কাবিননামার ১৮ নং কলামের তালাক-ই-তৌফিজ ক্ষমতাবলে স্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত তালাক সম্পূর্ণ বৈধ ও কার্যকর; দেনমোহর পরিশোধে স্বামী বাধ্য: হাইকোর্ট
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত: রেজিস্ট্রিকৃত নিকাহনামার ১৮ নং কলামে স্বামী যদি স্ত্রীকে নিঃশর্তভাবে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ (Talaq-e-Tawfeez) করেন, তবে স্ত্রী সেই ক্ষমতাবলে স্বামীকে তালাক প্রদান করলে তা একটি পূর্ণাঙ্গ বৈধ তালাক হিসেবে কার্যকর হবে। স্ত্রী নিজে তালাক দিয়েছেন এই অজুহাত তুলে স্বামী কোনোভাবেই কাবিননামার বকেয়া দেনমোহর (Dower) পরিশোধের দায় এড়াতে পারেন না। দেনমোহর স্ত্রীর অলঙ্ঘনীয় অধিকার। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এই সিদ্ধান্ত দেশের আইন অঙ্গনে একটি ঐতিহাসিক ও ল্যান্ডমার্ক দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে।
মুসলিম সমাজে বিবাহ একটি সামাজিক ও ধর্মীয় দ্বিপাক্ষিক চুক্তি। এই চুক্তিতে স্ত্রীকে সুরক্ষা প্রদানের জন্য শরিয়ত ও বাংলাদেশের আইনে ‘তালাক-ই-তৌফিজ’ (Delegated Divorce) নামক একটি অত্যন্ত প্রগতিশীল অধিকারের বিধান রাখা হয়েছে। নিকাহনামা বা কাবিননামার ১৮ নং কলামে স্বামী স্ত্রীকে এই ক্ষমতা অর্পণ করতে পারেন যে, নির্দিষ্ট শর্তে বা শর্তহীনভাবে স্ত্রী নিজেও স্বামীকে তালাক প্রদান করে বিবাহবন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারবেন। কিন্তু সমাজে বহু স্বামীর মধ্যে এই ভুল ধারণা বিদ্যমান রয়েছে যে— “যেহেতু স্ত্রী নিজ ইচ্ছায় তালাক দিয়েছেন (স্ত্রী কর্তৃক তালাক), সেহেতু স্ত্রী আর কোনো দেনমোহর পাবেন না এবং সমস্ত মোহরানা মাফ হয়ে গেছে।” এই অজুহাতে স্বামীরা দেনমোহর আটকে রাখেন। অত্র যুগান্তকারী রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তালাক-ই-তৌফিজের মাধ্যমে স্ত্রী তালাক প্রদান করলেও তিনি পূর্ণ দেনমোহর পাওয়ার শতভাগ আইনগত অধিকারী।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে প্রকাশ, দরখাস্তকারী মো. জহিরুল হকের সহিত প্রতিপক্ষ মোছা. নাহিদ সুলতানার রেজিস্ট্রিকৃত কাবিননামামূলে বিবাহ সম্পন্ন হয়। কাবিননামার ১৩ নং কলামে দেনমোহর ধার্য ছিল মোট ১২ লক্ষ টাকা এবং ১৮ নং কলামে স্বামী স্ত্রীকে নিঃশর্তভাবে তালাক-ই-তৌফিজের পূর্ণ ক্ষমতা অর্পণ করেন। দাম্পত্য জীবনের পাঁচ বছর পর স্বামী যৌতুকের দাবিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করেন এবং একাধিক পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।
নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে নাহিদ সুলতানা কাবিননামার ১৮ নং কলামে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৭ ও ৮ ধারা অনুসারে স্থানীয় মেয়র এবং স্বামীকে ডাকযোগে লিখিত নোটিশ দিয়ে তালাক-ই-তৌফিজ কার্যকর করেন। আইনানুগ ৯০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর কাজী অফিস থেকে তালাক রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়। এরপর স্ত্রী পারিবারিক আদালতে তাঁর বকেয়া ১২ লক্ষ টাকা দেনমোহর এবং ইদ্দতকালীন খোরপোষ আদায়ের জন্য মামলা দায়ের করেন।
মামলায় লিখিত জবাব দাখিল করে স্বামী দাবি করেন যে, তিনি কখনই স্ত্রীকে তালাক দেননি; স্ত্রী নিজ ইচ্ছায় সংসার ভেঙেছেন। এটি একটি ‘খোলা তালাক’ (Khula Talaq)-এর মতো, যেখানে স্ত্রী দেনমোহর ত্যাগ করে মুক্তি লাভ করেছেন। অতএব স্ত্রী কোনো দেনমোহর দাবি করতে পারেন না।
পারিবারিক আদালত স্বামীর এই যুক্তি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেন। আদালত অভিমত দেন যে, তালাক-ই-তৌফিজ এবং খোলা তালাক দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি ধারণা। ১৮ নং কলামে প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করা মানে স্বামীর অর্পিত ক্ষমতাবলেই তালাক দেওয়া। আদালত স্ত্রীর পক্ষে পূর্ণ ১২ লক্ষ টাকার দেনমোহর ডিক্রি প্রদান করেন। জেলা জজ আদালতে আপিল করা হলেও অতিরিক্ত জেলা জজ আপিল খারিজ করেন। অতঃপর স্বামী হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
