অনির্দিষ্ট মেয়াদের অংশীদারি চুক্তি বলবৎকরণের অযোগ্যতা (SRA Sec 21(d)) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০

📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন

প্রশ্ন ৩। (খ): X ও Y তিন মাসের মধ্যে একটি ব্যবসা করার লক্ষ্যে অংশীদারি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। তিন মাস অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই Y অংশীদার হতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। চুক্তিটিতে অংশীদারীত্বের মেয়াদকাল সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। X এর প্রার্থনার প্রেক্ষিতে Y এর বিরুদ্ধে চুক্তিটি সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎ করা যাবে কি? যুক্তিসহ উত্তর দিন।

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

অত্র সমস্যায় দুই ব্যক্তি একটি অনির্দিষ্ট মেয়াদের অংশীদারি ব্যবসা (Partnership at Will) শুরু করার চুক্তি করেন। কিন্তু ব্যবসা শুরু হওয়ার আগেই এক পক্ষ অংশীদার হতে অস্বীকৃতি জানান। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ এর ২১ ধারায় কোন কোন চুক্তি বলবৎ করা যায় না তার তালিকা দেওয়া আছে। অংশীদারি চুক্তি কি আদালত কর্তৃক সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎ করা সম্ভব, নাকি এটি ব্যক্তিগত আস্থা ও অনির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তি বিধায় বলবৎযোগ্য নয়—তা বিশ্লেষণ করাই অত্র প্রশ্নের মূল উদ্দেশ্য।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

  • The Specific Relief Act, 1877:
    • Section 21(d): যে চুক্তি তার প্রকৃতিগত কারণেই বাতিলযোগ্য বা অবসানযোগ্য (A contract which is in its nature revocable)—তা সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎ করা যায় না।
    • Section 21(b): যে চুক্তি অতিমাত্রায় ব্যক্তিগত যোগ্যতা, ইচ্ছা বা আস্থার ওপর নির্ভরশীল (Contracts dependent on personal qualifications or volition)।
    • Section 21(g): যে চুক্তির মেয়াদ ৩ বছরের অধিককাল পর্যন্ত আদালতের সার্বক্ষণিক তদারকি দাবি করে।
  • The Partnership Act, 1932:
    • Section 7: ইচ্ছাধীন অংশীদারি (Partnership at will)—যেখানে অংশীদারির মেয়াদ বা অবসানের কোনো সুনির্দিষ্ট শর্ত উল্লেখ থাকে না।
    • Section 43: ইচ্ছাধীন অংশীদারি যেকোনো অংশীদার কর্তৃক অপর অংশীদারকে নোটিশ প্রদানের মাধ্যমেই অবসান করা যায়।

৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও যুক্তিভিত্তিক সমাধান

X-এর প্রার্থনার প্রেক্ষিতে Y-এর বিরুদ্ধে চুক্তিটি সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎ করা যাবে না। এর সপক্ষে সুনির্দিষ্ট আইনি যুক্তিসমূহ নিম্নে প্রদত্ত হলো:

  1. ১. চুক্তিটি প্রকৃতিগতভাবেই অবসানযোগ্য (Nature Revocable – Section 21(d)):
    চুক্তিতে অংশীদারির কোনো মেয়াদকাল উল্লেখ নেই। The Partnership Act, 1932-এর ৭ ধারা অনুযায়ী এটি একটি Partnership at Will (ইচ্ছাধীন অংশীদারি)। ইচ্ছাধীন অংশীদারির মূল বৈশিষ্ট্য হলো যেকোনো অংশীদার লিখিত নোটিশ দিয়ে যেকোনো মুহূর্তে চুক্তিটি ভেঙে দিতে পারেন (ধারা ৪৩)। The Specific Relief Act, 1877-এর ২১(ঘ) ধারার সুস্পষ্ট বিধান হলো—যে চুক্তি যেকোনো পক্ষ দ্বারা তাৎক্ষণিকভাবে অবসানযোগ্য (Revocable), আদালত কখনোই তা বলবৎ করবেন না। কারণ আজ আদালত বলবৎ করার ডিক্রি দিলে পরদিনই Y নোটিশ দিয়ে অংশীদারি বাতিল করে দিতে পারেন, যা আদালতের ডিক্রিকে অকার্যকর ও হাস্যকর করে তুলবে।
  2. ২. অংশীদারি ব্যক্তিগত আস্থা ও সম্পর্কের বিষয় (Personal Trust & Confidence):
    অংশীদারি ব্যবসা পারস্পরিক চরম বিশ্বাস ও সদ্ভাবের (Utmost good faith – Uberrimae fidei) ওপর প্রতিষ্ঠিত। কোনো ব্যক্তিকে জোর করে অপর ব্যক্তির সাথে ব্যবসা করতে বা অংশীদার হিসেবে থাকতে বাধ্য করা আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত (Section 21(b))।
  3. ৩. আদালতের পক্ষে সার্বক্ষণিক তদারকি অসম্ভব:
    ব্যবসায় তারা কীভাবে মুনাফা বণ্টন করবে, কীভাবে হিসাব রাখবে বা যৌথ সিদ্ধান্ত নিবে—তা আদালতের পক্ষে প্রতিদিন তদারকি করা সম্ভব নয়।

