দালালি ও ফি ভাগাভাগির দায়ে বার কাউন্সিলে নালিশী দরখাস্ত মুসাবিদা – ২০১৭
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১৭: পেশাগত আচরণবিধি ও বার কাউন্সিল রুলস
প্রশ্ন: ১৩ একজন আইনজীবী যদি ক্লার্ক বা দালাল নিয়োগ করিয়া মক্কেল সংগ্রহ করেন এবং ওকালতি ফি ভাগাভাগি করেন, তবে তিনি কি ধরনের পেশাগত অসদাচরণে দোষী সাব্যস্ত হইবেন? সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে কীভাবে নালিশ দায়ের করিবেন? বার কাউন্সিল রুলস-এর রুল ৪৩ অনুযায়ী এফিডেভিটসহ পূর্ণাঙ্গ নালিশী দরখাস্তের আনুষ্ঠানিক মুসাবিদা প্রস্তুত করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও পেশাগত নৈতিকতার দর্শন
আইন পেশা কোনো সাধারণ ব্যবসা, বাণিজ্য বা পণ্য বিক্রির হাট নয়; এটি একটি সুমহান ও জনস্বার্থমূলক পেশা। মক্কেল ও আইনজীবীর মধ্যকার সম্পর্ক পরম বিশ্বাস (Fiduciary Duty) এবং সততার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আদালতের মর্যাদা ও বিচার ব্যবস্থার বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে হলে আইনজীবীকে দালাল সংস্কৃতি এবং বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের কলুষতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে হয়। এই কারণে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে—আইনজীবীর মেধা, প্রজ্ঞা ও বিশ্বস্ততাই হবে তার কাজের পরিচয়, কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী নয়।
২. দালাল নিয়োগ ও ফি ভাগাভাগির বিরুদ্ধে সংবিধিবদ্ধ আইনি বিধান
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট-এর সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ে দালাল নিয়োগ ও ফি ভাগাভাগিকে চরম অসদাচরণ ঘোষণা করা হয়েছে:
- ক্যাননস অব কন্ডাক্ট Chapter II, Rule 7: কোনো আইনজীবী কোনো দালাল, টাউট বা ক্লার্কের মাধ্যমে মক্কেল সংগ্রহ (Solicitation of professional employment by touts or agents) করতে পারবেন না। এটি আইন পেশার স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে ধ্বংস করে।
- ক্যাননস অব কন্ডাক্ট Chapter III, Rule 1: কোনো আইনজীবী অন্য কোনো অ-আইনজীবী (Non-lawyer) বা মধ্যস্বত্বভোগী দালালের সাথে ওকালতির ফি ভাগাভাগি (Division of Fees) করতে পারবেন না। ফি কেবল অন্য কোনো তালিকাভুক্ত সহযোগীর সাথে কাজের আনুপাতিক হারে ভাগ করা যায়।
- টাউট আইন, ১৮৭৯ (The Touts Act, 1879): আদালত প্রাঙ্গণে দালাল নিয়োগ বা দালালদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান আদালত অবমাননা ও শাস্তিমূলক অপরাধ।
উক্ত বিধানগুলো লঙ্ঘন করলে উক্ত আইনজীবী The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972-এর অনুচ্ছেদ ৩২ ও ৩৪ অনুযায়ী ‘পেশাগত অসদাচরণ (Professional Misconduct)’-এর দায়ে সরাসরি দোষী সাব্যস্ত হবেন।
৩. বার কাউন্সিলে অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি (Rule 43 Bar Council Rules)
সংক্ষুব্ধ মক্কেল বা যে কোনো সচেতন নাগরিক বার কাউন্সিল রুলসের রুল ৪৩ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেশ করতে পারেন:
- অভিযোগটি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সম্মানিত সচিব বরাবর দাখিল করতে হয়;
- দরখাস্তের সাথে ১,০০০/- (এক হাজার) টাকা সংবিধিবদ্ধ ফি ব্যাংকে জমা দিতে হয়;
- অভিযোগকারীকে উপযুক্ত প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিকের সামনে হলফনামা (Affidavit) সম্পাদন করতে হয়;
- অভিযোগটি প্রথমে ডিসিপ্লিনারি কমিটির মাধ্যমে প্রাথমিক বাছাই হয় এবং সারবত্তা থাকলে অনুচ্ছেদ ৩৩ অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করা হয়।
৪. বার কাউন্সিল রুলস-এর রুল ৪৩ অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক নালিশী দরখাস্ত ও এফিডেভিটের পূর্ণাঙ্গ ড্রাফট
বরাবর,
সম্মানিত সচিব, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল
বার কাউন্সিল ভবন, শাহবাগ, ঢাকা।
অভিযোগকারী: মো: আব্দুল খালেক, পিতা- মৃত জয়নাল আবেদীন, সাং- মিরপুর-১০, ঢাকা।
— বনাম —
অভিযুক্ত আইনজীবী: জনাব ………….., অ্যাডভোকেট, ঢাকা আইনজীবী সমিতি (সনদ নং- ………….)।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল রুলস-এর রুল ৪৩ এবং বার কাউন্সিল অর্ডার ১৯৭২-এর ৩১ অনুচ্ছেদ মতে পেশাগত অসদাচরণের নালিশী দরখাস্ত
