দণ্ডবিধিতে অপরাধ সংঘটনে সহায়তার সংজ্ঞা ও মাধ্যমসমূহ – বার কাউন্সিল লিখিত ২০১৭
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১৭: দণ্ডবিধি, ১৮৬০
প্রশ্ন: ৫। (ক) দণ্ডবিধির ১০৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধে সহায়তা বা প্ররোচনা (Abetment) বলিতে কি বুঝায়? অপরাধে সহায়তার ৩টি প্রধান মাধ্যম বা পদ্ধতি বিশদভাবে আলোচনা করুন। সহায়তাকারী (Abettor – Section 108)-এর সংজ্ঞা ও অপরাধ সংঘটিত না হইলেও সহায়তাকারীর দায় কি? সুপ্রিম কোর্টের নজিরসহ আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও সহায়তার ধারণা
দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (The Penal Code, 1860)-এর ধারা ১০৭-এ অপরাধে সহায়তা বা দুষ্কর্মের প্ররোচনা (Abetment) সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অপরাধ কেবল যে ব্যক্তি নিজ হাতে বাস্তবায়ন করে সে-ই অপরাধী নয়; বরং যে ব্যক্তি পর্দার আড়ালে থেকে অপরাধীকে উসকানি দেয়, ষড়যন্ত্র করে বা অপরাধ সংঘটনের পথ সুগম করে দেয়, সে-ও আইনের চোখে সমান অপরাধী। ল্যাটিন নীতি—“Qui facit per alium facit per se” (যে ব্যক্তি অন্যের মাধ্যমে কাজ করায় সে নিজেই কাজটি করে)।
২. অপরাধে সহায়তার ৩টি সংবিধিবদ্ধ মাধ্যম (Three Modes of Abetment – Section 107)
দণ্ডবিধির ১০৭ ধারা মোতাবেক একজন ব্যক্তি ৩টি উপায়ে কোনো অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করতে পারে:
- ১. উসকানি বা প্ররোচনার দ্বারা (By Instigation): কোনো ব্যক্তিকে কোনো অপরাধমূলক কাজ করার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উত্তেজিত করা, ফুসলানো, প্ররোচিত করা বা মিথ্যা পরামর্শ প্রদান করা।
- ২. ষড়যন্ত্রের দ্বারা (By Conspiracy): এক বা একাধিক ব্যক্তির সাথে কোনো অপরাধ সংঘটনের লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়া এবং উক্ত ষড়যন্ত্রের অনুসরণে কোনো কাজ বা অবৈধ ব্যর্থতা সংঘটিত হওয়া।
- ৩. ইচ্ছাকৃত প্রত্যক্ষ সহায়তার দ্বারা (By Intentional Aid): কোনো কাজ বা অবৈধ ব্যর্থতার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনে সরাসরি সাহায্য করা বা অপরাধীর জন্য কাজটিকে সহজতর করে তোলা (যেমন অপরাধীকে অস্ত্র সরবরাহ করা, দরজা খুলে রাখা বা পুলিশকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা)।
৩. সহায়তাকারীর সংজ্ঞা ও স্বতন্ত্র দায় (Section 108)
দণ্ডবিধির ১০৮ ধারায় ‘সহায়তাকারী (Abettor)’-এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ১০৮ ধারার ৫টি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যার আলোকে সহায়তাকারীর দায় পর্যালোচনা করলে নিম্নোক্ত মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে ওঠে:
- অপরাধ সংঘটিত না হলেও সহায়তাকারী দায়ী (Explanation 2): সহায়তা বা প্ররোচনা সম্পন্ন হওয়ার পর যদি মূল অপরাধী অপরাধটি সংঘটন করতে ব্যর্থ হয় বা পুলিশ তাকে পূর্বেই ধরে ফেলে, তবুও সহায়তাকারী ১০৯ বা ১১৫/১১৬ ধারা অনুযায়ী প্ররোচনার দায়ে সমভাবে শাস্তিযোগ্য হবে।
- মূল অপরাধী ক্ষমতাহীন হলেও সহায়তাকারী দায়ী (Explanation 3): যদি কোনো নাবালক বা পাগল ব্যক্তিকে প্ররোচিত করে কোনো কাজ করানো হয়, তবে নাবালক বা পাগল রেহাই পেলেও সহায়তাকারী পূর্ণ বয়স্ক অপরাধীর ন্যায় সম্পূর্ণ শাস্তি পাবে।
৪. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: প্ররোচনা (ধারা ১০৭) বনাম সাধারণ অভিপ্রায় (ধারা ৩৪)
| তুলনার ক্ষেত্র | অপরাধে সহায়তা (ধারা ১০৭) | সাধারণ অভিপ্রায় (ধারা ৩৪) |
|---|---|---|
| অপরাধের প্রকৃতি | একটি স্বতন্ত্র ও সংবিধিবদ্ধ অপরাধ। | কোনো অপরাধ নয়; কেবল প্রমাণের নিয়ম। |
| উপস্থিতি | অপরাধস্থলে উপস্থিত থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। | সাধারণ নিয়মে অপরাধস্থলে অংশগ্রহণ অপরিহার্য। |
| সম্পর্ক | সহায়তাকারী ও মূল অপরাধীর মধ্যে পূর্বে পরিচয় নাও থাকতে পারে। | উভয়ের মধ্যে মনের পূর্ব-ঐক্য (Pre-arranged plan) আবশ্যক। |
৫. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)
- সম্রাট বনাম সুকুমার (AIR 1930 Cal 530): আদালত রায় দেন যে, প্ররোচনা কেবল মুখের কথায় হতে পারে না, তা এমন সুস্পষ্ট আচরণ হতে হবে যা অন্যকে অপরাধে চালিত করে।