👤 আবেদনকারী / দরখাস্তকারী পক্ষের আইনি যুক্তি
- স্ত্রীর স্বেচ্ছাচারিতা ও সংসার ভাঙন: যে স্ত্রী নিজ থেকে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটান, তিনি দেনমোহরের মতো বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন না। এটি নৈতিকতার পরিপন্থী।
- খোলা তালাকের সাদৃশ্য: মুসলিম আইনে স্ত্রীর উদ্যোগে বিচ্ছেদ ঘটলে দেনমোহর উসুল হয় বা স্ত্রী দেনমোহরের দাবি প্রত্যাহার করেন। ১৮ নং কলামের তালাককেও খোলা তালাকের সমান গণ্য করা উচিত।
- সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া (Due Process of Law) লঙ্ঘন করে কোনো সিদ্ধান্ত বহাল রাখা যায় না।
- সংশ্লিষ্ট সংবিধিবদ্ধ আইনের মূল উদ্দেশ্য ও আইনি অক্ষরের সঠিক প্রয়োগে আবেদনকারীর দাবি শতভাগ ন্যায্য।
👥 বিপরীতপক্ষ / বাদীর আইনি অবস্থান
- অধস্তন আদালতের রায় ও আদেশ সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং প্রচলিত বিচারিক চর্চার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- আবেদনকারী পক্ষের বক্তব্য মামলার মূল আইনি ভিত্তি ও নথিপত্রের বিপরীতে দাঁড়ায় না।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের সামনে মূল বিচার্য বিষয় ছিল: (১) সংশ্লিষ্ট বিশেষ আইনের বিধানাবলি কি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল, নাকি তা লংঘিত হয়েছে? (২) অধস্তন আদালত কি এখতিয়ারবহির্ভূত আদেশ প্রদান বা প্রমাণের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে গুরুতর বিচারিক ভুল (Jurisdictional Error) করেছেন? এবং (৩) মামলার সামগ্রিক ঘটনা ও নথিপত্র বিবেচনায় সংক্ষুব্ধ পক্ষের আবেদন কি আইনত মঞ্জুরযোগ্য?
বিজ্ঞ বিচারপতি উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি গ্রহণ করেন, মামলার আরজি, জবাব ও মূল নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন এবং আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির আলোকে প্রতিটি বিচার্য বিষয়ের নিষ্পত্তি করেন।
মাননীয় একক বেঞ্চ মুসলিম আইনশাস্ত্র, ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ধারা ৮ এবং সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘ নজিরসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পর্যালোচনা করেন:
ক) তালাক-ই-তৌফিজ ও খোলা তালাকের মৌলিক পার্থক্য
আদালত উল্লেখ করেন, মুসলিম আইনে তালাক-ই-তৌফিজ (Section 8 of MFLO, 1961) হলো স্বামীর ক্ষমতা স্ত্রীর কাছে হস্তান্তর। স্ত্রী যখন ১৮ নং কলাম ব্যবহার করেন, তিনি স্বামীর অর্পিত ক্ষমতাবলেই সেই বন্ধন ছিন্ন করেন। অপরদিকে খোলা (Khula) হলো একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি যেখানে স্ত্রী কিছু ক্ষতিপূরণ বা মোহরানা মওকুফ করার প্রস্তাব দেন এবং স্বামী তা গ্রহণ করেন। স্বামী যেখানে একতরফাভাবে নির্যাতন চালিয়ে স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করেন, সেখানে অর্পিত ক্ষমতার প্রয়োগ কখনই খোলা তালাক নয়।
খ) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবিসংবাদিত নজির
হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের যুগান্তকারী নজির Md. Mizanur Rahman vs. Mosammot Rasheda Khatun (Civil Revision No. 4266 of 2015) এবং Aklima Khatun vs. Mahbub Hossain (48 DLR 321) উদ্ধৃত করে বলেন:
“Exercise of the delegated power of divorce (Talaq-e-Tawfeez) by the wife under column 18 of the Nikahnama does not disentitle her from claiming the prompt or deferred dower. Dower is an unconditional debt due from the husband to the wife, and the husband remains legally bound to pay the entire dower irrespective of whether the marriage was dissolved by the husband himself or by the wife exercising her delegated authority.”
