Advocate ও Lawyer পার্থক্য

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তা, খবরের কাগজ, এমনকি সিনেমা বা নাটকেও আমরা প্রায়শই ‘Lawyer’ (ল’ইয়ার) এবং ‘Advocate’ (অ্যাডভোকেট) শব্দ দুটিকে সমার্থক বা একই অর্থে ব্যবহার হতে দেখি। অনেকেই মনে করেন যিনি ল’ইয়ার, তিনিই অ্যাডভোকেট; আবার যিনি অ্যাডভোকেট, তিনিই ল’ইয়ার। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এবং সাধারণ অভিধানের অর্থে এদের কাজ প্রায় একই রকম মনে হলেও, আইনি দৃষ্টিকোণ (Legal perspective) থেকে এবং বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত দিক থেকে এই দুটি শব্দের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।
আইন পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থী, বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষ এবং আইনের প্রতি কৌতূহলী পাঠকদের জন্য এই দুটি পদবির মধ্যকার সূক্ষ্ম অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্যগুলো জানা অপরিহার্য। আজকের এই দীর্ঘ ও গবেষণাধর্মী কলামে আমরা বাংলাদেশের The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972-এর আলোকে Lawyer এবং Advocate-এর সংজ্ঞা, তাদের কাজের পরিধি, যোগ্যতার মানদণ্ড এবং এর পাশাপাশি Barrister (ব্যারিস্টার), Solicitor (সলিসিটর) ও Attorney (অ্যাটর্নি)-এর মতো আইনি পদবিগুলোর প্রকৃত অর্থ ও পার্থক্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করব।
১. Lawyer (আইনজীবী) আসলে কে?
সহজ এবং আক্ষরিক অর্থে, Lawyer বা আইনজীবী হলো একটি সাধারণ ও বিস্তৃত শব্দ (Umbrella term)। যে ব্যক্তি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং আইন বিষয়ে একটি স্বীকৃত ডিগ্রি (Law Degree) অর্জন করেছেন, তাকেই Lawyer বলা হয়।
শিক্ষাগত যোগ্যতা (Educational Qualification)
বাংলাদেশে কোনো ব্যক্তি যদি কোনো সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ বছর মেয়াদী LL.B (Honours) সম্পন্ন করেন, অথবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২ বছর মেয়াদী LL.B (Pass) ডিগ্রি অর্জন করেন, তবে তিনি স্নাতক হওয়ার সাথে সাথেই একজন Lawyer হিসেবে পরিগণিত হবেন। এমনকি কেউ যদি বিদেশ থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে আসেন, তিনিও আইনের একজন ছাত্র বা ল’ইয়ার হিসেবেই বিবেচিত হবেন।
কাজের পরিধি (Scope of Work)
একজন Lawyer-এর কাজের পরিধি প্রধানত আইনি পরামর্শ এবং ড্রাফটিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তিনি যা করতে পারেন:
- Legal Advice (আইনি পরামর্শ): তিনি যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আইনি বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন।
- Drafting (মুসাবিদা): বিভিন্ন আইনি দলিল, যেমন- চুক্তিপত্র (Contracts), উইল (Will), আইনি নোটিশ (Legal Notice) তৈরি করতে পারেন।
- Corporate Sector (কর্পোরেট খাত): বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে লিগ্যাল অফিসার (Legal Officer) বা ইন-হাউস লিগ্যাল কাউন্সেল (In-house Legal Counsel) হিসেবে চাকরি করতে পারেন।
- Academia & Research (শিক্ষকতা ও গবেষণা): তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়াতে পারেন বা কোনো সংস্থায় লিগ্যাল রিসার্চার হিসেবে কাজ করতে পারেন।
সীমাবদ্ধতা (Legal Limitations)
একজন Lawyer-এর সবচেয়ে বড় আইনি সীমাবদ্ধতা হলো, তার Right of Audience বা আদালতে দাঁড়িয়ে বিচারকের সামনে মামলা পরিচালনা করার কোনো আইনি অধিকার নেই। তিনি কোনো মক্কেলের (Client) পক্ষে আদালতে উপস্থিত হতে পারবেন না, জেরা করতে পারবেন না বা বিচারকের সামনে আইনি যুক্তি (Argue) উপস্থাপন করতে পারবেন না। তিনি শুধু পর্দার আড়ালে থেকে আইনি সহায়তা দিতে পারেন।
