী) বনাম ডা. ফারজানা সুলতানা (মাতা-রেসপনডেন্ট)
আইন ও প্রাসঙ্গিক ধারা Guardians and Wards Act, 1890 (Sections 17, 25), Family Courts Act, 2023
অফিশিয়াল সুপ্রিম কোর্ট রায় (PDF)
📥 সুপ্রিম কোর্টের মূল ভেরিফায়েড রায় ডাউনলোড করুন (PDF)

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button