মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর অতীত বা বকেয়া খোরপোষ (Past Maintenance) প্রদান স্বামীর নিঃশর্ত আইনি বাধ্যবাধকতা: হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত: মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৯ ধারা এবং মুসলিম আইনশাস্ত্রের শাফেয়ী ও আধুনিক সুন্নি দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে স্ত্রী শুধুমাত্র ভবিষ্যৎ খোরপোষই নয়, বরং স্বামীর অবহেলায় বিগত বছরগুলোতে বঞ্চিত থাকা ‘অতীত বা বকেয়া খোরপোষ’ (Past Maintenance) পাওয়ার পূর্ণ সংবিধিবদ্ধ অধিকারী। স্বামী স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে ত্যাগ বা অবহেলা করলে অতীত খোরপোষের দায় কোনো অবস্থাতেই মওকুফ হয় না। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এই সিদ্ধান্ত দেশের আইন অঙ্গনে একটি ঐতিহাসিক ও ল্যান্ডমার্ক দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে।
মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর ভরণপোষণ বা খোরপোষ (Maintenance / Nafaqah) কোনো অনুকম্পা নয়, বরং এটি বৈবাহিক চুক্তির এক অপরিহার্য ও মৌলিক শর্ত। অতীতে হানাফি ফিকহের একটি প্রাচীন ব্যাখ্যার বরাত দিয়ে প্রায়শই স্বামীরা দাবি করতেন যে, স্ত্রী কেবল আদালতে মামলা দায়েরের পরবর্তী সময়ের ভবিষ্যৎ খোরপোষ পেতে পারেন, কিন্তু পূর্ববর্তী বকেয়া দিনগুলোর খোরপোষ কোনো আর্থিক ঋণ নয় বিধায় তা দাবি করা যায় না। স্বামীরা স্ত্রীকে বছরের পর বছর ফেলে রেখে এক পয়সাও না দিয়ে পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে অতীত দেনা ফাঁকি দেওয়ার অপচেষ্টা করতেন। অত্র রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এবং সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সিদ্ধান্তের আলোকে স্ত্রীর অতীত খোরপোষের অধিকারকে একটি বলবৎযোগ্য সংবিধিবদ্ধ ঋণ হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি প্রদান করেছেন।
মামলার বিবরণী থেকে প্রকাশ, কুমিল্লার বাসিন্দা দরখাস্তকারী মো. মফিজুল ইসলামের সহিত প্রতিপক্ষ মোছা. শারমিন আক্তারের মুসলিম শরিয়তমতে বিবাহ হয়। দাম্পত্য জীবনের একপর্যায়ে স্বামী যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতন করে তাঁর পরিধেয় বস্ত্রসহ পিতার বাড়িতে তাড়িয়ে দেন। এরপর সুদীর্ঘ তিন বছর স্বামী স্ত্রীর কোনো খোঁজখবর নেননি এবং এক পয়সাও ভরণপোষণ বাবদ পাঠাননি। স্ত্রী পিতার আশ্রয়ে কোনোমতে মানবেতর জীবনযাপন করেন।
পরবর্তীতে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে বিগত তিন বছরের বকেয়া খোরপোষ বাবদ ৩ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা (মাসিক ১০,০০০ টাকা হারে) এবং ভবিষ্যৎ মাসিক খোরপোষের দাবিতে পারিবারিক মামলা দায়ের করেন।
পারিবারিক আদালতে স্বামী দাবি করেন যে, স্ত্রী নিজেই তাঁর অবাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে চলে গেছেন (Nashizah), সুতরাং তিনি কোনো খোরপোষ পেতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, তিনি দাবি করেন যে মুসলিম আইনে অতীত খোরপোষের কোনো বিধান নেই।
পারিবারিক আদালত উভয় পক্ষের সাক্ষ্য ও স্থানীয় সালিশের বক্তব্য পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, স্বামী নিজেই স্ত্রীকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং কোনো ভরণপোষণ দেননি। আদালত স্ত্রীর পক্ষে বিগত তিন বছরের অতীত খোরপোষ বাবদ ৩ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা এবং মামলা চলাকালীন ভবিষ্যৎ মাসিক খোরপোষ বাবদ ৮,০০০ টাকার ডিক্রি প্রদান করেন। জেলা জজ আদালতে আপিল করা হলেও আপিল আদালত ডিক্রি বহাল রাখেন। অতঃপর স্বামী হাইকোর্টে এই রিভিশন আবেদন দায়ের করেন।
👤 আবেদনকারী / দরখাস্তকারী পক্ষের আইনি যুক্তি
- হানাফি আইনের ঐতিহ্যবাহী মত: হানাফি আইনশাস্ত্র অনুসারে স্ত্রী যদি পূর্ববর্তী দিনগুলোতে ঋণ না করে বা বিচারকের নির্দিষ্ট আদেশ ছাড়া নিজে চলে থাকেন, তবে অতীত দিনের জন্য কোনো খোরপোষ জমে না (Maintenance does not accumulate as a debt under strict Hanafi rule)।
- অবাধ্যতার দাবি (Nushuz): স্ত্রী স্বামীর ঘরে ফিরে আসতে অস্বীকার করেছেন। সুতরাং অবাধ্য স্ত্রীর কোনো অতীত বা ভবিষ্যৎ খোরপোষের অধিকার থাকে না।
- সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া (Due Process of Law) লঙ্ঘন করে কোনো সিদ্ধান্ত বহাল রাখা যায় না।
- সংশ্লিষ্ট সংবিধিবদ্ধ আইনের মূল উদ্দেশ্য ও আইনি অক্ষরের সঠিক প্রয়োগে আবেদনকারীর দাবি শতভাগ ন্যায্য।
👥 বিপরীতপক্ষ / বাদীর আইনি অবস্থান
- ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৯ ধারার ভাষা: মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৯(১) ধারায় পরিষ্কার বলা হয়েছে— “If any husband fails to maintain his wife adequately, or where there are more wives than one, fails to maintain them equitably, the wife, or all or any of the wives, may apply to the Chairman who shall specify the amount which shall be paid as maintenance by the husband”। এখানে অতীতের অবহেলার জন্যও খোরপোষ নির্ধারণের পূর্ণ এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে।
- শাফেয়ী ও মালেকি ফিকহের আধুনিকায়ন: মুসলিম আইন কোনো জড় পদার্থ নয়। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ বহু পূর্বেই রায় দিয়েছেন যে স্ত্রীর ভরণপোষণ একটি অবিচ্ছেদ্য ঋণ এবং স্বামী দায়িত্ব পালন না করলে অতীত বকেয়া পরিশোধ করতে বাধ্য।
- অধস্তন আদালতের রায় ও আদেশ সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং প্রচলিত বিচারিক চর্চার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- আবেদনকারী পক্ষের বক্তব্য মামলার মূল আইনি ভিত্তি ও নথিপত্রের বিপরীতে দাঁড়ায় না।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের সামনে মূল বিচার্য বিষয় ছিল: (১) সংশ্লিষ্ট বিশেষ আইনের বিধানাবলি কি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল, নাকি তা লংঘিত হয়েছে? (২) অধস্তন আদালত কি এখতিয়ারবহির্ভূত আদেশ প্রদান বা প্রমাণের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে গুরুতর বিচারিক ভুল (Jurisdictional Error) করেছেন? এবং (৩) মামলার সামগ্রিক ঘটনা ও নথিপত্র বিবেচনায় সংক্ষুব্ধ পক্ষের আবেদন কি আইনত মঞ্জুরযোগ্য?
বিজ্ঞ বিচারপতি উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি গ্রহণ করেন, মামলার আরজি, জবাব ও মূল নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন এবং আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির আলোকে প্রতিটি বিচার্য বিষয়ের নিষ্পত্তি করেন।
মাননীয় একক বেঞ্চ মুসলিম আইনশাস্ত্রের বিভিন্ন মাযহাবের তুলনামূলক দর্শন এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নজিরসমূহ বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন:
ক) অতীত খোরপোষ কোনো দান নয়, এটি অলঙ্ঘনীয় ঋণ
আদালত উল্লেখ করেন, বিবাহ বলবৎ থাকা অবস্থায় স্বামী স্ত্রীকে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান প্রদান করতে বাধ্য। স্বামী যদি স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে পরিত্যাগ করে বা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়, তবে স্ত্রী জীবিত থাকার জন্য ধারদেনা করে বা পিতার আশ্রয়ে যে ব্যয় নির্বাহ করেন, তা মূলত স্বামীরই পরিশোধযোগ্য ঋণ। হানাফি আইনের প্রাচীন মতামতকে অন্ধের মতো অনুসরণ করে স্ত্রীর ওপর অন্যায় অবিচার চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বে মালেকি ও শাফেয়ী নীতি অনুসরণ করে অতীত খোরপোষকে স্ত্রীর নিরঙ্কুশ অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
খ) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক নজির
হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত Rustom Ali vs. Jamila Khatun (43 DLR (AD) 301) এবং Md. Mahbubur Rahman vs. Mst. Farida Begum (Civil Revision No. 2145 of 2024) স্মরণ করিয়ে দেন। আপিল বিভাগ সুস্পষ্ট রায় দিয়েছেন:
“Under Section 9 of the Muslim Family Laws Ordinance, 1961 read with the Family Courts Act, a Muslim wife is legally entitled to claim past maintenance from her neglectful husband. The liability of the husband to maintain his wife arises from the date of neglect, and the court has full jurisdiction to decree past maintenance for a reasonable period.”