২. Advocate (অ্যাডভোকেট) কে?
Advocate শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘Advocatus’ থেকে, যার অর্থ হলো এমন একজন ব্যক্তি যাকে অন্যের পক্ষে কথা বলার জন্য ডাকা হয়েছে। আইনি ভাষায়, Advocate হলেন সেই ব্যক্তি যিনি একজন Lawyer হওয়ার পাশাপাশি দেশের সর্বোচ্চ আইনজীবী নিয়ন্ত্রক সংস্থা (Bar Council) কর্তৃক নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত (Enrolled) হয়েছেন এবং যার আদালতে মক্কেলের পক্ষে মামলা পরিচালনা করার আইনি লাইসেন্স রয়েছে।
আইনি সমীকরণ:
“সকল Advocate-ই Lawyer, কিন্তু সকল Lawyer Advocate নন।”
অ্যাডভোকেট হওয়ার প্রক্রিয়া (The Journey from Lawyer to Advocate)
বাংলাদেশে একজন Lawyer-কে Advocate হতে হলে তাকে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল (Bangladesh Bar Council)-এর একটি অত্যন্ত কঠিন ও সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়:
- প্রথমে তাকে এলএল.বি (LL.B) পাস করতে হবে (অর্থাৎ তাকে Lawyer হতে হবে)।
- এরপর একজন সিনিয়র অ্যাডভোকেটের অধীনে কমপক্ষে ৬ মাসের শিক্ষানবিশকাল (Pupillage) সম্পন্ন করতে হবে।
- বার কাউন্সিলের অধীনে পর্যায়ক্রমে তিনটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় (এমসিকিউ, লিখিত এবং ভাইভা) উত্তীর্ণ হতে হবে।
এই তিনটি ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বাংলাদেশ বার কাউন্সিল তাকে একটি সনদ (License) বা Advocateship Certificate প্রদান করে। এই সনদ প্রাপ্তির পরই একজন ল’ইয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অ্যাডভোকেট’ পদবি ব্যবহারের অধিকার লাভ করেন এবং জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হয়ে আদালতে প্র্যাকটিস করার আইনি যোগ্যতা অর্জন করেন।
কাজের পরিধি এবং আইনি অধিকার (Scope and Legal Rights)
একজন Advocate-এর কাজের পরিধি একজন Lawyer-এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত এবং ক্ষমতাশীল:
- Right of Audience (আদালতে উপস্থিতির অধিকার): অ্যাডভোকেটদের বিচারিক আদালতে (Trial Court) উপস্থিত হয়ে বিচারকের সামনে মক্কেলের পক্ষে সওয়াল-জবাব (Argue) করার নিরঙ্কুশ অধিকার রয়েছে।
- Vakalatnama (ওকালতনামা স্বাক্ষর): আদালতে কোনো মামলা পরিচালনার জন্য মক্কেল তার আইনজীবীকে যে ক্ষমতা অর্পণ করেন, তাকে ওকালতনামা বলা হয়। একজন Lawyer কখনোই ওকালতনামায় স্বাক্ষর করতে পারেন না; এটি কেবল একজন Advocate-এর আইনি অধিকার।
- Cross-examination (জেরা করা): আদালতে সাক্ষীদের জবানবন্দি নেওয়া এবং জেরা করা কেবল একজন অ্যাডভোকেটই করতে পারেন।
৩. Advocate বনাম Lawyer: মূল পার্থক্যসমূহ (Head-to-Head Comparison)
বিষয়বস্তুকে আরও সহজভাবে বোঝার জন্য Advocate এবং Lawyer-এর মধ্যকার মূল পার্থক্যগুলো নিচে তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:
ক. সংজ্ঞাগত ও লাইসেন্সগত পার্থক্য
Lawyer: যিনি আইন বিষয়ে ডিগ্রি (LLB) অর্জন করেছেন, তিনিই Lawyer। এর জন্য কোনো বিশেষ লাইসেন্স বা পেশাগত সনদের প্রয়োজন নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিই তার প্রধান পরিচয়।
Advocate: যিনি আইন ডিগ্রি অর্জনের পর বার কাউন্সিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আদালতে মামলা পরিচালনার লাইসেন্স বা সনদ পেয়েছেন, তিনি হলেন Advocate। লাইসেন্স ছাড়া কেউ Advocate হতে পারেন না।
খ. নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা (Regulatory Body)
Lawyer: একজন Lawyer মূলত যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন তার একাডেমিক কাঠামোর অধীনে থাকেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) তাদের শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু পেশাগতভাবে তাদের ওপর কোনো সুনির্দিষ্ট বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রণ নেই।
