বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কি বৈশিষ্ট্য ও দক্ষতা শৃঙ্খলা রক্ষায় সাফল্য মূল্যায়ন – ২০১৪

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১৪: বার কাউন্সিল অর্ডার ও রুলস, ১৯৭২

প্রশ্ন: বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কি? ইহার মূল বৈশিষ্ট্য ও সংবিধিবদ্ধ কার্যাবলি আলোচনা করুন। আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, সম্মান সমুন্নত রাখা এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় বার কাউন্সিলের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করুন। বার কাউন্সিলকে অধিকতর কার্যকর করার জন্য বাস্তবসম্মত সুপারিশমালা উপস্থাপন করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972 (President’s Order No. 46 of 1972)-এর অধীনে গঠিত বাংলাদেশ বার কাউন্সিল (Bangladesh Bar Council) হলো বাংলাদেশের সকল তালিকাভুক্ত আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণ, লাইসেন্স প্রদান, পেশাগত নীতি নির্ধারণ এবং শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত একটি সংবিধিবদ্ধ, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ আইনি সংস্থা (Body Corporate)। স্বাধীন বাংলাদেশের আইন পেশাকে ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত করে গণতান্ত্রিক ও স্বশাসিত পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ৪৬ দ্বারা এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি আত্মপ্রকাশ করে।

২. বার কাউন্সিলের আইনি সত্তা ও ৫টি অনন্য বৈশিষ্ট্য (Characteristics)

বার কাউন্সিল অর্ডারের অনুচ্ছেদ ৩, ৪ ও ৫ অনুযায়ী বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো:

  1. সংবিধিবদ্ধ কৃত্রিম আইনি সত্তা (Body Corporate – Article 3): বার কাউন্সিলের একটি চিরন্তন অস্তিত্ব (Perpetual Succession) এবং একটি সাধারণ নিজস্ব সিলমোহর (Common Seal) রয়েছে। এটি স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অর্জন, ধারণ ও হস্তান্তরের অধিকারী এবং নিজ নামে যে কোনো আদালতে মামলা দায়ের বা মামলার শিকার হতে পারে।
  2. গণতান্ত্রিক ও সংবিধিবদ্ধ গঠন (Composition – Article 5): বার কাউন্সিল মোট ১৫ (পনেরো) জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত:
    • পদাধিকারবলে চেয়ারম্যান: বাংলাদেশের মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেল পদাধিকারবলে বার কাউন্সিলের সম্মানিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
    • ১৪ জন নির্বাচিত সদস্য: সমগ্র দেশের বার অ্যাসোসিয়েশনসমূহের ভোটার তালিকাভুক্ত নিয়মিত আইনজীবীদের সরাসরি গোপন ব্যালটে ৩ (তিন) বছরের জন্য নির্বাচিত হন। এর মধ্যে ৭ জন সাধারণ আসন হতে এবং ৭ জন নির্দিষ্ট আঞ্চলিক গ্রুপ আসন হতে নির্বাচিত হন।
  3. বিধি প্রণয়নের ব্যাপক ক্ষমতা (Rule Making Power – Article 40): আইন পেশা পরিচালনা, আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তি ও সনদ প্রদান, ফি নির্ধারণ এবং অসদাচরণের আচরণবিধি সংক্রান্ত যাবতীয় রুলস প্রণয়নের একচ্ছত্র ক্ষমতা বার কাউন্সিলের রয়েছে।
  4. বিচারিক ট্রাইব্যুনাল পরিচালনা (Disciplinary Tribunal – Article 33): আইনজীবীদের পেশাগত অসদাচরণের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার করার জন্য বার কাউন্সিলের নিজস্ব ট্রাইব্যুনাল রয়েছে, যা সিপিসির আওতায় একটি পূর্ণাঙ্গ দেওয়ানি আদালতের সমক্ষমতা সম্পন্ন।
  5. আইনি শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ (Legal Education Committee – Article 10): বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ল’ কলেজের আইন শিক্ষার পাঠ্যসূচি, পরীক্ষার মান এবং আইনি ডিগ্রির স্বীকৃতি তত্ত্বাবধানের আইনি কর্তৃত্ব বার কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত।

৩. বার কাউন্সিলের ৫টি সংবিধিবদ্ধ স্থায়ী কমিটি ও তাদের কার্যাবলি

কমিটির নাম আইনি ভিত্তি প্রধান কার্যাবলি ও এখতিয়ার
১. এক্সিকিউটিভ কমিটি (Executive Committee) অনুচ্ছেদ ১১(১)(ক) বার কাউন্সিলের সার্বিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, স্টাফ নিয়ন্ত্রণ ও দৈনন্দিন নির্বাহী দায়িত্ব পালন।
২. এনরোলমেন্ট কমিটি (Enrollment Committee) অনুচ্ছেদ ১১(১)(খ) আপিল বিভাগের বিচারপতির নেতৃত্বে আইনজীবী তালিকাভুক্তি পরীক্ষা (MCQ, Written, Viva) গ্রহণ ও সনদ প্রদান।
৩. ফিন্যান্স কমিটি (Finance Committee) অনুচ্ছেদ ১১(১)(গ) বার কাউন্সিলের তহবিল ব্যবস্থাপনা, বাজেট প্রণয়ন ও নিরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ।
৪. লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি (Legal Education Committee) অনুচ্ছেদ ১১(১)(ঘ) আইন শিক্ষার মানদণ্ড নিরূপণ ও অনুমোদনহীন ল’ কলেজসমূহের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ।
৫. ডিসিপ্লিনারি ট্রাইব্যুনাল (Disciplinary Tribunal) অনুচ্ছেদ ৩৩ পেশাগত অসদাচরণের বিচার, তিরস্কার, পেশা স্থগিত ও লাইসেন্স চিরতরে বাতিলের দণ্ড প্রদান।