- রাষ্ট্র বনাম আনোয়ার হোসেন (43 DLR (AD) 124): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, মূল অপরাধী অপরাধে ব্যর্থ হলেও প্ররোচনাকারীর শাস্তি কোনোভাবেই মওকুফ হবে না।
৬. উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, দণ্ডবিধিতে অপরাধ সংঘটনে সহায়তার সংজ্ঞা ও মাধ্যমসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে আইন অপরাধের পেছনের মস্তিষ্ক ও ইন্দনদাতাকে কখনোই রেহাই দেয় না। সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখতে সহায়তাকারীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও জরুরি।
৪.১. সহায়তার বিভিন্ন পর্যায় ও শাস্তির মাত্রা (Sections 109–116 Penal Code)
| পরিস্থিতি | সংশ্লিষ্ট ধারা | আইনি ফলাফল ও শাস্তি |
|---|---|---|
| সহায়তার ফলে অপরাধ সংঘটিত হলে এবং পৃথক শাস্তি না থাকলে | ধারা ১০৯ | মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত সমান পূর্ণাঙ্গ শাস্তি পাবে। |
| সহায়তার ফলে এক অপরাধ করতে গিয়ে ভিন্ন অপরাধ ঘটলে | ধারা ১১১ | সম্ভাব্য পরিণতি (Probable consequence) হলে নতুন অপরাধের জন্যও দায়ী হবে। |
| মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে সহায়তা কিন্তু অপরাধ সংঘটিত না হলে | ধারা ১১৫ | সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। |
| কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধে সহায়তা কিন্তু অপরাধ সংঘটিত না হলে | ধারা ১১৬ | মূল সাজার এক-চতুর্থাংশ (১/৪) মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ড। |
৪.২. সহায়তাকারী ও দুষ্কর্মের সহযোগীর সাক্ষ্যমূল্য (Accomplice Evidence)
সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১৩৩ ধারা অনুযায়ী একজন দুষ্কর্মের সহযোগী (Accomplice বা সহায়তাকারী) অভিযুক্ত আসামির বিরুদ্ধে একজন সম্পূর্ণ আইনসম্মত ও যোগ্য সাক্ষী। এমনকি কোনো স্বতন্ত্র সমর্থন ছাড়াই একক সহায়তাকারীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা প্রদান আইনত অবৈধ নয়। তবে সাক্ষ্য আইনের ১১৪ ধারার (খ) দৃষ্টান্তে আদালতকে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, আদালত অনুমান করতে পারেন যে দুষ্কর্মের সহযোগী অবিশ্বস্ত, যদি না বস্তুগত বিষয়ে তার বক্তব্য স্বাধীন সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত হয় (ভুবনী সাহু বনাম সম্রাট, 53 CWN 737)।
৪.৩. নীরবতা বা অবৈধ নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে সহায়তা (Abetment by Illegal Omission)
দণ্ডবিধির ১০৭ ধারার ৩য় ব্যাখ্যা অনুযায়ী কেবল কাজের দ্বারাই নয়, বরং কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো কাজ করতে আইনত বাধ্য থাকে (যেমন পাহারারত পুলিশ কর্মকর্তা) কিন্তু সে ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব থেকে বা দায়িত্ব পালন না করে অপরাধীকে অপরাধ করার সুযোগ করে দেয় (Illegal Omission), তবে সে-ও অপরাধে প্রত্যক্ষ সহায়তার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হবে। সুপ্রিম কোর্ট (রাষ্ট্র বনাম সোলেমান, 32 DLR 140) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, সরকারি কর্মকর্তার ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা অপরাধে সরাসরি প্ররোচনা ও সহায়তার শামিল।
৪.৩. নীরবতা বা অবৈধ নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে সহায়তা (Abetment by Illegal Omission)
দণ্ডবিধির ১০৭ ধারার ৩য় ব্যাখ্যা অনুযায়ী কেবল কাজের দ্বারাই নয়, বরং কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো কাজ করতে আইনত বাধ্য থাকে (যেমন পাহারারত পুলিশ কর্মকর্তা) কিন্তু সে ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব থেকে বা দায়িত্ব পালন না করে অপরাধীকে অপরাধ করার সুযোগ করে দেয় (Illegal Omission), তবে সে-ও অপরাধে প্রত্যক্ষ সহায়তার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হবে। সুপ্রিম কোর্ট (রাষ্ট্র বনাম সোলেমান, 32 DLR 140) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, সরকারি কর্মকর্তার ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা অপরাধে সরাসরি প্ররোচনা ও সহায়তার শামিল।

