দণ্ডবিধির ৩৪ ধারার অভিন্ন অভিপ্রায় ও অংশগ্রাহণ বনাম ১৪৯ ধারার অভিন্ন উদ্দেশ্য | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০
📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | দণ্ডবিধি
প্রশ্ন ৬। (খ): ”অভিন্ন অভিপ্রায় ও অংশগ্রহণ উভয়েরই উপস্থিতি ছাড়া The Penal Code, 1860 এর ৩৪ ধারা প্রযুক্ত হতে পারে না।” বক্তব্যটির যথার্থতা নিরূপণ করুন। একজন ব্যক্তিকে তার দ্বারা সরাসরি সংঘটিত হয়নি এরূপ অপরাধের জন্য দায়ী করার ক্ষেত্রে ‘অভিন্ন অভিপ্রায়’ ও ‘অভিন্ন উদ্দেশ্য’ এর ভূমিকা আলোচনা করে আপনার উত্তরকে সমৃদ্ধ করুন।
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
ফৌজদারি আইনের মূল স্তম্ভ হলো—যে অপরাধ করে তাকেই দণ্ড দেওয়া হয়। তবে যৌথ দায়দায়িত্বের ক্ষেত্রে (Constructive Liability) একজন ব্যক্তি সরাসরি মূল অপরাধমূলক কর্ম (Overt act) না করলেও তাকে অন্যদের সাথে সমানভাবে দায়ী করা যায়। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৪ ধারা (সাধারণ বা অভিন্ন অভিপ্রায়) এবং ১৪৯ ধারা (সাধারণ বা অভিন্ন উদ্দেশ্য) হলো যৌথ অপরাধিক দায়ের দুটি প্রধান আইনি হাতিয়ার। ৩৪ ধারার কার্যকারিতার জন্য “অভিন্ন অভিপ্রায়” এবং “প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ” কেন অপরিহার্য এবং ৩৪ ও ১৪৯ ধারার প্রয়োগগত পার্থক্য বিশ্লেষণ করাই অত্র প্রশ্নের মূল উদ্দেশ্য।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী
- The Penal Code, 1860:
- Section 34: Acts done by several persons in furtherance of common intention (সাধারণ অভিপ্রায় পূরণকল্পে একাধিক ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত কাজ)।
- Section 141 & Section 149: বেআইনি সমাবেশ এবং সাধারণ উদ্দেশ্য (Common Object) বাস্তবায়নে সংঘটিত অপরাধের যৌথ দায়।
৩. বক্তব্যটির যথার্থতা নিরূপণ
বক্তব্যটি সম্পূর্ণরূপে যথার্থ ও আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি। ৩৪ ধারার যৌথ দায় প্রতিষ্ঠার জন্য দুটি উপাদানের যুগপৎ (Simultaneous) উপস্থিতি থাকা আবশ্যক:
- উপাদান ১: পূর্বপরিকল্পিত অভিন্ন অভিপ্রায় (Pre-arranged Common Intention):
অপরাধ সংগঠনের পূর্বে পক্ষগণের মনের পূর্বমিলন (Prior meeting of minds) থাকতে হবে। এই পূর্বপরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে, আবার ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবেও উদ্ভূত হতে পারে (Even at the spur of the moment)। কিন্তু সকলের উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় এক ও অভিন্ন হতে হবে। কেবল অনুরূপ অভিপ্রায় (Similar intention) থাকলে ৩৪ ধারা প্রযোজ্য হবে না। - উপাদান ২: অপরাধ সম্পাদনে কোনো না কোনোভাবে শারীরিক অংশগ্রহণ (Participation in the Crime):
অভিপ্রায় যতই থাকুক, যদি ব্যক্তি অপরাধমূলক কর্মে কোনো অংশগ্রহণ না করে, তবে তাকে ৩৪ ধারায় দায়ী করা যায় না। তবে এই “অংশগ্রহণ” মানেই যে নিজ হাতে খুন বা কোপ দিতে হবে তা নয়; দরজায় পাহারা দেওয়া, পালিয়ে যেতে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করা বা আক্রান্ত ব্যক্তিকে ধরে রাখাও অপরাধে সক্রিয় অংশগ্রহণ হিসেবে গণ্য হবে। বিখ্যাত বারীন্দ্র কুমার ঘোষ (Barendra Kumar Ghosh) মামলায় বলা হয়েছিল—“They also serve who only stand and wait” (যে দরজায় কেবল দাঁড়িয়ে পাহারা দেয়, সে-ও অপরাধে অংশগ্রহণকারী)।
৪. অভিন্ন অভিপ্রায় (Section 34) বনাম অভিন্ন উদ্দেশ্য (Section 149)
