মক্কেলের দেনমোহরের টাকা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে আত্মসাৎ করায় আইনজীবীর বিরুদ্ধে বার কাউন্সিলে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ মুসাবিদা | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৫

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৫
প্রশ্ন ১৩। (খ): মক্কেলের দেনমোহরের টাকা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে আত্মসাৎ করায় আইনজীবীর বিরুদ্ধে বার কাউন্সিলে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ মুসাবিদা | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৫

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

আইনজীবী ও মক্কেলের সম্পর্ক হলো চরম বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্ক (Fiduciary Relationship)। মক্কেলের কোনো অর্থ বা সম্পত্তি আইনজীবীর হাতে অর্পিত হলে তিনি একজন ট্রাস্টির মর্যাদায় তা সংরক্ষণ করবেন। কোনো অবস্থাতেই মক্কেলের অর্থ নিজের ব্যক্তিগত একাউন্টে রেখে বা নিজের চেম্বার খরচে ব্যবহার করা যাবে না। অত্র সমস্যাভিত্তিক প্রশ্নে অ্যাডভোকেট X পারিবারিক আদালতের ডিক্রিকৃত দেনমোহর ও খোরপোষের ৫,০০,০০০/- টাকা প্রাপ্ত হয়ে তা মক্কেল মিস Y-কে না জানিয়ে নিজের ব্যক্তিগত একাউন্টে জমা রাখেন এবং চেম্বার খরচে ব্যবহার করেন। এটি আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এর প্রতিকারে বার কাউন্সিলে দায়েরের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ অভিযোগের দরখাস্ত মুসাবিদা প্রস্তুত করা হয়েছে।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

The Canons of Professional Conduct and Etiquette এর সংশ্লিষ্ট বিধানাবলী:

  1. Chapter II (Conduct with regard to Clients), Rule 11:

    “Money of the client or other trust property coming into the possession of the advocate should be reported promptly, and except with the client’s knowledge and consent should not be commingled with his private property or be used by him.”

  2. The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972, Article 32: পেশাগত অসদাচরণ (Professional or other misconduct) সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের।
  3. The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Rules, 1972, Rule 43: ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি, কোর্ট ফি ও হলফনামা।

৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা

আইনি বিশ্লেষণ ও অসদাচরণের মাত্রা

  • ১. আচরণবিধি লঙ্ঘন: Canons of Conduct এর অধ্যায় ২ এর ১১ বিধি দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্দেশ করেছে যে মক্কেলের অর্থ পাওয়া মাত্রই মক্কেলকে অবিলম্বে অবহিত করতে হবে (Reported promptly) এবং মক্কেলের সম্মতি ছাড়া তা নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে রাখা বা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • ২. জনাব X-এর সুস্পষ্ট অপরাধ:
    1. তিনি ৫ লক্ষ টাকা পেয়ে এক মাসের বেশি সময় মিস Y-কে কিছুই জানাননি;
    2. টাকাটি মক্কেলের আলাদা কোনো ট্রাস্ট ফান্ডে না রেখে নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে মিশ্রিত (Commingled) করেছেন;
    3. মক্কেলের সম্মতি ব্যতিরেকে চেম্বারের ভাড়া/খরচ মেটাতে উক্ত টাকা খরচ করেছেন।
  • অতএব, জনাব X-এর এই কাজ পেশাগত মারাত্মক অসদাচরণ (Gross Professional Misconduct) এবং বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধের শামিল, যার দায়ে বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল তার ওকালতি সনদ স্থগিত বা বাতিল করতে পারেন।

৪. পূর্ণাঙ্গ খসড়া মুসাবিদা (Legal Drafting)

বরাবর,
সচিব / ডিসিপ্লিনারি কমিটি
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল
বার কাউন্সিল ভবন, ঢাকা।

অভিযোগকারিণী:
মিস Y, পিতা: মোঃ রফিকুল ইসলাম, সাং: বাড়ি নং ৪, ধানমন্ডি, ঢাকা।

বনাম

অভিযুক্ত অ্যাডভোকেট:
জনাব X, অ্যাডভোকেট, পিতা: অজ্ঞাত, চেম্বার: রুম নং ৩০৫, ঢাকা আইনজীবী সমিতি ভবন, ঢাকা। বার কাউন্সিল তালিকাভুক্তি নং: ……………………

The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972 এর Article 32 এবং The Canons of Professional Conduct and Etiquette এর Chapter II, Rule 11 অনুযায়ী পেশাগত মারাত্মক অসদাচরণের বিরুদ্ধে অভিযোগের দরখাস্ত।

