প্লীডিংস সংশোধন নিয়ামক শর্তাবলী ও রায় ঘোষণার পর সংশোধনের বিধান – বার কাউন্সিল ২০১৫

🏛️ বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার বিগত সালের প্রশ্নব্যাংক (২০১১–২০২৫):
বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তি লিখিত পরীক্ষা ২০১৫ — গ্রুপ ‘ক’ (দেওয়ানী কার্যবিধি)

প্লীডিংস সংশোধন (Order VI, Rule 17 CPC): নিয়ামক শর্তাবলী এবং বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণার পর কি সংশোধন করা যায়?

১. মূল প্রশ্ন (Examination Question)

১। প্লীডিংস সংশোধন বলতে আপনি কি বুঝেন? প্লীডিংস সংশোধনের ক্ষেত্রে নিয়ামক শর্তাবলী কি কি? বিচারিক আদালত কর্তৃক রায় ঘোষণার পর কি প্লীডিংস সংশোধন করা যায়? [পূর্ণমান: ১৫]

২. প্লীডিংস সংশোধনের সংজ্ঞা ও আইনি তাৎপর্য (Concept of Amendment of Pleadings)

দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮ (CPC)-এর আদেশ ৬, নিয়ম ১৭ (Order VI, Rule 17)-এ প্লীডিংস সংশোধনের সংবিধিবদ্ধ বিধান বর্ণিত হয়েছে। বিধিতে বলা হয়েছে:

“The Court may at any stage of the proceedings allow either party to alter or amend his pleadings in such manner and on such terms as may be just, and all such amendments shall be made as may be necessary for the purpose of determining the real questions in controversy between the parties.”

আইনগত সংজ্ঞা: কোনো দেওয়ানী মোকদ্দমার বিচার চলাকালে কোনো পক্ষ কর্তৃক পূর্বে দাখিলকৃত আরজি (Plaint) বা লিখিত বিবৃতিতে (Written Statement) কোনো তথ্য সংযোজন, বর্জন, করণিক বা বর্ণনামূলক ভুল সংশোধন করার জন্য আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে যে আইনগত পরিবর্তন আনা হয়, তাকে প্লীডিংস সংশোধন (Amendment of Pleadings) বলে।

মূল উদ্দেশ্য: বিচার ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, কোনো প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে সত্যকে চাপা দেওয়া নয়। পক্ষগণের মধ্যকার প্রকৃত বিরোধীয় বিষয় (Real question in controversy) নির্ধারণের জন্য আদালত এই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।

৩. প্লীডিংস সংশোধনের ক্ষেত্রে নিয়ামক শর্তাবলী (Governing Principles & Conditions)

উচ্চ আদালতের বহুবিধ নজির ও আদেশ ৬ নিয়ম ১৭ পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্লীডিংস সংশোধনের প্রধান নিয়ামক শর্তাবলী নিম্নরূপ:

  1. মোকদ্দমার চরিত্র বা মৌলিক প্রকৃতি পরিবর্তন নিষিদ্ধ (Must not alter the fundamental character):
    এমন কোনো সংশোধনী মঞ্জুর করা যাবে না যার ফলে মূল মোকদ্দমার মৌলিক রূপ বা চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রকৃতির মামলায় (Totally new cause of action) পরিণত হয়। যেমন—স্বত্ব ঘোষণার মামলাকে রাতারাতি বণ্টন বা মানি স্যুটে রূপান্তর করা যাবে না।
  2. অপর পক্ষের অপূরণীয় ক্ষতি বা প্রতিষ্ঠিত অধিকার হরণ না করা (No injury which cannot be compensated by costs):
    যদি সংশোধনীর ফলে অপর পক্ষের এমন কোনো অপূরণীয় ক্ষতি হয় যা অর্থদণ্ড বা খরচ (Costs) দ্বারা পূরণ করা সম্ভব নয়, তবে তা নামঞ্জুর হবে। পক্ষান্তরে অপর পক্ষের অসুবিধা যদি সামান্য খরচের মাধ্যমেই সমাধানযোগ্য হয়, তবে আদালত সাধারণত সংশোধনী মঞ্জুর করবেন।
  3. তামাদিতে বারিত অধিকার সৃষ্টি নিষিদ্ধ:
    বিবাদী যদি তামাদির কারণে কোনো আইনগত প্রতিরক্ষা (Vested right) অর্জন করে থাকে, তবে প্লীডিংস সংশোধনের মাধ্যমে এমন কোনো নতুন দাবি যোগ করা যাবে না যা ইতিমধ্যে তামাদিতে তামাদিপ্রাপ্ত হয়ে গেছে।
  4. অসৎ উদ্দেশ্য বা অযথা বিলম্ব না হওয়া (Bona fide and not dilatory tactics):
    আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে হবে যে আবেদনটি সরল বিশ্বাসে (Bona fide) করা হয়েছে এবং এটি মামলার বিচার বিলম্বিত করার কোনো কূটকৌশল নয়।
  5. যেকোনো পর্যায়ে আবেদন (At any stage of proceedings):
    মোকদ্দমার যেকোনো পর্যায়ে—বিচার শুরুর পূর্বে, বিচার চলাকালে, এমনকি আপিল বা রিভিশন আদালতে আপিল নিষ্পত্তির পূর্বেও যুক্তিসঙ্গত কারণে প্লীডিংস সংশোধনের আবেদন করা যায়।