Advocate: অ্যাডভোকেটদের পেশাগত আচরণ, শৃঙ্খলা এবং লাইসেন্স সরাসরি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল (Bangladesh Bar Council) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কোনো অ্যাডভোকেট যদি পেশাগত অসদাচরণ (Professional Misconduct) করেন, তবে বার কাউন্সিল তার লাইসেন্স সাময়িক বা চিরতরে বাতিল (Cancel) করে দিতে পারে।
গ. প্রতিনিধিত্ব (Representation in Court)
Lawyer: একজন Lawyer আদালতে বিচারকের সামনে তার ক্লায়েন্টকে উপস্থাপন বা প্রতিনিধিত্ব (Represent) করতে পারেন না।
Advocate: একজন Advocate আইনিভাবে তার ক্লায়েন্টের পক্ষে আদালতে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত। তিনি ক্লায়েন্টের আইনি মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন।
ঘ. ড্রেস কোড (Dress Code and Attire)
Lawyer: কর্পোরেট বা ইন-হাউস ল’ইয়াররা সাধারণত ফর্মাল পোশাক (যেমন- স্যুট-টাই) পরেন। তাদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আইনি ড্রেস কোড নেই।
Advocate: বিচারালয়ে উপস্থিত হওয়ার সময় একজন অ্যাডভোকেটকে অবশ্যই বার কাউন্সিল নির্ধারিত পেশাগত ড্রেস কোড অনুসরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে কালো কোর্ট, সাদা শার্ট, কালো টাই/ব্যান্ড (Band) এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কালো গাউন (Gown)। একজন সাধারণ Lawyer এই গাউন বা ব্যান্ড পরে আদালতে প্রবেশ করতে পারেন না; এটি আইনত দণ্ডনীয়।
ঙ. পদবির ব্যবহার (Use of Designation)
Lawyer: নামের আগে ‘অ্যাডভোকেট’ (Adv.) লেখার কোনো আইনি অধিকার একজন ল’ইয়ারের নেই। তারা সাধারণত ‘Legal Advisor’ বা ‘Legal Consultant’ পদবি ব্যবহার করেন।
Advocate: লাইসেন্স পাওয়ার পর একজন ব্যক্তি গর্বের সাথে তার নামের আগে ‘অ্যাডভোকেট’ (Advocate) পদবি ব্যবহার করতে পারেন।
৪. আইনি অঙ্গনের অন্যান্য পদবি (Other Legal Titles and Meanings)
Lawyer এবং Advocate ছাড়াও আইনি অঙ্গনে আরও বেশ কিছু পদবি রয়েছে, যেগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচুর বিভ্রান্তি কাজ করে। বিশেষ করে ব্যারিস্টার, সলিসিটর এবং অ্যাটর্নি শব্দগুলোর প্রয়োগ দেশভেদে ভিন্ন হয়। বাংলাদেশের আইনি কাঠামোর আলোকে এই পদবিগুলোর অর্থ নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
ক. Barrister (ব্যারিস্টার)
আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত এবং মর্যাদাপূর্ণ আইনি পদবিগুলোর একটি হলো ‘ব্যারিস্টার’। অনেকেই মনে করেন ব্যারিস্টার মানেই অ্যাডভোকেটের চেয়ে অনেক বড় কিছু। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি ভুল ধারণা।
ব্যারিস্টার কে? যিনি যুক্তরাজ্য (UK) থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে বার-অ্যাট-ল (Bar-at-Law) বা Bar Professional Training Course (BPTC) সম্পন্ন করেছেন এবং যুক্তরাজ্যের কোনো একটি ‘ইন’ (যেমন- Lincoln’s Inn, Gray’s Inn) থেকে Call to the Bar প্রাপ্ত হয়েছেন, তাকেই Barrister বলা হয়। যুক্তরাজ্যের বিচারব্যবস্থায় মূলত ব্যারিস্টাররাই উচ্চ আদালতে মামলা পরিচালনা করেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: একজন ব্যক্তি যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টার হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসলেই তিনি সরাসরি বাংলাদেশের আদালতে মামলা পরিচালনা করতে পারবেন না। বাংলাদেশে ফিরলে তিনি মূলত একজন Lawyer হিসেবেই গণ্য হবেন। বাংলাদেশের আদালতে প্র্যাকটিস করতে হলে তাকে অবশ্যই বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে Advocate হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে হবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশে প্র্যাকটিসরত একজন ব্যারিস্টারকে আইনিভাবে ‘অ্যাডভোকেট’ হিসেবেই গণ্য করা হয়। তবে ব্রিটিশ আইনের উচ্চতর ডিগ্রির কারণে সমাজে তাদের একটি বাড়তি কদর ও সম্মান রয়েছে।