বিনীত নিবেদন এই যে—
- দরখাস্তকারী একজন নিরীহ সাধারণ বিচারপ্রার্থী। গত ১৫/০১/২০২৩ তারিখে দরখাস্তকারী ঢাকা জজ কোর্ট প্রাঙ্গণে একটি পারিবারিক মোকদ্দমা সংক্রান্ত কাজে গেলে অভিযুক্ত আইনজীবীর বেতনভুক্ত ক্লার্ক ও দালাল মো: রফিক দরখাস্তকারীকে জোরপূর্বক ফুসলিয়ে অভিযুক্ত আইনজীবীর চেম্বারে নিয়ে যায়।
- অভিযুক্ত আইনজীবী দরখাস্তকারীর নিকট হতে ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা ওকালতি ফি গ্রহণ করেন এবং প্রকাশ্যেই উক্ত দালালের হাতে দরখাস্তকারীর সামনে ১০,০০০/- টাকা ‘দালালি ফি বা কমিশন’ হিসেবে হস্তান্তর করেন।
- পরবর্তীতে দরখাস্তকারী প্রতিবাদ করিলে অভিযুক্ত আইনজীবী জানান যে, আদালত পাড়ায় দালাল দিয়ে কাজ আনা এবং ফি ভাগাভাগি করা তাদের নিয়মিত পেশাগত রীতি।
- অভিযুক্ত আইনজীবীর উক্ত কাজ বার কাউন্সিল ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট-এর পরিপন্থী এবং চরম পেশাগত অসদাচরণ (Professional Misconduct)।
- অত্র নালিশের সাথে ১,০০০/- টাকার পে-অর্ডার এবং সমর্থনমূলক হলফনামা সংযুক্ত করা হইল।
প্রার্থনা: অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে, অভিযুক্ত আইনজীবীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত নালিশটি তদন্তপূর্বক বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করিয়া তাহার ওকালতি সনদ চিরতরে বাতিল করার মর্জি হয়।
হলফনামা (Affidavit)
আমি মো: আব্দুল খালেক, বয়স- ৪৫ বছর, ধর্ম- ইসলাম, পেশা- ব্যবসা, সাং- মিরপুর-১০, ঢাকা, এই মর্মে শপথপূর্বক ঘোষণা করিতেছি যে, উপরোক্ত দরখাস্তের ১ হতে ৫ নং অনুচ্ছেদের সকল বিবরণ আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সত্য এবং সঠিক। অদ্য বিজ্ঞ নোটারি পাবলিকের সম্মুখে স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর করিলাম।
৫. বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত সম্ভাব্য শাস্তিসমূহ (Article 34)
বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল বিচার অন্তে দোষী প্রমাণিত হলে নিম্নোক্ত ৩টি শাস্তির যে কোনোটি প্রদান করতে পারেন:
- তিরস্কার (Reprimand): লঘু অপরাধে লিখিতভাবে সতর্ক করা।
- সাময়িক বরখাস্ত (Suspension): নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য (যেমন ১ থেকে ৩ বছর) আইন প্র্যাকটিস বন্ধ রাখা।
- স্থায়ী বহিষ্কার (Removal from Practice): ওকালতি সনদ স্থায়ীভাবে বাতিল করে আইনজীবী তালিকা হতে নাম চিরতরে কর্তন করা।
৬. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)
- ড. কামাল হোসেন বনাম বাংলাদেশ বার কাউন্সিল (40 DLR 332): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, আদালত পাড়ায় দালাল ও টাউট নির্মূলে বার কাউন্সিলকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং দালাল নিযুক্তকারী আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
- মোজাম্মেল হক বনাম ট্রাইব্যুনাল (28 DLR 154): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, আইনজীবীর অসদাচরণের বিচারকালে রুল ৪৩-এর বিধিমালা এবং প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার কঠোরভাবে পরিপালন করতে হবে।
৭. উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, দালালি ও ফি ভাগাভাগির দায়ে বার কাউন্সিলে নালিশী দরখাস্ত আইন পেশাকে বাণিজ্যিকীকরণ ও দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষা করার একটি সংবিধিবদ্ধ অস্ত্র। আইনজীবীদের সম্মান ও বিচারপ্রার্থী জনগণের পবিত্র আস্থা রক্ষায় এ ধরনের নীতিহীন কাজের বিরুদ্ধে বার কাউন্সিলের জিরো টলারেন্স নীতি অপরিহার্য।
📌 সম্পর্কিত আইনি প্রস্তুতি ও সহায়িকা লিংক:
- ২০১৭ সালের বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ মডেল সমাধান দেখুন
- বার কাউন্সিল রুলস ও প্রফেশনাল এথিক্স সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও আইনি আলোচনা
- বার কাউন্সিল ও জুডিশিয়ারি বার কাউন্সিল রুলস ও প্রফেশনাল এথিক্স অনলাইন মডেল টেস্ট দিন
- বার কাউন্সিল বিগত সকল লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংক ও ১০০% পূর্ণাঙ্গ সমাধান ব্যাংক
