রিটেইনারশিপ শেষে প্রতিপক্ষ পরিচালকের পক্ষে মামলা পরিচালনা পেশাগত অসদাচরণ – ২০১১

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১১: প্রশ্ন ১৮ এর পূর্ণাঙ্গ মডেল সমাধান

মূল প্রশ্ন:

১৮. একজন এ্যাডভোকেট একটি কোম্পানীর রিটেইনার হিসাবে কাজ করার সময় ইহার একজন পরিচালক সম্পর্কে কিছু তথ্য অবগত হন। রিটেইনারশিপ শেষ হওয়ার পর তার প্রতিপক্ষ পরিচালকগণের পক্ষে তিনি (এ্যাডভোকেট) একটি মামলা পরিচালনা করেন। ইহা কি পেশাগত অসদাচরণ বলে গণ্য হবে? The Canons of Professional Conduct and Etiquette-এর সংশ্লিষ্ট বিধানাবলী উল্লেখপূর্বক আপনার যুক্তি প্রদর্শন করুন।

১. আইনি বিরোধের স্বরূপ ও পেশাগত নীতি

আইনজীবী ও মক্কেলের সম্পর্ক হলো চরম বিশ্বাসের ও আস্থার সম্পর্ক (Fiduciary Relationship)। একজন আইনজীবী হিসেবে কোনো কোম্পানির রিটেইনার থাকাকালে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালকদের গোপন তথ্য জানার অনন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়। রিটেইনারশিপ শেষ হওয়ার পর সেই তথ্যকে কাজে লাগিয়ে একই কোম্পানির প্রতিপক্ষ অংশের পক্ষে মামলা পরিচালনা করা একটি গুরুতর নৈতিক ও আইনি প্রশ্ন।

২. The Canons of Professional Conduct and Etiquette এর বিধানাবলী

ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্টের অধ্যায় ২, রুল ৩ ও রুল ৫ (Conduct with regard to Clients)-এ এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে:

  1. স্বার্থের সংঘাত ও গোপনীয়তা রক্ষার বাধ্যবাধকতা (Rule 3): একজন আইনজীবীর দায়িত্ব হলো মক্কেলের বিশ্বাস ও গোপনীয়তা আজীবন অক্ষুণ্ন রাখা। মক্কেল সাবেক হয়ে গেলেও তার পূর্বে প্রাপ্ত গোপন তথ্য (Confidential information) তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা পরিচালনায় ব্যবহার করা যায় না।
  2. বিপরীত পক্ষ গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা (Rule 5): কোনো আইনজীবী এমন কোনো পক্ষাবলম্বন করতে পারবেন না যেখানে পূর্বে প্রাপ্ত তথ্যের অপব্যবহারের মাধ্যমে সাবেক মক্কেলের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার সামান্যতম সম্ভাবনা রয়েছে।
  3. সাক্ষ্য আইনের ধারা ১২৬ (Privileged Professional Communications): সাক্ষ্য আইনের ১২৬ ধারা অনুযায়ী আইনজীবী ও মক্কেলের মধ্যে পেশাগত সময়ে আদান-প্রদানকৃত সকল তথ্য সম্পূর্ণ সুরক্ষিত (Privileged) এবং মক্কেলের সুস্পষ্ট সম্মতি ছাড়া তা কোথাও প্রকাশ করা আইনত দণ্ডনীয়।

৩. পেশাগত অসদাচরণ কি না — যুক্তিসহ মূল্যায়ন

হ্যাঁ, এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর পেশাগত অসদাচরণ (Gross Professional Misconduct)।

যুক্তিমালা:

  • বিশ্বাসের অপব্যবহার: অ্যাডভোকেট কোম্পানিটির রিটেইনার থাকাকালে পরিচালক সম্পর্কে যে তথ্যগুলো অবগত হয়েছিলেন, তা সাধারণ পাবলিক ডোমেইনে ছিল না; তা ছিল পেশাগত আস্থার সুবাদে পাওয়া।
  • অসৎ সুবিধা ও পক্ষপাতিত্ব: প্রতিপক্ষ পরিচালকদের পক্ষে মামলা পরিচালনার অর্থ হলো সেই পূর্বের গোপন তথ্য ও দুর্বলতাকে সাবেক মক্কেলের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা, যা আইনের চরম অপব্যবহার।
  • পেশাগত মর্যাদাহানি: যদি আইনজীবীরা ক্লায়েন্ট ছেড়ে যাওয়ার পর প্রতিপক্ষের কাছে তাদের তথ্য বিক্রি বা ব্যবহার শুরু করেন, তবে সমগ্র বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে জনসাধারণের আস্থা বিলুপ্ত হবে।

৪. উচ্চ আদালতের নজির

  • Mary Wheeler vs. New Haven (1975): সাবেক ক্লায়েন্টের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের পক্ষে তখনই লড়াই করা যাবে যদি বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয় এবং কোনো পূর্ববর্তী গোপন তথ্যের সামান্যতম সংস্পর্শও না থাকে। যেখানে তথ্যের অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর অংশগ্রহণ সরাসরি নিষিদ্ধ।
  • Emperor vs. Bapu Narayan (ILR 35 Bom 452): সাবেক মক্কেলের অভ্যন্তরীণ বিষয় অবগত থাকা আইনজীবী প্রতিপক্ষের ওকালতনামা গ্রহণ করলে তা চরম অসদাচরণ এবং আদালত তাকে মামলা থেকে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দিতে পারেন।

৫. উপসংহার

অতএব, উক্ত আইনজীবীর এই পদক্ষেপ The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972 এর আওতায় একটি শাস্তিযোগ্য পেশাগত অসদাচরণ। তার উচিত ছিল উক্ত মামলার ওকালতনামা গ্রহণ না করে পেশাগত সততা রক্ষা করা।

Related Articles

Back to top button