বিনীত নিবেদন এই যে—

  1. অভিযোগকারিণী মিস Y বিজ্ঞ ১ম সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালত, ঢাকায় পারিবারিক মোকদ্দমা নং ৪৫/২০২৩ (দেনমোহর ও খোরপোষের দাবি) দায়ের করেন। উক্ত মামলায় অভিযোগকারিণী অভিযুক্ত জনাব X, অ্যাডভোকেট-কে উপযুক্ত ফিস প্রদানপূর্বক নিযুক্ত করেন।
  2. উক্ত পারিবারিক মোকদ্দমায় বিজ্ঞ আদালত বিগত ১৫/০১/২০২৫ তারিখে অভিযোগকারিণীর অনুকূলে দেনমোহর ও খোরপোষ বাবদ সর্বমোট ৫,০০,০০০/- (পাঁচ লক্ষ) টাকা বাদী মিস Y বরাবর প্রদান করার জন্য বিবাদী পক্ষকে নির্দেশ দিয়ে ডিক্রি প্রদান করেন।
  3. বিবাদী পক্ষ উক্ত ডিক্রিকৃত নগদ ৫,০০,০০০/- (পাঁচ লক্ষ) টাকা বিজ্ঞ আদালতের নথির মাধ্যমে বিগত ১০/০২/২০২৫ তারিখে অভিযুক্ত আইনজীবী জনাব X-এর নিকট হস্তান্তর করেন।
  4. অভিযুক্ত আইনজীবী উক্ত ৫ লক্ষ টাকা প্রাপ্ত হওয়ার বিষয়টি এক মাসেরও অধিক সময় ধরে অভিযোগকারিণীকে সম্পূর্ণ গোপন রাখেন এবং টাকাটি অবিলম্বে হস্তান্তর না করে নিজের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখেন।
  5. পরবর্তীতে অভিযোগকারিণী বিষয়টি আদালত সূত্রে অবগত হয়ে বিগত ২০/০৩/২০২৫ তারিখে অভিযুক্ত আইনজীবীর চেম্বারে গিয়ে টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন যে, তার চেম্বারের বকেয়া খরচ মেটাতে উক্ত টাকার একটি বড় অংশ তিনি খরচ করে ফেলেছেন।
  6. The Canons of Professional Conduct and Etiquette এর Chapter II, Rule 11 অনুযায়ী মক্কেলের অর্থ পাওয়া মাত্র অবিলম্বে মক্কেলকে অবহিত করা বাধ্যতামূলক এবং মক্কেলের পূর্বানুমতি ছাড়া তা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও পেশাগত মারাত্মক অসদাচরণের শামিল। অভিযুক্ত আইনজীবী একজন ট্রাস্টি হিসেবে মক্কেলের অর্থ আত্মসাৎ করে আইনজীবী সমাজের সুনাম চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছেন।

প্রার্থনা:
অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে, মাননীয় বার কাউন্সিল অনুগ্রহপূর্বক অত্র অভিযোগটি গ্রহণ করতঃ বিষয়টি তদন্তের জন্য বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালে প্রেরণপূর্বক অভিযুক্ত আইনজীবী জনাব X-এর বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তার ওকালতি সনদ চিরতরে বাতিল/স্থগিত করার এবং অভিযোগকারিণীর আত্মসাৎকৃত ৫,০০,০০০/- (পাঁচ লক্ষ) টাকা অবিলম্বে ক্ষতিপূরণসহ আদায়ের নির্দেশ প্রদানে মর্জি হয়।

সত্যপাঠ (Verification):
আমি মিস Y, শপথপূর্বক ঘোষণা করছি যে অত্র অভিযোগ দরখাস্তের ১ থেকে ৬ নং অনুচ্ছেদের সকল বিবরণ আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সত্য। এতে কোনো মিথ্যা তথ্য সন্নিবেশিত করা হয়নি। অদ্য ১৫ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে আমি সুস্থ শরীরে ঢাকায় নিজ স্বাক্ষরে এটি সম্পাদন করলাম।

মিস Y
অভিযোগকারিণী

৫. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স

১. হরিপ্রসাদ বনাম বার কাউন্সিল অব মহারাষ্ট্র (AIR 1982 SC 1198): সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, মক্কেলের টাকা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করা পেশাগত অসদাচরণের সর্বোচ্চ মাত্রা এবং এর জন্য আইনজীবীর নাম ওকালতি রোল থেকে চিরতরে কর্তনযোগ্য।

২. বার কাউন্সিল বনাম অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম (42 DLR 311): মক্কেলের ক্ষতিপূরণের টাকা আটকে রেখে বিলম্ব করার দায়ে আইনজীবীর সনদ ১ বছরের জন্য স্থগিত করা হয়।

৬. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত

জনাব X-এর কাজটি Canons of Professional Conduct and Etiquette এর Chapter II, Rule 11 এর নগ্ন লঙ্ঘন। মিস Y-এর পক্ষে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সচিব বরাবরে নিম্নোক্ত পূর্ণাঙ্গ নালিশী দরখাস্ত দাখিল করে অভিযুক্তের সনদ বাতিলের আবেদন করা আইনসম্মত।

Related Articles

Back to top button