সাক্ষীর সংখ্যা নয়, সাক্ষ্যের গুণগত মানই বিচারের ভিত্তি (Sections 114 & 134 Evidence Act) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৩: সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২

প্রশ্ন ৯। (ক): “সাক্ষীর সংখ্যা নয়, সাক্ষ্যের গুণগত মানই বিচারের মাপকাঠি” (Evidence has to be weighed and not counted)—সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১৩৪ ধারার আলোকে উক্তিটি বিস্তারিত আলোচনা করুন। একক সাক্ষীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে কি সাজা দেওয়া যায়? [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও ১৩৪ ধারার মূল বিধান

সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১৩৪ ধারায় একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুদূরপ্রসারী আইনি নীতি সংবিধিবদ্ধ করা হয়েছে:

“কোনো মোকদ্দমায় কোনো ঘটনা প্রমাণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যক সাক্ষীর প্রয়োজন হইবে না (No particular number of witnesses shall in any case be required for the proof of any fact)।”

বিচারিক আদালতে সত্য প্রমাণের জন্য সাক্ষীদের সংখ্যার প্রাচুর্য বা মাথা গণনা কোনো মাপকাঠি নয়। আইনশাস্ত্রের চিরন্তন মূলনীতি হলো—“Evidence has to be weighed and not counted” (সাক্ষ্য ওজন বা পরিমাপ করতে হয়, গণনা করতে হয় না)। দশজন অবিশ্বস্ত, পক্ষপাতদুষ্ট বা মিথ্যাবাদী সাক্ষীর চেয়ে একজন সৎ, নিরপেক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ একক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য আদালতের নিকট বহুগুণ শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য।

২. একক সাক্ষীর ভিত্তিতে সাজা প্রদানের আইনি বৈধতা

ফৌজদারি ও দেওয়ানী উভয় বিচারেই সাক্ষীর সংখ্যা নয় সাক্ষ্যের গুণগত মান বিচার্য। প্রশ্ন হলো—একক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে আসামিকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যায় কি?

  • সরাসরি বৈধতা: উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, যদি একক সাক্ষীর সাক্ষ্য সম্পূর্ণ সত্য, অকাট্য, সুসংগত (Consistent) এবং কোনো প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্বমুক্ত হয়, তবে অন্য কোনো সাক্ষীর সমর্থন (Corroboration) ছাড়াই কেবল সেই একক সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই আদালত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন।
  • সতর্কতামূলক নীতি: তবে একক সাক্ষীর সাক্ষ্যে যদি সামান্যতম সন্দেহ বা অসংগতি থাকে, তবে বিচারক বিচক্ষণতার সাথে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ দ্বারা সমর্থন যাচাই করে নিবেন।

৩. সাক্ষ্য আইনের ১১৪ ধারা (দফা ‘ছ’) ও বৈপরীত্য

সাক্ষ্য আইনের ১১৪ ধারার ‘ছ’ দফায় [Section 114, Illustration (g)] বলা হয়েছে—আদালত ধরে নিতে পারেন যে যে সাক্ষ্য উপস্থাপন করা যেত কিন্তু তা আদালতে আনা হয়নি, তা উপস্থাপন করা হলে উপস্থাপনকারীর বিরুদ্ধেই যেত।

কিন্তু ১৩৪ ধারার সাথে এর কোনো বিরোধ নেই:

  1. প্রসিকিউশনকে সমস্ত সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
  2. গুরুত্বপূর্ণ বা মূল প্রত্যক্ষদর্শীকে যদি রাষ্ট্রপক্ষ অসৎ উদ্দেশ্যে গোপন করে, কেবল তখনই ১১৪(ছ) ধারার প্রতিকূল অনুমান (Adverse Inference) প্রযোজ্য হবে। কিন্তু নিছক সাক্ষীর সংখ্যা বাড়ানোর জন্য অপ্রয়োজনীয় সাক্ষী হাজির না করা দোষের কিছু নয়।

৪. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ

  • আব্দুল লতিফ বনাম রাষ্ট্র (49 DLR (AD) 166): বাংলাদেশ আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেন যে, সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা সংখ্যার ওপর নয়, সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা ও চরিত্রের ওপর নির্ভরশীল। একক প্রত্যক্ষদর্শীর বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যে ফাঁসি দেওয়া আইনসঙ্গত।
  • মকবুল হোসেন বনাম রাষ্ট্র (36 DLR 210): যদি দশজন সাক্ষী ঘটনা না দেখে এবং একজন সচেতন সাক্ষী অকাট্য বর্ণনা দেয়, তবে আদালত সেই একজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন।
  • রাষ্ট্র বনাম নুরুল ইসলাম (51 DLR 140): সাক্ষীর সংখ্যা বাড়িয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করা যায় না; বিচারক সাক্ষ্যের সত্যতার ওজন পরিমাপ করবেন।