X-এর প্রকৃত আইনগত প্রতিকার:

চুক্তিটি সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎ করা না গেলেও The Specific Relief Act, 1877-এর ধারা ১৯ এবং The Contract Act, 1872-এর ধারা ৭৩ অনুযায়ী Y কর্তৃক চুক্তিভঙ্গের কারণে X যদি কোনো আর্থিক ক্ষতি বা ব্যয়ের সম্মুখীন হয়ে থাকেন, তবে তিনি ক্ষতিপূরণ (Compensation/Damages) আদায়ের মোকদ্দমা দায়ের করতে পারবেন।

৪. বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের প্রামাণ্য নজির

  • স্কট বনাম রেমন (Scott vs. Rayment, 1868 LR 7 Eq 112): চ্যান্সারি আদালত সুস্পষ্টভাবে নীতি প্রতিষ্ঠা করেন যে, আদালত অনির্দিষ্ট মেয়াদের কোনো অংশীদারি চুক্তি সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎ করার ডিক্রি প্রদান করবেন না, কারণ বিবাদী ডিক্রির পরপরই অংশীদারি ভেঙে দেওয়ার আইনগত অধিকার রাখেন।
  • মতিলাল বনাম বালদেওদাস, এআইআর ১৯২৭ বোম্বে ৪৪৫: অংশীদারি চুক্তি কার্যকরের ডিক্রি আদালত প্রদান করেন না; চুক্তিভঙ্গের একমাত্র প্রতিকার হলো দেওয়ানী আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ হাসিল করা।

৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত

অতএব, The Specific Relief Act, 1877-এর Section 21(d) এবং The Partnership Act, 1932-এর Section 7 ও 43-এর মিলিত বিধানের আলোকে X কর্তৃক Y-এর বিরুদ্ধে চুক্তিটি সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎ করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। X কেবল উপযুক্ত আদালতে চুক্তিভঙ্গের ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।

৪.১. অনির্দিষ্ট মেয়াদের অংশীদারি চুক্তি বলবৎ না হওয়ার আইনি কারণ (ধারা ২১(ঘ))

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ২১(ঘ) ধারা অনুযায়ী যে চুক্তি তার প্রকৃতির কারণেই প্রত্যাহারযোগ্য (Revocable in Nature), আদালত তা সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎ করবেন না:

  • অংশীদারি আইন, ১৯৩২-এর ৭ ধারা মতে যে অংশীদারির কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারিত থাকে না, তা হলো ‘ইচ্ছাধীন অংশীদারি’ (Partnership at will);
  • যেহেতু যেকোনো অংশীদার নোটিশ দিয়ে যেকোনো মুহূর্তে ফার্ম বিলোপ করতে পারে, তাই আদালত এমন চুক্তি বলবৎ করার অর্থহীন আদেশ দেবেন না যা পক্ষগণ পরক্ষণেই বাতিল করতে পারে;
  • সুপ্রিম কোর্ট (আলমগীর বনাম কামাল, 49 DLR 212) নজিরে রায় দেন যে, প্রতিকার হিসেবে অংশীদার কেবল অংশীদারি ফার্মের বিলোপ ও হিসাব-নিকাশের (Dissolution & Accounts) মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন।

৪.২. অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ ও ফৌজদারি দায়

অংশীদারি চুক্তি আদালতের মাধ্যমে বলবৎ না হলেও কোনো অংশীদার যদি ফার্মের তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ করে বা বিশ্বাসভঙ্গ করে, তবে সংক্ষুব্ধ অংশীদার দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪০৩ ধারায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে পারেন এবং সালিশের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি অধিকার সংরক্ষণ করেন।

আইনি সিদ্ধান্ত: অতএব, অংশীদারি চুক্তি বলবৎ না হলেও ফার্মের হিসাব-নিকাশ বুঝে নেওয়া এবং আত্মসাৎকৃত অর্থের ক্ষতিপূরণ দাবি করাই সংক্ষুব্ধ অংশীদারের প্রধান আইনি প্রতিকার।

Related Articles

Back to top button