অত্র মামলায় স্বামী কোনো কারণ ছাড়াই স্ত্রীকে তিন বছর ফেলে রেখেছিলেন এবং কোনো খরচ দেননি। অতএব তিন বছরের অতীত খোরপোষ প্রদানের আদেশ সম্পূর্ণ আইনানুগ।
মহামান্য আদালত আরও অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে বিচারিক আদালতগুলোর দায়িত্ব হলো কোনো যান্ত্রিক বা অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। উচ্চ আদালতের দীর্ঘ নজির ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই ব্যাখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
চূড়ান্ত রায় ও আদেশ: সার্বিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সিভিল রিভিশন আবেদনটি সরাসরি খারিজ করেন। নিম্ন পারিবারিক আদালত ও জেলা জজ আদালত কর্তৃক প্রদত্ত স্ত্রীর পক্ষে ৩ লক্ষ ৬০ হাজার টাকার অতীত খোরপোষ এবং ভবিষ্যৎ মাসিক ৮,০০০ টাকার খোরপোষের ডিক্রি সম্পূর্ণ বহাল রাখা হলো।
দরখাস্তকারী স্বামীকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে বকেয়া ৩ লক্ষ ৬০ হাজার টাকার অর্থ পারিবারিক আদালতে জমাদানের নির্দেশ প্রদান করা হলো। ব্যর্থতায় পারিবারিক আদালত আইন অনুযায়ী স্বামীর স্থাবর সম্পত্তি নিলাম ও দেওয়ানি কারাগারে আটকের পরোয়ানা জারি করা হবে।
- সুনির্দিষ্ট আইনি নীতি: মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর অতীত বা বকেয়া খোরপোষ (Past Maintenance) প্রদান স্… সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নীতি দেশের সকল আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক।
- সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা: সুপ্রিম কোর্টের ঘোষিত এই রায় দেশের প্রতিটি আদালত ও ট্রাইব্যুনালকে নজির হিসেবে মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
- প্রক্রিয়াগত ত্রুটির মারাত্মক প্রভাব: আইনের অলঙ্ঘনীয় বিধান অমান্য করে গৃহীত যেকোনো প্রশাসনিক বা বিচারিক পদক্ষেপ গোড়াতেই বাতিলযোগ্য।
- নাগরিক ও ব্যবসায়িক অধিকারের সুরক্ষা: সমতা, সততা এবং সুশাসনের স্বার্থে এই রায় বিচারপ্রার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।
- স্ত্রী আলাদা থাকলেও খোরপোষ দিতে হবে: স্বামী যদি খারাপ আচরণ করে স্ত্রীকে বাবার বাড়ি যেতে বাধ্য করেন, তবে স্ত্রী বাবার বাড়িতে থাকলেও স্বামী প্রতি মাসে খোরপোষ পাঠাতে বাধ্য।
- টাকা পাঠানোর রসিদ সংরক্ষণ: স্ত্রীকে খোরপোষ বাবদ টাকা প্রদান করলে মানি অর্ডার, ব্যাংক ডিপোজিট বা বিকাশের মাধ্যমে পাঠিয়ে ট্রানজেকশন রসিদ সযত্নে সংরক্ষণ করুন; অন্যথায় স্ত্রী অতীত খোরপোষের মামলা করলে প্রমাণ করা কঠিন হবে।
- অতীত খোরপোষের তামাদি: স্ত্রী সাধারণত বিগত তিন বছরের বকেয়া খোরপোষ আদায়ের জন্য তামাদি আইনের আওতায় পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন।
- মামলা বা যেকোনো আইনি নোটিশের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই সাম্প্রতিকতম নজিরটি সঠিকভাবে উদ্ধৃত করুন।
- বিচারিক আদালতে মামলা শুনানিকালে মূল সংবিধিবদ্ধ বিধানের সাথে তথ্যের সামঞ্জস্য প্রমাণে সচেষ্ট থাকুন।

