আদালতের এখতিয়ার দেওয়ানী মামলা এবং আরজি খারিজের দরখাস্ত মুসাবিদা – বার কাউন্সিল ২০১৫
আদালতের এখতিয়ার ও দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা (ধারা ৯): আরজি খারিজের ক্ষেত্রসমূহ ও পূর্ণাঙ্গ দরখাস্ত মুসাবিদা
১. মূল প্রশ্ন (Examination Question)
২। ”আদালতের এখতিয়ার” এবং ”দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা” বলিতে আপনি কি বোঝেন? আইনের বিধান উল্লেখপূর্বক ব্যাখ্যা করুন। কোন কোন ক্ষেত্রে মামলার আরজি খারিজ করা যায়? আইনের বিধান উল্লেখসহ আরজি খারিজের দরখাস্ত মুসাবিদা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
২. আদালতের এখতিয়ার (Jurisdiction of the Court)
আইনের দৃষ্টিতে ‘এখতিয়ার’ বলতে কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক কোনো মোকদ্দমা গ্রহণ, বিচার পরিচালনা এবং উক্ত বিরোধের বিষয়ে কার্যকর রায় ও ডিক্রী প্রদানের আইনগত ক্ষমতা বা অধিকারকে বোঝায়। এখতিয়ারহীন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো রায় ও ডিক্রী আইনের চোখে Nullity বা বাতিল।
দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ার প্রধানত ৩ প্রকার:
- আঞ্চলিক এখতিয়ার (Territorial Jurisdiction – Sections 15-20 CPC): ভৌগোলিক সীমানার ভিত্তিতে নির্ধারিত এখতিয়ার। স্থাবর সম্পত্তির মামলা সম্পত্তি যেখানে অবস্থিত সেই আদালতের এখতিয়ারে করতে হয় (Section 16)।
- আর্থিক এখতিয়ার (Pecuniary Jurisdiction – Section 6 CPC): সিভিল কোর্টস অ্যাক্ট, ১৮৮৭ অনুযায়ী মামলার আর্থিক মূল্যের ওপর নির্ধারিত এখতিয়ার (যেমন- সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ ও যুগ্ম জেলা জজ)।
- বিষয়বস্তুগত এখতিয়ার (Subject-matter Jurisdiction): সুনির্দিষ্ট আইনের আওতায় নির্ধারিত বিষয় (যেমন- পারিবারিক আদালত, অর্থ ঋণ আদালত, বা সাধারণ দেওয়ানী আদালত)।
৩. দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা (Suits of a Civil Nature – Section 9 CPC)
দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ ধারায় দেওয়ানী আদালতের সার্বিক এখতিয়ার নির্ধারণ করে বলা হয়েছে:
“The Courts shall (subject to the provisions herein contained) have jurisdiction to try all suits of a civil nature excepting suits of which their cognizance is either expressly or impliedly barred.”
সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা: যে মোকদ্দমায় কোনো ব্যক্তির নাগরিক বা দেওয়ানী অধিকার—প্রধানত সম্পত্তিতে অধিকার (Right to property) অথবা কোনো পদে অধিকার (Right to an office) নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়, তাকে ‘দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা’ বলে।
- দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা: স্বত্ব ঘোষণার মামলা, চুক্তি বলবৎকরণের মামলা, খাস দখল উদ্ধার, ঋণ আদায়ের মানি স্যুট, পারিবারিক বিরোধ, ইজমেন্ট অধিকার, বিবাহ বিচ্ছেদ ইত্যাদি।
- দেওয়ানী প্রকৃতির নয়: কেবল রাজনৈতিক বিরোধ, কোনো সামাজিক ক্লাবের সদস্যপদ নিয়ে নিছক মতবিরোধ, বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের রীতিনীতি সংক্রান্ত বিরোধ যেখানে সম্পত্তি বা পদের কোনো আর্থিক/আইনগত স্বার্থ নেই।
- বারিত মোকদ্দমা: কোনো বিশেষ আইন দ্বারা যা স্পষ্টত বারিত (যেমন- ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনাল বা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের আওতাভুক্ত বিষয়)।
৪. কোন কোন ক্ষেত্রে মামলার আরজি খারিজ/প্রত্যাখ্যান করা যায়? (Order VII, Rule 11 CPC)
দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশ, ১১ নিয়ম (Order VII, Rule 11) মোতাবেক আদালত নিম্নোক্ত ৪টি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মামলার আরজি সরাসরি প্রত্যাখ্যান বা খারিজ (Rejection of Plaint) করতে পারেন:
- মোকদ্দমার কারণ প্রকাশ না পেলে (Where it does not disclose a cause of action – Rule 11(a)): আরজি পাঠ করে যদি প্রতীয়মান হয় যে বাদীর কোনো আইনগত অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রকাশ পায়নি।
- দাবীকৃত প্রতিকারের অবমূল্যায়ন (Undervalued relief – Rule 11(b)): বাদীর প্রার্থিত প্রতিকারের মূল্য কম দেখানো হলে এবং আদালত কর্তৃক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা সংশোধন করতে বলা সত্ত্বেও বাদী ব্যর্থ হলে।
- অপর্যাপ্ত কোর্ট ফি (Insufficiently stamped – Rule 11(c)): আরজিতে যথাযথ কোর্ট ফি প্রদান না করা হলে এবং আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে ঘাটতি কোর্ট ফি দাখিলে বাদী ব্যর্থ হলে।
- আইন দ্বারা বারিত মোকদ্দমা (Suit barred by any law – Rule 11(d)): আরজিতে বর্ণিত বক্তব্য থেকেই যদি স্পষ্ট দেখা যায় যে মোকদ্দমাটি তামাদি আইন, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার শর্তাংশ, বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ আইন দ্বারা সরাসরি বারিত।
৫. দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশ ১১ নিয়ম মতে আরজি খারিজের পূর্ণাঙ্গ দরখাস্তের মুসাবিদা
বিজ্ঞ ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, ঢাকা
দেওয়ানী মোকদ্দমা নং- ১২৫ / ২০১৫
জনাব মো. রফিকুল ইসলাম ………………………………………………………. বাদী
— বনাম —
জনাব এম. এ. কাদের …………………………………………………………… বিবাদী
বিষয়: দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ ৭, নিয়ম ১১(ঘ) এবং ধারা ১৫১ মোতাবেক বাদীর আরজি সরাসরি প্রত্যাখ্যান ও খারিজের প্রার্থনা।
বিবাদী পক্ষ বিনীত নিবেদন এই যে—
- বাদী তফশিল বর্ণিত নালিশী ভূমিতে একটি কাল্পনিক স্বত্ব দাবি করে বিবাদীর বিরুদ্ধে অত্র ঘোষণামূলক মোকদ্দমাটি দায়ের করেছেন।
- আরজির ৮ নং অনুচ্ছেদে বাদী নিজেই অকপটে স্বীকার করেছেন যে, বিবাদী বিগত ২০/০১/১৯৯৮ ইং তারিখ হতে আজ পর্যন্ত নালিশী সম্পত্তিতে শান্তিপূর্ণ ভোগদখলে আছেন এবং বাদী বিগত ১৭ বছর যাবৎ জমি থেকে সম্পূর্ণ বেদখল অবস্থায় রয়েছেন।
- অথচ বাদী তার আরজিতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ এর ৪২ ধারার Proviso (শর্তাংশ) সম্পূর্ণরূপে অমান্য করে খাস দখল উদ্ধারের (Consequential relief) কোনো প্রার্থনা করেননি; তিনি কেবল ৩০০/- টাকা কোর্ট ফি দিয়ে স্বত্ব ঘোষণার প্রার্থনা করেছেন।
- সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার সুস্পষ্ট শর্তাংশ অনুযায়ী যেখানে বাদী দখল পুনরুদ্ধারের প্রতিকার চাওয়ার অধিকারী অথচ তা চাননি, সেখানে কেবল স্বত্বের ঘোষণামূলক মামলা আইন দ্বারা সরাসরি বারিত (Expressly barred by law)।
- তাছাড়া আরজির স্বীকারোক্তি মতেই বাদী ১৭ বছর পূর্বে বেদখল হয়েছেন। ফলে তামাদি আইনের ১৪২/১৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১২ বছরের তামাদি অতিক্রান্ত হওয়ায় মামলাটি আরজির মুখ থেকেই তামাদিতে বারিত।
- অতএব, দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৭ নিয়ম ১১(ঘ) এর বিধানমতে বাদীর আরজিটি গ্রহণ না করে প্রাথমিক পর্যায়েই সরাসরি প্রত্যাখ্যান ও খারিজ করা ন্যায়বিচারের স্বার্থে একান্ত আবশ্যক।
প্রার্থনা:
অতএব, বিনীত প্রার্থনা এই যে, বিজ্ঞ আদালত সদয় বিচার বিবেচনাপূর্বক অত্র মোকদ্দমার আরজিটি দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৭, নিয়ম ১১(ঘ) মোতাবেক সরাসরি প্রত্যাখ্যান ও খারিজের আদেশদানে বাধিত করবেন।
(এম. এ. কাদের)
বিবাদীর স্বাক্ষর
📌 সম্পর্কিত আইনি প্রস্তুতি ও সহায়িকা লিংক:
- ২০১৫ সালের বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ মডেল সমাধান দেখুন
- দেওয়ানী কার্যবিধি (CPC) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও আইনি আলোচনা
- বার কাউন্সিল ও জুডিশিয়ারি দেওয়ানী কার্যবিধি (CPC) অনলাইন মডেল টেস্ট দিন
- বার কাউন্সিল বিগত সকল লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংক ও ১০০% পূর্ণাঙ্গ সমাধান ব্যাংক
