চুরি একটি দখল সংক্রান্ত অপরাধ, মালিকানা সংক্রান্ত নয় | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৬
প্রশ্ন ৬। (খ): “চুরি একটি দখল সংক্রান্ত অপরাধ, মালিকানা সংক্রান্ত নয়” — আলোচনা করুন। [৫]
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৭৮ ধারায় চুরির (Theft) সংজ্ঞা নির্ধারণে আইনপ্রণেতাগণ ‘মালিকানা’ (Ownership) শব্দটিকে পরিহার করে সুনির্দিষ্টভাবে ‘দখল’ (Possession) শব্দটির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ফৌজদারি আইন সম্পত্তির প্রকৃত মালিককে সুরক্ষা দেওয়ার চেয়ে কোনো ব্যক্তির আপাত শান্তিময় দখল সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। অত্র প্রশ্নে চুরির এই অন্তর্নিহিত আইনতত্ত্ব বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইনি বিধানাবলী (Statutory Provisions)
- The Penal Code, 1860 (Section 378):
- “Whoever, intending to take dishonestly any movable property out of the possession of any person without that person’s consent, moves that property in order to such taking, is said to commit theft.”
- ৩৭৮ ধারার দৃষ্টান্তে (Illustrations j and k) মালিক কর্তৃক নিজের সম্পত্তি চুরির সুনির্দিষ্ট স্বীকৃতি।
৩. বিশদ আইনি বিশ্লেষণ ও প্রশ্নের উত্তর
(১) চুরির সংজ্ঞায় ‘দখল’-এর অবস্থান
দণ্ডবিধির ৩৭৮ ধারা বিশ্লেষণ করলে ৫টি মৌলিক উপাদান পাওয়া যায়:
- অসদুপায়ে গ্রহণের অভিপ্রায় (Dishonest intention to take);
- সম্পত্তিটি অস্থাবর সম্পত্তি হওয়া (Movable property);
- অন্য ব্যক্তির দখল থেকে গ্রহণ (Out of the possession of any person);
- উক্ত ব্যক্তির সম্মতি ব্যতিরেকে (Without that person’s consent); এবং
- উক্ত উদ্দেশ্যে সম্পত্তিটি স্থানান্তরিত করা (Moving the property)।
এখানে লক্ষণীয় যে, আইনে বলা হয়েছে “out of the possession of any person”; কিন্তু কোথাও বলা হয়নি “out of the ownership of any person”। অর্থাৎ সম্পত্তির মালিক কে তা জানার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; সম্পত্তিটি কার দখলে ছিল এবং তার অনুমতি ছাড়া সরানো হয়েছে কি না—সেটাই চুরির একমাত্র বিচার্য বিষয়।
(২) মালিক নিজেও কি নিজের সম্পত্তি চুরি করতে পারে?
হ্যাঁ, সম্পত্তির প্রকৃত মালিকও তার নিজস্ব সম্পত্তি চুরির দায়ে অভিযুক্ত হতে পারে!
দণ্ডবিধির ৩৭৮ ধারার দৃষ্টান্ত (j) এবং (k) এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ:
- দৃষ্টান্ত (j): ক তার ঘড়িটি মেরামতের জন্য ঘড়ি প্রস্তুতকারক খ-এর নিকট দিল। খ ঘড়িটি মেরামত করে এবং পারিশ্রমিকের দাবিতে লিয়েন (Lien) হিসেবে ঘড়িটি নিজের দখলে রাখে। ক খ-এর পাওনা পারিশ্রমিক না দেওয়ার উদ্দেশ্যে খ-এর অজ্ঞাতে ও সম্মতি ছাড়া গোপনে ঘড়িটি তুলে নিয়ে যায়। এখানে ঘড়ির আসল মালিক ক হওয়া সত্ত্বেও সে খ-এর আইনসঙ্গত দখল ক্ষুণ্ণ করে অসদুপায়ে ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে ঘড়ি সরিয়ে নেওয়ায় ক চুরির অপরাধে দোষী হবে।
- দৃষ্টান্ত (k): ক তার কোনো মালামাল বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ করল। পরবর্তীতে বন্ধকগ্রহীতার ঋণ পরিশোধ না করে গোপনে বন্ধকী মালামাল তুলে নিয়ে গেলে মালিক নিজেই চুরির অপরাধ করবে।
৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স
১. কে.এন. মেহরা বনাম স্টেট অব রাজস্থান (AIR 1957 SC 369): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, চুরির অপরাধে মালিকানা কোনো শর্ত নয়; অস্থায়ী বা সীমিত সময়ের দখল ক্ষুণ্ণ করা হলেও চুরির উপাদান সম্পূর্ণ হয়।
২. রফিকুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র (43 DLR 150): হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেন যে, ফৌজদারি আদালতে চুরির প্রমাণে বাদীর মালিকানা স্বত্ব প্রমাণের প্রয়োজন নেই, কেবল নালিশী মাল বাদীর দখলে ছিল এবং তা সম্মতি ছাড়া নেওয়া হয়েছে—এটুকু প্রমাণই যথেষ্ট।
৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত
সুতরাং, প্রমাণিত হয় যে চুরি সম্পূর্ণরূপে একটি ‘দখল সংক্রান্ত অপরাধ’ (Offence against possession); মালিকানা সংক্রান্ত নয়। সম্পত্তির মালিক নিজেও যদি দখলদারের সম্মতি ছাড়া অসদুপায়ে সম্পত্তি অপসারণ করে, তবে সে-ও চুরির দায়ে দণ্ডনীয় হবে।
🏛️ সম্পর্কিত প্রশ্নপত্র: এই প্রশ্নটি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষা ২০২৬-এর প্রশ্নপত্রে অন্তর্ভুক্ত। সম্পূর্ণ বিগত বছরের প্রশ্নব্যাংক দেখতে আমাদের মূল আর্কাইভে প্রবেশ করুন।