৪. বিচারিক আদালত কর্তৃক রায় ঘোষণার পর কি প্লীডিংস সংশোধন করা যায়?

আইনগত সিদ্ধান্ত: সাধারণ নিয়মে—না, বিচারিক আদালত (Trial Court) কর্তৃক রায় ঘোষণার পর উক্ত আদালতে প্লীডিংস সংশোধন করা যায় না। তবে আপিল বা রিভিশন আদালতে এবং কিছু বিশেষ ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে রায় ঘোষণার পরেও সংশোধনী মঞ্জুর হতে পারে।

আইনশাস্ত্রীয় কারণ ও সীমাবদ্ধতা:

  • ‘Functus Officio’ নীতি: বিচারিক আদালত যখন একটি মোকদ্দমার চূড়ান্ত রায় ও ডিক্রী ঘোষণা করে দেন, তখন সেই আদালতের বিচারিক কর্তৃত্ব শেষ হয়ে যায় (The Trial Court becomes Functus Officio)। রায় ঘোষণার পর বিচারক নিজে আর তার পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত পুনর্লিখন বা প্লীডিংস সংশোধনের আদেশ দিতে পারেন না (ব্যতিক্রম: ধারা ১৫২ অনুযায়ী করণিক বা গাণিতিক ভুল সংশোধন)।
  • আপিল বা রিভিশন আদালতে সংশোধনের সুযোগ: দেওয়ানী কার্যবিধির ১০৭(২) ধারা অনুযায়ী আপিল আদালতের নিকট মূল বিচারিক আদালতের সকল ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে। রায় ঘোষণার পর সংক্ষুব্ধ পক্ষ যখন উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিশন দায়ের করে, তখন আপিল বা রিভিশন আদালতের নিকট আদেশ ৬ নিয়ম ১৭ মতে প্লীডিংস সংশোধনের আবেদন দাখিল করা সম্পূর্ণ আইনসম্মত। আপিল আদালত যদি দেখেন যে ন্যায়বিচারের স্বার্থে সংশোধনী অপরিহার্য, তবে তিনি তা মঞ্জুর করে মামলাটি পুনঃবিচারের জন্য নিম্ন আদালতে রিমান্ডে (Remand) পাঠাতে পারেন।

৫. উচ্চ আদালতের নজির (Judicial Precedents)

১. 46 DLR (AD) 166 (Aftabuddin v. Serajuddin): আপিল বিভাগ রায় দেন যে, প্লীডিংস সংশোধন মঞ্জুরের ক্ষেত্রে আদালত উদার মনোভাব প্রদর্শন করবেন যদি না তা অপর পক্ষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে বা মামলার মূল চরিত্র পরিবর্তন করে।

২. 52 DLR 121: আদালত অভিমত দেন যে, বিচারিক আদালত রায় ঘোষণার পর ফানক্টাস অফিসিও হয়ে যায়; তবে আপিল চলাকালীন সময়ে আপিল আদালত উপযুক্ত মনে করলে প্লীডিংস সংশোধনের আদেশ দিতে পারেন।

৬. উপসংহার

প্লীডিংস সংশোধন দেওয়ানী বিচার ব্যবস্থার এক অমূল্য রক্ষাকবচ যা সত্য নির্ধারণকে যান্ত্রিক আইনি ফাঁদ থেকে মুক্তি দেয়। তবে রায় ঘোষণার পর মূল বিচারিক আদালতে এই সুযোগ স্তব্ধ হয়ে গেলেও, আপিল আদালতে সুবিচারের স্বার্থে এই পথ উন্মুক্ত থাকে।

🏛️ বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার বিগত সালের প্রশ্নব্যাংক (২০১১–২০২৫):

Related Articles

Back to top button