আইন কর্মকর্তা নিয়োগে স্বচ্ছতা ও ত্যাগীদের মূল্যায়নের আহ্বান: প্রধানমন্ত্রীকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর খোলা চিঠি
রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদে কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং কঠোরভাবে যোগ্যতাভিত্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণের জোর তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম জুলফিকার আলী জুনু। আইন অঙ্গনে স্বজনপ্রীতি ও চেম্বারকেন্দ্রিক আধিপত্য পরিহার করে রাজনৈতিকভাবে নিগৃহীত ও ত্যাগী আইনজীবীদের যথাযথ মূল্যায়নের দাবি জানিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন।
চিঠিতে দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন উইং এবং অধস্তন আদালতগুলোতে আইন কর্মকর্তা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের ব্যক্তিগত প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব, স্বজনপ্রীতি ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীপ্রীতি কঠোরভাবে এড়িয়ে চলার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। বিচার প্রশাসনের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে এসব পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যেসব পদে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ মূল্যায়নের আহ্বান
আইনজীবী জুলফিকার আলী জুনুর পাঠানো চিঠিতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি স্তরের আইন কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ ও প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব পদে জরুরি ভিত্তিতে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো—
- অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়: ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা।
- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল: প্রসিকিউশন টিমের প্রসিকিউটর নিয়োগ।
- অধস্তন আদালতসমূহ: পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর এবং সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি)।
চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়, এসব দায়িত্বশীল পদে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর পেশাগত দক্ষতা, সামগ্রিক সততা, নিষ্ঠা, নৈতিক অবস্থান এবং আইন পেশা ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে বিগত দীর্ঘদিনের অবদানকে নিরপেক্ষভাবে মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা একান্ত অপরিহার্য।
আইনজীবী সমাজের ক্ষোভ ও চেম্বারপ্রীতির অভিযোগ
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে লিখিত এই চিঠিতে অ্যাডভোকেট জুনু আইনজীবী সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে বিরাজমান তীব্র হতাশা, ক্ষোভ ও বঞ্চনার চিত্র বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী আইনজীবী নেতাদের নিজস্ব জুনিয়র, নির্দিষ্ট চেম্বার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের তুলনামূলকভাবে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন, কোনো জ্যেষ্ঠ বা প্রভাবশালী আইনজীবীর ব্যক্তিগত অনুকম্পা না থাকা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো বড় চেম্বারের সদস্য না হওয়ার কারণে যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক আইনজীবী রাষ্ট্রীয় মূল্যায়নের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এর ফলে সাধারণ আইনজীবী সমাজের ভেতরে একধরনের গভীর হতাশা তৈরি হচ্ছে, যা সার্বিক বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
বিগত ১৭ বছরের নিপীড়ন ও আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট
চিঠিতে বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময়ের প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে বলা হয়, গত প্রায় ১৭ বছর ধরে বহু আইনজীবী রাজনৈতিক হামলা, গায়েবি মামলা, শারীরিক নির্যাতন ও নানামুখী প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। চরম বৈরী পরিস্থিতির মুখেও তাঁরা অবিচল থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং দলটির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নির্যাতিত নেতাকর্মীকে নিঃস্বার্থভাবে বা অত্যন্ত সীমিত সামর্থ্যে দিনরাত আইনি সহায়তা প্রদান করেছেন।
চিঠিতে আইনজীবীদের ওপর নেমে আসা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উল্লেখ করা হয়:
“এমন আইনজীবীও রয়েছেন, যাঁরা নিজেরা নজিরবিহীন নিপীড়ন, পুলিশি হয়রানি এমনকি স্বল্প সময়ের জন্য গুমের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। এরপরও তাঁরা কোনো ভয় বা মোহের কাছে নতি স্বীকার না করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মীদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছেন, এজলাসে লড়াই চালিয়েছেন এবং দুঃসময়ে পেশাগত দায়িত্ব ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা পালন করেছেন।”
চিঠিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, যেসব আইনজীবী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আদালতের বারান্দায় লড়েছেন, আজ তাঁদের অবদানকে পাশ কাটিয়ে যদি ব্যক্তিগত পছন্দ ও চেম্বার-সংশ্লিষ্টতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে তা হবে চরম অবিচার।
প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ও স্বচ্ছ নিয়োগের দাবি
অ্যাডভোকেট এস এম জুলফিকার আলী জুনু তাঁর চিঠিতে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে জানান, রাষ্ট্রের বিচার প্রশাসনে কোনো অস্বচ্ছ সুপারিশ বা লবিংয়ের স্থান থাকা উচিত নয়। আইন কর্মকর্তা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত বলয়, গোষ্ঠীপ্রীতি কিংবা সিন্ডিকেটকেন্দ্রিক প্রাধান্য বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নজরদারি ও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা কামনা করা হয়।
তিনি দাবি জানান, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও সারা দেশের অধস্তন আদালত পর্যন্ত সকল স্তরে পিপি ও এপিপি নিয়োগে একটি প্রকাশ্য, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও যাচাইযোগ্য নীতিমালা অনুসরণ করা হোক। এতে করে দুঃসময়ে মামলা-হামলা উপেক্ষা করে দল ও নির্যাতিত মানুষের পাশে থাকা সৎ, পরীক্ষিত ও দক্ষ আইনজীবীরা উপযুক্ত সম্মান ও স্বীকৃতি পাবেন।
চিঠির উপসংহারে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর কঠোর তদারকিতে স্বজনপ্রীতিমুক্ত একটি জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব হলে বঞ্চিত ও ত্যাগী আইনজীবীদের মাঝে নতুন করে আস্থার সঞ্চার হবে। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও আইন অঙ্গনকে আরও বেশি শক্তিশালী, মর্যাদাপূর্ণ ও সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে। এ ব্যাপারে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনতিবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিনীত আহ্বান জানানো হয়।