৫. উপসংহার

সংক্ষেপে, ১৩৪ ধারা বিচার ব্যবস্থায় সত্যের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে। মামলার ফলাফল সাক্ষীর সংখ্যার ভীড়ে নির্ধারিত হয় না; বরং সত্যনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যের আলোকচ্ছটাই ন্যায়বিচারের রায় নিশ্চিত করে।

৪.১. সাক্ষ্যের মূল্যায়ন বনাম সাক্ষীর গণনা: আইনশাস্ত্রীয় দর্শন

সাক্ষ্য আইনের ১৩৪ ধারার ভিত্তি হলো রোমান আইনশাস্ত্রীয় ধ্রুপদী ম্যাক্সিম: “Testis nemo, sed testimonia ponderanda sunt” — অর্থাৎ “সাক্ষীর সংখ্যা নয়, সাক্ষ্যের অন্তর্নিহিত ওজন বা গুণগত মানই বিবেচনা করতে হবে।” আমাদের ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো:

  • একজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য যদি সম্পূর্ণরূপে সত্যনিষ্ঠ, অকাট্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয়, তবে তার একক সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করেই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া যায়;
  • বিপরীতপক্ষে, শতজন সাক্ষীর বক্তব্যে যদি অসঙ্গতি, পক্ষপাতিত্ব বা বৈপরীত্য থাকে, তবে সেই সংখ্যার আধিক্য আদালতকে প্রভাবিত করতে পারে না;
  • সাক্ষ্য আইনের ১১৪(ছ) ধারার প্রতিকূল অনুমান (Adverse Inference): রাষ্ট্রপক্ষ যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ নিরপেক্ষ প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গোপন করে, তবে আদালত অনুমান করতে পারেন যে উক্ত সাক্ষীর বক্তব্য রাষ্ট্রপক্ষের বিরুদ্ধে যেত।

৪.২. সাক্ষীর গুণগত মান মূল্যায়নে আদালতের ৫টি সোনালী মাপকাঠি

মাপকাঠি আইনি তাৎপর্য বিচারিক বিবেচ্য বিষয়
স্বাভাবিক উপস্থিতি ঘটনাস্থলে স্বাভাবিকভাবে উপস্থিত থাকা (Natural Witness) হঠাৎ আমদানিকৃত বা ভাড়াটে সাক্ষী (Chance Witness) বর্জনীয়
জেরায় অবিচলতা দীর্ঘ জেরাতেও মূল বিবরণে অবিচল থাকা মৌলিক তথ্যে কোনো মারাত্মক অসঙ্গতি বা বৈপরীত্য না থাকা
পারিপার্শ্বিক সমর্থন মেডিকেল ও জব্দতালিকার সাথে মিল জখমের ধরন ও অস্ত্রের বর্ণনার নিখুঁত সামঞ্জস্য

৪.৩. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজিরসমূহ ও পরীক্ষক-বান্ধব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ (আব্দুল মজিদ বনাম রাষ্ট্র, 41 DLR (AD) 210) মামলায় সিদ্ধান্ত দেন যে, “Evidence has to be weighed and not counted” — একক নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা প্রদানে কোনো আইনগত বাধা নেই। তবে যে ক্ষেত্রে সাক্ষী স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা শত্রুভাবাপন্ন, সে ক্ষেত্রে আদালত স্বাধীন সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থন অনুসন্ধান করবেন।

৪.৪. একক চাক্ষুষ সাক্ষীর সাক্ষ্যে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার শর্তাবলী

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় একক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত নিম্নোক্ত ৪টি কঠোর শর্ত নিশ্চিত করেন:

  • সাক্ষীর পরিচয় ও উপস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে হবে এবং আসামির সাথে কোনো পূর্ব শত্রুতা বা বৈরিতা থাকবে না;
  • ঘটনাস্থলের আলো, দৃষ্টিসীমা এবং সাক্ষীর মানসিক ভারসাম্য স্পষ্ট ও নিখুঁত হতে হবে;
  • সাক্ষীর জবানবন্দিতে ঘটনার ধারাবাহিকতা এবং মেডিকেল রিপোর্টে আঘাতের বর্ণনার সাথে শতভাগ সামঞ্জস্য থাকতে হবে;
  • সাক্ষী জেরায় কোনো অবস্থাতেই স্ববিরোধী বা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করবে না। সুপ্রিম কোর্ট (আমির হোসেন বনাম রাষ্ট্র, 52 DLR 140) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, একক সাক্ষীর সাক্ষ্য যদি খাঁটি সোনার মতো নিষ্কলুষ হয়, তবে দ্বিতীয় কোনো সাক্ষীর অনুসন্ধান আইনের উদ্দেশ্য নয়।

Related Articles

Back to top button