খ. Solicitor (সলিসিটর)
বাংলাদেশে ‘সলিসিটর’ পদবিটির খুব একটা প্রচলন নেই, এটি মূলত যুক্তরাজ্য (UK), অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার আইনি ব্যবস্থার অংশ। যুক্তরাজ্যের আইন ব্যবস্থায় আইনজীবীরা দুটি ভাগে বিভক্ত: ব্যারিস্টার এবং সলিসিটর।
সলিসিটর কে? সলিসিটর হলেন সেই ল’ইয়ার, যিনি সরাসরি মক্কেলের (Client) সাথে যোগাযোগ করেন, আইনি পরামর্শ দেন, মামলার নথিপত্র প্রস্তুত করেন (Drafting) এবং ছোটখাটো আদালতে মামলা লড়েন। কিন্তু উচ্চ আদালতে মামলা লড়ার জন্য সলিসিটররা মক্কেলের পক্ষ থেকে একজন ‘ব্যারিস্টার’ নিয়োগ করেন। অর্থাৎ, সলিসিটররা হলেন গ্রাউন্ড-লেভেল ল’ইয়ার। বাংলাদেশে যেহেতু লিটিগেশন ল’ইয়ারদের কাজের কোনো বিভাজন নেই (একজন অ্যাডভোকেটই ড্রাফটিং এবং কোর্টে হিয়ারিং উভয় কাজ করেন), তাই বাংলাদেশে সলিসিটর প্রথার অস্তিত্ব নেই। তবে বাংলাদেশ সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ে ‘সলিসিটর উইং’ নামে একটি শাখা রয়েছে, যারা সরকারের আইনি বিষয়াবলি তদারকি করে।
গ. Attorney (অ্যাটর্নি)
এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র (USA) এবং কানাডার আইনি পদবি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাকে ‘Attorney-at-Law’ বলা হয়, বাংলাদেশে তাকেই Advocate বলা হয়। অর্থাৎ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আদালতে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীকে অ্যাটর্নি বলা হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশে সাধারণ আইনজীবীদের ‘অ্যাটর্নি’ বলা হয় না। তবে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সরকার সুপ্রিম কোর্টে যে আইনজীবীদের নিয়োগ দেয়, তাদের পদবিতে ‘অ্যাটর্নি’ শব্দটি যুক্ত থাকে। যেমন-
- Attorney General (অ্যাটর্নি জেনারেল): রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা।
- Additional Attorney General (অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল)
- Deputy Attorney General (ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল)
- Assistant Attorney General (সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল)
এছাড়া, কাউকে যখন কোনো আইনি কাজের ক্ষমতা লিখিতভাবে অর্পণ করা হয়, তখন তাকে ‘Power of Attorney’ (আমমোক্তারনামা) বলা হয় এবং যিনি এই ক্ষমতা পান, তাকে ওই নির্দিষ্ট কাজের জন্য অ্যাটর্নি হিসেবে গণ্য করা হয় (তিনি পেশাদার আইনজীবী নাও হতে পারেন)।
ঘ. Public Prosecutor (PP) এবং Government Pleader (GP)
অধস্তন আদালতে (জেলা জজ কোর্টে) সরকার বা রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য সরকার যেসব অ্যাডভোকেটদের নিয়োগ দেয়, তাদের আলাদা আইনি পদবি রয়েছে:
- Public Prosecutor (পাবলিক প্রসিকিউটর বা পিপি): যিনি ফৌজদারি (Criminal) মামলায় রাষ্ট্রের পক্ষে প্রসিকিউশন পরিচালনা করেন।
- Government Pleader (গভর্নমেন্ট প্লিডার বা জিপি): যিনি দেওয়ানি (Civil) মামলায় সরকারের পক্ষে আইনি লড়াই করেন।
এরা সবাই পেশায় অ্যাডভোকেট, তবে সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় তারা এই বিশেষ পদবিগুলো ধারণ করেন।
৫. পদবির অপব্যবহার এবং আইনি পরিণতি (Misuse of Titles and Legal Consequences)
আইন পেশা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মর্যাদাপূর্ণ পেশা। সাধারণ মানুষের আইনি অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অনেক সময় কিছু অসাধু ব্যক্তি বা শুধুমাত্র ল’ পাস করা ব্যক্তি নিজেদের ‘অ্যাডভোকেট’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা করেন।