স্বামীর এই অজুহাত আইন ও ন্যায়বিচারের চরম পরিপন্থী। স্ত্রীকে নির্যাতন করে তাড়িয়ে দিয়ে দেনমোহর ফাঁকি দেওয়ার জন্য এই ধরনের ভ্রান্ত যুক্তি আদালত কখনোই গ্রহণ করবে না।
মহামান্য আদালত আরও অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে বিচারিক আদালতগুলোর দায়িত্ব হলো কোনো যান্ত্রিক বা অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। উচ্চ আদালতের দীর্ঘ নজির ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই ব্যাখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
চূড়ান্ত রায় ও আদেশ: মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সুদৃঢ়ভাবে অভিমত দেন যে, অধস্তন আদালতসমূহ মুসলিম পারিবারিক আইনের সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে স্ত্রীর অনুকূলে দেনমোহর ডিক্রি দিয়েছেন এবং এতে হস্তক্ষেপের কোনো অবকাশ নেই।
অতএব, সিভিল রিভিশন আবেদনটি সরাসরি খারিজ করা হলো। বিবাদী নাহিদ সুলতানার পক্ষে ১২ লক্ষ টাকা দেনমোহরের ডিক্রি সম্পূর্ণ বহাল রাখা হলো। দরখাস্তকারী স্বামীকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে সমুদয় অর্থ পারিবারিক আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো; অন্যথায় ডিক্রি জারির মাধ্যমে স্বামীর সম্পদ ক্রোক ও দেওয়ানি আটকাদেশ কার্যকর হবে।
- সুনির্দিষ্ট আইনি নীতি: কাবিননামার ১৮ নং কলামের তালাক-ই-তৌফিজ ক্ষমতাবলে স্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত তালাক সম্প… সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নীতি দেশের সকল আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক।
- সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা: সুপ্রিম কোর্টের ঘোষিত এই রায় দেশের প্রতিটি আদালত ও ট্রাইব্যুনালকে নজির হিসেবে মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
- প্রক্রিয়াগত ত্রুটির মারাত্মক প্রভাব: আইনের অলঙ্ঘনীয় বিধান অমান্য করে গৃহীত যেকোনো প্রশাসনিক বা বিচারিক পদক্ষেপ গোড়াতেই বাতিলযোগ্য।
- নাগরিক ও ব্যবসায়িক অধিকারের সুরক্ষা: সমতা, সততা এবং সুশাসনের স্বার্থে এই রায় বিচারপ্রার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।
- ১৮ নং কলামে ক্ষমতা নিশ্চিত করুন: বিবাহের সময় নিকাহনামার ১৮ নং কলামে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে কিনা তা দেখে নিন; এটি নারীর আত্মমর্যাদা ও সুরক্ষার অন্যতম সেরা আইনগত রক্ষাকবচ।
- স্ত্রী তালাক দিলেও মোহরানা মাফ হয় না: স্ত্রী যদি ১৮ নং কলামের ক্ষমতাবলে তালাক দেন, তবে স্বামীর সম্পূর্ণ দেনমোহর পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক।
- আইনানুগ নোটিশ জারি: তালাক-ই-তৌফিজ দেওয়ার পরও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বা মেয়রকে ১৯৬১ সালের আইনের ৭ ধারা অনুসারে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দিয়ে ৯০ দিন অতিবাহিত করতে হবে।
- মামলা বা যেকোনো আইনি নোটিশের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই সাম্প্রতিকতম নজিরটি সঠিকভাবে উদ্ধৃত করুন।
- বিচারিক আদালতে মামলা শুনানিকালে মূল সংবিধিবদ্ধ বিধানের সাথে তথ্যের সামঞ্জস্য প্রমাণে সচেষ্ট থাকুন।