| তুলনার ক্ষেত্র | অভিন্ন অভিপ্রায় (Section 34) | অভিন্ন উদ্দেশ্য (Section 149) |
|---|---|---|
| ১. ব্যক্তির সংখ্যা | ন্যূনতম ২ জন ব্যক্তি হলেই চলে। | ন্যূনতম ৫ জন বা ততোধিক ব্যক্তি থাকা আবশ্যক (বেআইনি সমাবেশ)। |
| ২. পূর্বমিলন / পরিকল্পনা | মনের পূর্বপরিকল্পনা ও সম্মতি (Prior meeting of minds) আবশ্যক। | পূর্বপরিকল্পনা আবশ্যক নয়; ১৪১ ধারার ৫টি উদ্দেশ্যের যেকোনো একটিতে একমত হলেই যথেষ্ট। |
| ৩. অপরাধে অংশগ্রহণ | শারীরিক অংশগ্রহণ (পাহারা দেওয়া বা কর্ম সম্পাদন) অপরিহার্য। | সক্রিয় অংশগ্রহণ নিষ্প্রয়োজন; কেবল সমাবেশের সদস্য থাকলেই প্রত্যেকের ওপর যৌথ দায় বর্তায়। |
| ৪. স্বতন্ত্র অপরাধের স্বরূপ | ৩৪ ধারা কোনো স্বতন্ত্র অপরাধ সৃষ্টি করে না; এটি কেবল প্রমাণের একটি সাক্ষ্যগত নীতি (Rule of evidence)। | ১৪৯ ধারা একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র সংবিধিবদ্ধ অপরাধ সৃষ্টি করে (Substantive offense)। |
৫. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির
- বারীন্দ্র কুমার ঘোষ বনাম সম্রাট, এআইআর ১৯২৫ পিসি ১ (শঙ্করীটোলা পোস্ট অফিস মামলা): পোস্টমাস্টারকে খুনের সময় আসামী বাইরে পাহারা দিচ্ছিলেন। প্রিভি কাউন্সিল রায় দেয় যে, অভিন্ন অভিপ্রায় বাস্তবায়নে দরজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দেওয়াও সক্রিয় শারীরিক অংশগ্রহণ এবং ৩৪ ধারায় সমভাবে খুনের দায় বর্তাবে।
- মেহবুব শাহ বনাম সম্রাট, এআইআর ১৯৪৫ পিসি ১১৮ (সিন্ধু নদী মামলা): অভিন্ন অভিপ্রায় (Common intention) এবং অনুরূপ অভিপ্রায় (Similar intention)-এর পার্থক্য স্পষ্ট করা হয়। অনুরূপ ভাবনা থাকলেও যদি পক্ষদের মাঝে কোনো মানসিক সমন্বয় না থাকে, তবে ৩৪ ধারা প্রযুক্ত হবে না।
৬. উপসংহার
৩৪ ধারায় কাউকে অন্যের কৃত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে, আসামীদের মনের মিলন ঘটেছিল এবং সেই অভিপ্রায় বাস্তবায়নে আসামী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল।
৪.১. দণ্ডবিধির ৩৪ ধারার পূর্ব অভিসন্ধি ও ল্যান্ডমার্ক পোস্টমাস্টার মামলা
দণ্ডবিধির ৩৪ ধারার মূল সুর হলো যৌথ অংশগ্রহণ ও পূর্ব অভিসন্ধি (Common Intention):
- প্রিভি কাউন্সিলের ঐতিহাসিক মামলা (বীরেন্দ্র কুমার ঘোষ বনাম সম্রাট – শাঁখারীটোলা পোস্টমাস্টার মার্ডার কেস, AIR 1925 PC 1)-এ লর্ড সামনার ঘোষণা করেছিলেন: “They also serve who only stand and wait” — অর্থাৎ যে ব্যক্তি অপরাধের সময় দরজায় পাহারা দিয়ে অন্যদের সহযোগিতা করেছে, সেও খুনের সমপরিমাণ অপরাধে দণ্ডিত হবে;
- ৩৪ ধারা কোনো স্বতন্ত্র অপরাধ সৃষ্টি করে না; এটি নিছক যৌথ ফৌজদারি দায়ের একটি সংবিধিবদ্ধ সাক্ষ্যিক নীতি (Rule of Evidence);
- সুপ্রিম কোর্ট (মাহবুব শাহ বনাম সম্রাট, AIR 1945 PC 118) নজিরে স্পষ্ট করেছেন যে, অভিন্ন উদ্দেশ্য (Same intention) এবং পূর্ব অভিসন্ধি (Common intention) এক নয়; পূর্বপরিকল্পনা ও মানসিক মিলন প্রমাণ ছাড়া ৩৪ ধারা প্রয়োগ করা বেআইনি।
৪.২. দণ্ডবিধির ৩৪ ধারা বনাম ১৪৯ ধারার সংবিধিবদ্ধ তুলনামূলক ছক
দণ্ডবিধির ৩৪ ধারায় অপরাধ সংঘটনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও পূর্ব অভিসন্ধি প্রমাণ আবশ্যক, যেখানে আসামির সংখ্যা হতে পারে ন্যূনতম দুইজন। পক্ষান্তরে ১৪৯ ধারায় বেআইনি সমাবেশের সদস্য সংখ্যা হতে হয় অন্তত ৫ জন এবং সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনে যে কেউ অপরাধ করলেই উক্ত সমাবেশের সকল সদস্য সমান অপরাধে দণ্ডিত হয়।