The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972-এর Article 41 অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্ত বা এনরোলড (Enrolled) না হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে ‘অ্যাডভোকেট’ হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দেন, অথবা জালিয়াতির মাধ্যমে আদালতে প্র্যাকটিস করার চেষ্টা করেন, তবে তা একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে ওই ভুয়া আইনজীবীকে ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড (Imprisonment) অথবা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।
অনেক সময় ল’ ক্লার্ক বা মহুরিরা (যাদের ল’ ডিগ্রিও নেই) নিজেদের উকিল বা অ্যাডভোকেট বলে দাবি করে মক্কেলদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেন। এ ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে একজন বিচারপ্রার্থীর উচিত প্রথমেই আইনজীবীর বার কাউন্সিলের পরিচয়পত্র বা লাইসেন্স চেক করা এবং তিনি সংশ্লিষ্ট জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য কি না, তা নিশ্চিত হওয়া।
৬. কখন কার কাছে যাবেন? (When to approach whom?)
সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনার আইনি সমস্যার ধরন অনুযায়ী কার কাছে যাওয়া উচিত, তা জানা অত্যন্ত জরুরি:
- আপনার যদি একটি জমি কেনার চুক্তিপত্র (Deed) ড্রাফট করার প্রয়োজন হয়, কোনো কোম্পানির আইনি পলিসি তৈরি করতে হয়, অথবা আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য পরামর্শের প্রয়োজন হয়— তবে আপনি একজন দক্ষ Lawyer বা Legal Consultant-এর কাছে যেতে পারেন।
- কিন্তু আপনার যদি জমিটি কেউ দখল করে নেয় এবং আপনি তাকে উচ্ছেদ করার জন্য দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে চান, অথবা আপনার নামে থানায় কোনো মিথ্যা ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয় এবং আপনার আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন (Bail) নেওয়ার প্রয়োজন হয়— তবে আপনাকে অবশ্যই একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত Advocate-এর শরণাপন্ন হতে হবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, Lawyer এবং Advocate শব্দ দুটি শুনতে একই রকম লাগলেও, আইনি প্রয়োগ, অধিকার এবং দায়বদ্ধতার দিক থেকে এরা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি সত্তা। এলএল.বি (LLB) ডিগ্রি অর্জন করা একজন মানুষের আইন শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে এবং তাকে Lawyer হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে, বার কাউন্সিলের কঠিন পরীক্ষা, বিচারিক কাঠামোর কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং পেশাগত আচরণবিধির (Professional Ethics) অগ্নিপরীক্ষা পার হয়ে একজন ল’ইয়ার যখন লাইসেন্স অর্জন করেন, তখনই তিনি একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ পেশার অংশীদার হিসেবে Advocate-এ রূপান্তরিত হন।
সমাজের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন (Rule of Law) সমুন্নত রাখার জন্য Lawyer এবং Advocate— উভয়েরই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কর্পোরেট টেবিল থেকে শুরু করে আদালতের এজলাস পর্যন্ত— আইনজ্ঞদের এই সম্মিলিত জ্ঞান ও প্রচেষ্টাই মূলত একটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থাকে সচল ও প্রাণবন্ত রাখে। তাই আইনি সেবা গ্রহণের সময় পদবির এই সুস্পষ্ট পার্থক্যগুলো জানা থাকলে একজন নাগরিক যেমন প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পান, তেমনি তিনি সঠিক সময়ে সঠিক আইনি প্রতিকার লাভেও সক্ষম হন।

