আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা, প্রয়োগের ক্ষেত্র ও সীমাবদ্ধতা | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৬

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৬
প্রশ্ন ৩। (ক): আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা কী? কখন এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়? এই ক্ষমতার কী কী সীমাবদ্ধতা আছে? [১০]

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

আইনপ্রণেতাগণ ভবিষ্যৎ সকল বাস্তব পরিস্থিতি বা বিচারিক সংকট আগে থেকে আঁচ করে আইনের প্রতিটি ধারা তৈরি করতে পারেন না। তাই পদ্ধতিগত আইনের শূন্যতার কারণে কোনো বিচারপ্রার্থী যাতে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫১ ধারায় দেওয়ানী আদালতের ‘অন্তর্নিহিত ক্ষমতা’ (Inherent Powers of the Court) সংরক্ষণ করা হয়েছে। অত্র প্রশ্নে এই ক্ষমতার সংজ্ঞা, প্রয়োগক্ষেত্র ও আইনি সীমাবদ্ধতা বিশদ আলোচনার দাবি রাখে।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইনি বিধানাবলী (Statutory Provisions)

  • The Code of Civil Procedure, 1908 (Section 151):
    • “Saving of inherent powers of Court — Nothing in this Code shall be deemed to limit or otherwise affect the inherent power of the Court to make such orders as may be necessary for the ends of justice or to prevent abuse of the process of the Court.”

৩. বিশদ আইনি বিশ্লেষণ ও প্রশ্নের উত্তর

(১) আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা কী?

আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা হলো আদালতের সেই স্বাভাবিক, সহজাত ও বিচারিক ক্ষমতা যা কোনো বিধিবদ্ধ আইন দ্বারা সৃষ্টি করা হয় না, বরং আদালত হিসেবে অস্তিত্বশীল থাকার কারণেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এর মধ্যে নিহিত থাকে। ১৫১ ধারা কোনো নতুন ক্ষমতা দেয় না; বরং পূর্বে বিদ্যমান স্বাভাবিক ক্ষমতাকে সংরক্ষণ (Save) করে।

(২) কখন এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়? (প্রয়োগের ক্ষেত্রসমূহ)

দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫১ ধারা অনুযায়ী কেবল দুটি সুনির্দিষ্ট বিচারিক উদ্দেশ্যে অন্তর্নিহিত ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়:

  1. ন্যায়বিচারের স্বার্থে (For the Ends of Justice): যেখানে কার্যবিধিতে কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই এবং কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান প্রয়োগ না করলে চরম অবিচার ঘটবে, সেখানে আদালত ন্যায়বিচারের স্বার্থে যুক্তিসঙ্গত যে কোনো আদেশ দিতে পারেন। যেমন—ভুল আদেশ প্রত্যাহার করা, ভুলবশত খারিজ হওয়া মামলা পুনরুজ্জীবিত করা, বিচারপ্রার্থীর জবানবন্দি পুনরায় গ্রহণের সুযোগ দেওয়া।
  2. আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহার রোধে (To Prevent Abuse of the Process of the Court): কোনো পক্ষ যদি প্রতারণামূলকভাবে, আদালতের সময় নষ্ট করে বা আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা গ্রহণের চেষ্টা করে, তবে আদালত তা প্রতিহত করতে ১৫১ ধারা প্রয়োগ করতে পারেন। যেমন—একই উদ্দেশ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বারংবার দরখাস্ত দাখিল প্রতিহত করা।

(৩) অন্তর্নিহিত ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাসমূহ (Limitations)

অন্তর্নিহিত ক্ষমতা কোনো স্বেচ্ছাচারী বা লাগামহীন ক্ষমতা নয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী এর সীমাবদ্ধতাসমূহ নিম্নরূপ:

ক্রম সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্র আইনি তাৎপর্য
১ বিধিবদ্ধ স্পষ্ট বিধানের বিপরীতে নয় যেখানে কার্যবিধিতে কোনো বিষয়ে স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট বিধান (Specific provision) রয়েছে, সেখানে ১৫১ ধারা প্রয়োগ করে সেই বিধানকে পাশ কাটানো যাবে না।
২ আইন বনাম ন্যায়পরতা তামাদি আইন বা অন্যান্য মৌলিক আইনের সুনির্দিষ্ট বাধা ১৫১ ধারার অজুহাতে লঙ্ঘন করা যাবে না (Inherent power cannot override substantive law)।
৩ আপিলের বিকল্প নয় যে আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিশন চলে, পক্ষগণ সেই প্রতিকার না নিয়ে ১৫১ ধারার আশ্রয় নিতে পারে না।
৪ স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ নেই এই ক্ষমতা প্রয়োগ হতে হবে বিচারিক যুক্তি ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে (Judicially, not arbitrarily or capriciously)।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স

১. মনোহর লাল বনাম শেঠ হীরালাল (AIR 1962 SC 527): সর্বোচ্চ আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, কার্যবিধির বিধানাবলি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ১৫১ ধারা আদালতকে পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা ভেঙে প্রকৃত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চূড়ান্ত রক্ষাকবচ প্রদান করে।

২. আবদুল মান্নান বনাম মোসলেম উদ্দিন (36 DLR 12): হাইকোর্ট বিভাগ অভিমত দেন যে, যেখানে বিধিবদ্ধ স্পষ্ট প্রতিকার রয়েছে, সেখানে ১৫১ ধারা প্রয়োগ সম্পূর্ণ বেআইনি। অন্তর্নিহিত ক্ষমতা কেবল কার্যবিধির ফাঁক বা শূন্যতা পূরণের জন্য, বিদ্যমান আইন লঙ্ঘনের জন্য নয়।

৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত

সারসংক্ষেপে, দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫১ ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা হলো ন্যায়বিচারের স্বার্থ এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহার রোধে একটি অপরিহার্য পরিপূরক ক্ষমতা, যা বিধিবদ্ধ আইনের বিদ্যমান স্পষ্ট বিধানের পরিপন্থী না হয়ে বিচারিক সতর্কতার সাথে প্রয়োগ করতে হয়।

Related Articles

Back to top button