প্রকাশ্য আদালতে আইনজীবীদের ব্যক্তিগত আক্রমণ ও পেশাগত আচরণবিধি লঙ্ঘন | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৩
প্রশ্ন ১২। (খ): প্রকাশ্য আদালতে আইনজীবীদের ব্যক্তিগত আক্রমণ ও পেশাগত আচরণবিধি লঙ্ঘন | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

আইন পেশা কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা চরিতার্থ করার জায়গা নয়। আদালতে মামলা পরিচালনার সময় আইনজীবীরা মক্কেলের আইনসঙ্গত অধিকার তুলে ধরবেন নিরপেক্ষ আইনি যুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু নিজেদের মধ্যে ব্যক্তিগত শত্রুতা সৃষ্টি করা, মেজাজ হারিয়ে প্রকাশ্য আদালতে তর্কাতর্কি করা বা সহকর্মী আইনজীবীকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা বিচারালয়ের পবিত্রতা ও পেশাগত শৃঙ্খলার চরম অবমাননা। অত্র সমস্যাভিত্তিক প্রশ্নে প্রকাশ্য আদালতে নিয়মিত ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বচসায় লিপ্ত দুই আইনজীবী X ও Y-এর আচরণ The Canons of Professional Conduct and Etiquette এর আলোকে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

The Canons of Professional Conduct and Etiquette এর সংশ্লিষ্ট বিধিসমূহ:

  1. Chapter II (Conduct with regard to Clients), Rule 2:

    “Clients, not advocates, are the litigants. Whatever may be the ill-feeling existing between clients, it should not be allowed to influence counsel in their conduct and demeanour towards each other or toward suitors in the case. All personalities between counsel should be scrupulously avoided.”

  2. Chapter IV (Conduct with regard to the Public Generally), Rule 1: সহকর্মী আইনজীবীদের প্রতি সম্মান ও সৌজন্যমূলক আচরণ বজায় রাখা।
  3. The Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972, Article 32: পেশাগত অসদাচরণের শাস্তি।

৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা

উভয় আইনজীবীর আচরণের বস্তুনিষ্ঠ ও কঠোর আইনি মূল্যায়ন

  1. ১. মক্কেলের শত্রুতা আইনজীবীর শত্রুতা নয়:
    • অধ্যায় ২ এর ২ বিধি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে যে—মোকদ্দমায় বাদী ও বিবাদী হলো পক্ষ (Clients are the litigants), আইনজীবীরা পক্ষ নন।
    • মক্কেলদের মধ্যে যতই তিক্ততা বা বিদ্বেষ থাকুক না কেন, তা কোনো অবস্থাতেই আইনজীবীদের নিজেদের মধ্যকার আচরণ বা সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারবে না।
  2. ২. ব্যক্তিগত আক্রমণ সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয় (Personalities Avoided):
    • আইনজীবীরা আদালতে মামলার উপাদান ও আইনের ধারা নিয়ে বিতর্ক করবেন; কিন্তু সহকর্মীর ব্যক্তিগত চরিত্র, শারীরিক অবয়ব বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কোনো মন্তব্য বা আক্রমণ করা পেশাগত আচরণবিধির সরাসরি লঙ্ঘন।
  3. ৩. আচরণবিধি লঙ্ঘনের ফলাফল ও শাস্তি:
    • X ও Y উভয়েই প্রকাশ্য আদালতে তর্কাতর্কি ও অশোভন আচরণ করে আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছেন।
    • তাদের এই কাজ The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972 এর Article 32 অনুযায়ী পেশাগত অসদাচরণ (Professional Misconduct) এর শামিল।
    • বিজ্ঞ আদালত উভয়কে আদালত অবমাননার (Contempt of Court) দায়ে সতর্ক করতে পারেন অথবা বিষয়টি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে প্রেরণ করতে পারেন।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স

১. ঈশ্বরদাস বনাম রাজ্য (AIR 1958 SC 42): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, আইনজীবীদের পেশাদারিত্বের মূল সৌন্দর্য হলো আদালতের ভেতরে নির্লিপ্তভাবে বিতর্ক করা এবং এজলাসের বাইরে সহকর্মীর প্রতি পূর্ণ সম্মান বজায় রাখা।

২. বার কাউন্সিল বনাম অ্যাডভোকেট কামাল (39 DLR 212): এজলাসে বচসা ও অশোভন আচরণের দায়ে আইনজীবীকে তিরস্কার ও জরিমানা করা হয়।

৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত

অতএব আইনজীবী X ও Y উভয়েরই এই ধরনের আচরণ The Canons of Professional Conduct and Etiquette এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং পেশাগত অসদাচরণের শামিল। একজন প্রকৃত আইনজীবীর ভূষণ হলো এজলাসে সংযম, গাম্ভীর্য ও আইনি যুক্তির মাধুর্য বজায় রাখা।

৪.১. প্রকাশ্য আদালতে আইনজীবীদের আচরণ ও সংবিধিবদ্ধ শৃঙ্খলা

বার কাউন্সিল ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট-এর ১ম অধ্যায় (আদালতের প্রতি কর্তব্য) এবং ৩য় অধ্যায় (সহকর্মীদের প্রতি কর্তব্য) অনুযায়ী প্রকাশ্য আদালতে আইনজীবীদের জন্য নিম্নোক্ত আচরণ বাধ্যতামূলক:

  • ব্যক্তিগত আক্রমণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: মামলার বিষয়বস্তু নিয়ে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করা যাবে, কিন্তু প্রতিপক্ষের আইনজীবীর শারীরিক, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নিয়ে কোনো আক্রমণ করা যাবে না;
  • আদালতের মর্যাদা রক্ষা: বিচারকের সাথে তর্কে লিপ্ত হওয়া বা অবমাননাকর শারীরিক অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করা আদালত অবমাননা ও পেশাগত অসদাচরণ;
  • পেশাগত ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা: আদালতের বাইরে আইনজীবীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।

৪.২. অসদাচরণের শাস্তি ও আদালত অবমাননার যুগপৎ বিচারিক ক্ষমতা

যদি কোনো আইনজীবী প্রকাশ্য আদালতে চরম বিশৃঙ্খলা বা ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন, তবে বিজ্ঞ আদালত আদালত অবমাননা আইন (Contempt of Courts Act) অনুযায়ী তাকে সরাসরি শাস্তি দিতে পারেন এবং বার কাউন্সিলে অভিযোগ প্রেরণ করতে পারেন। বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী উক্ত আইনজীবীর সনদ স্থগিত বা বাতিল করার পূর্ণ এখতিয়ার রাখে (রাষ্ট্র বনাম আনিসুল হক, 49 DLR 310)।

৪.৩. বার ও বেঞ্চের পারস্পরিক সম্পর্কের মর্যাদা

বিচার ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিচালনায় বার (আইনজীবী সমাজ) এবং বেঞ্চ (বিজ্ঞ বিচারকমণ্ডলী) একটি রথের দুটি চাকার মতো। আইনজীবীদের পারস্পরিক ব্যক্তিগত আক্রমণ কেবল আদালত কক্ষের শালীনতাই বিনষ্ট করে না, বরং সাধারণ বিচারপ্রার্থী মানুষের দৃষ্টিতে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে। সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ সিনিয়র আইনজীবীদের ঐতিহ্য ও বার কাউন্সিলের নৈতিক অনুশাসন অক্ষুণ্ণ রাখা প্রতিটি তালিকাভুক্ত আইনজীবীর পবিত্র শপথের অংশ।

৪.৪. সিনিয়র ও জুনিয়র আইনজীবীদের পারস্পরিক সম্পর্ক

আইন পেশার সুদীর্ঘ ঐতিহ্য হলো জুনিয়ররা সিনিয়রদের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন এবং সিনিয়ররা জুনিয়রদের পেশাগত মেধার বিকাশে অভিভাবকের মতো স্নেহ ও সহযোগিতা প্রদান করবেন। কোনো ব্যক্তিগত মতবিরোধকে এজলাসে উন্মুক্ত বিতর্কে রূপান্তর করা বারের শতবর্ষী মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে।

আইনি সিদ্ধান্ত: অতএব, আইনজীবীকে অবশ্যই আদালতের পবিত্রতা রক্ষা করে মক্কেলের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষ সহযোগী ও অফিসার অব দ্য কোর্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

উচ্চ আদালতের নজির: (এম এ হাসান বনাম বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল, 46 DLR 190) নজিরে সুপ্রিম কোর্ট পুনর্ব্যক্ত করেন যে, প্রকাশ্য আদালতে আইনজীবীদের সম্মানজনক আচরণ বিচার বিভাগের মূল স্তম্ভ।

Related Articles

Back to top button