৪. আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা, সম্মান ও শৃঙ্খলা রক্ষায় বার কাউন্সিলের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন

(ক) পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণে সাফল্য:

  • কঠোর ত্রিমুখী পরীক্ষা পদ্ধতি: অতীতে ঢালাওভাবে সনদ প্রদানের রীতি ভেঙে বর্তমানে প্রিলিমিনারি এমসিকিউ, লিখিত এবং ভাইভা পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতম প্রার্থীদের আইনজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
  • প্রশিক্ষণ কর্মশালা ও সেমিনার: নতুন তালিকাভুক্ত আইনজীবীদের জন্য লিগ্যাল ড্রাফটিং, ট্রায়াল প্রসিডিউর এবং কোর্ট ম্যানার্সের ওপর ওরিয়েন্টেশন কোর্স পরিচালনা করা হয়।

(খ) পেশাগত সম্মান ও কল্যাণ রক্ষায় সাফল্য:

  • বেনেভোলেন্ট ফান্ড ও ট্রাস্ট: প্রয়াত আইনজীবীদের পরিবারকে এককালীন আর্থিক অনুদান এবং অসুস্থ আইনজীবীদের চিকিৎসা সহায়তা তহবিল কার্যকরভাবে পরিচালনা করছে।
  • আইন পেশার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ: বহিরাগতদের ওকালতি পেশায় ভুয়া অনুপ্রবেশ রোধে বার কাউন্সিল ডিজিটাল কার্ড ও বায়োমেট্রিক ডাটাবেজ প্রণয়ন করেছে।

(গ) পেশাগত শৃঙ্খলা রক্ষা ও ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতায় সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা:

  • ট্রাইব্যুনালের দীর্ঘসূত্রতা: অনুচ্ছেদ ৩৩ মতে গঠিত ট্রাইব্যুনালে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অসংখ্য অভিযোগ জমা থাকলেও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্থায়ী অবকাঠামোর অভাব পরিলক্ষিত হয়।
  • টাউট ও ভুয়া আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অভিযান: আদালত পাড়ায় টাউট, দালাল ও সনদহীন ভুয়া আইনজীবীদের বিরুদ্ধে স্থায়ী ও কঠোর অভিযানের ধারাবাহিকতার ঘাটতি রয়েছে।
  • রাজনৈতিক মেরুকরণ: বার কাউন্সিলের নিয়মিত নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতির তীব্র মেরুকরণ অনেক সময় পেশাগত নিরপেক্ষতা ও শৃঙ্খলা রক্ষার গতিকে শ্লথ করে তোলে।

৫. বার কাউন্সিলকে অধিকতর কার্যকর করার বাস্তবসম্মত সুপারিশমালা

  1. পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইব্যুনালের স্থায়ী পৃথক বেঞ্চ স্থাপন এবং সর্বোচ্চ ৬ মাসের মধ্যে বিচার সমাপ্তির সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা আরোপ করা।
  2. প্রতি বছর তালিকাভুক্ত আইনজীবীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের বাধ্যতামূলক ‘Continuing Legal Education (CLE)’ বা চলমান আইনি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রবর্তন করা।
  3. ভুয়া অ্যাডভোকেট ও টাউটদের সমূলে উৎপাটনে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর সহযোগিতায় স্থায়ী মোবাইল কোর্ট ও টাস্কফোর্স পরিচালনা করা।

৬. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)

  • ড. কামাল হোসেন বনাম বাংলাদেশ বার কাউন্সিল (40 DLR 332): সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, বার কাউন্সিল কেবল আইনজীবীদের কল্যাণ সমিতি নয়, এটি বিচার বিভাগের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা রক্ষার সাংবিধানিক সহযোগী অঙ্গ।
  • মোজাম্মেল হক বনাম বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল (28 DLR 154): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি (Natural Justice) লঙ্ঘন করা হলে উক্ত বিচারিক আদেশ বাতিলযোগ্য।

৭. উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কি বৈশিষ্ট্য ও দক্ষতা শৃঙ্খলা রক্ষায় সাফল্য মূল্যায়ন করতে গেলে দেখা যায় যে এটি আইনজীবীদের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার সর্বোচ্চ অভিভাবক প্ল্যাটফর্ম। কিছু প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সংস্থাটি বাংলাদেশের আইনের শাসন, মানবাধিকার ও স্বাধীন বিচার প্রশাসনের পবিত্রতা রক্ষায় অর্ধশতাব্দী ধরে অপরিহার্য চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।

Related Articles

Back to top button