প্লিডিংস কি? আরজি ও লিখিত বিবৃতির আবশ্যকীয় উপাদানসমূহ | বার কাউন্সিল লিখিত ২০১২

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১২: দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮

প্রশ্ন: ১ প্লিডিংস (Pleadings) বলিতে কি বুঝায়? প্লিডিংসের মৌলিক নীতিসমূহ কি কি? একটি দেওয়ানি আরজি (Plaint) এবং লিখিত বিবৃতির (Written Statement) আবশ্যকীয় উপাদানসমূহ আলোচনা করুন। প্লিডিংস সংশোধনের (Amendment of Pleadings – Order VI Rule 17) আইনি শর্তাবলী সুপ্রিম কোর্টের নজিরসহ বিস্তারিত আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও প্লিডিংসের সংজ্ঞা

দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ (The Code of Civil Procedure, 1908)-এর আদেশ ৬ নিয়ম ১ (Order VI Rule 1) মোতাবেক প্লিডিংসের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে—“Pleading shall mean a plaint or written statement.” অর্থাৎ দেওয়ানি মোকদ্দমায় বাদীর আরজি (Plaint) এবং বিবাদীর দাখিলকৃত লিখিত বক্তব্য বা জবাব (Written Statement)-কে সামগ্রিকভাবে ‘প্লিডিংস’ বলা হয়। প্লিডিংস হলো দেওয়ানি মামলার মূল ভিত্তিপ্রস্তর বা কঙ্কাল। আদালতের বিচারিক সীমানা নির্ধারণ করা এবং উভয় পক্ষ যেন অপরের দাবি ও আপত্তি সম্পর্কে পূর্বেই স্পষ্ট ধারণা পায়, তা নিশ্চিত করাই প্লিডিংসের মূল উদ্দেশ্য।

২. প্লিডিংসের ৪টি মৌলিক স্তম্ভ বা সুবর্ণ নীতি (Order VI Rule 2)

দেওয়ানি কার্যবিধির ৬ আদেশের ২ নিয়মে প্লিডিংস রচনার ৪টি মৌলিক সোনালী নীতি বিধিবদ্ধ করা হয়েছে:

  1. আইন নয়, কেবল বস্তুগত ঘটনা উল্লেখ করতে হবে (Plead facts, not law): পক্ষগণ কেবল ঘটনার বর্ণনা দেবেন, আইনের ধারা বা আইনি যুক্তি উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। কারণ আইন প্রয়োগের দায়িত্ব বিজ্ঞ আদালতের (“Jura novit curia” — আদালত আইন জানেন)।
  2. কেবল বস্তুগত ঘটনাই বর্ণনা করতে হবে (Material facts only): যে সকল ঘটনা দাবিকৃত অধিকার বা প্রতিরক্ষার জন্য সরাসরি অপরিহার্য (Material Facts), কেবল সেগুলোরই বর্ণনা থাকতে হবে; কোনো অপ্রয়োজনীয় বা গৌণ তথ্যের স্থান প্লিডিংসে নেই।
  3. সাক্ষ্য নয়, কেবল তথ্য থাকবে (Facts, not evidence): যে ঘটনা দ্বারা কোনো দাবি প্রমাণিত হবে সেই ঘটনা লিখতে হবে, কিন্তু কীভাবে তা প্রমাণ করা হবে (সাক্ষীর নাম বা দালিলিক সাক্ষ্যের বিশদ বিবরণ) তা আরজি বা জবাবে লেখার প্রয়োজন নেই।
  4. সংক্ষিপ্ত ও সুস্পষ্ট ভাষায় অনুচ্ছেদ আকারে প্রকাশ (Concise and numbered paragraphs): বক্তব্য যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট এবং ধারাবাহিক সংখ্যাযুক্ত অনুচ্ছেদে তারিখ, সংখ্যা ও পরিমাণ অঙ্কে এবং কথায় লিখতে হবে।

৩. একটি দেওয়ানি আরজির আবশ্যকীয় উপাদানসমূহ (Order VII Rule 1)

দেওয়ানি কার্যবিধির ৭ আদেশের ১ নিয়ম অনুযায়ী একটি বৈধ আরজিতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে থাকতে হয়:

  • আদালতের আনুষ্ঠানিক নাম ও মোকদ্দমার শিরোনাম;
  • বাদীর পূর্ণ নাম, পিতা/স্বামীর নাম, পেশা এবং সঠিক ঠিকানা;
  • বিবাদীর পূর্ণ নাম, পিতার নাম এবং সমন জারির উপযোগী পূর্ণ ঠিকানা;
  • বাদী বা বিবাদী নাবালক বা অপ্রকৃতিস্থ হলে তার আইনি প্রতিনিধিত্বের বিবরণ;
  • মোকদ্দমার কারণ এবং তা উদ্ভবের তারিখ ও স্থান (Cause of Action – date and place);
  • বিজ্ঞ আদালতের আর্থিক ও আঞ্চলিক এখতিয়ারের বিবরণ (Jurisdiction);
  • মোকদ্দমার দাবিকৃত মূল্যমান এবং প্রদত্ত কোর্ট ফির বিবরণ (Valuation & Court Fees);
  • বাদীর সুনির্দিষ্ট প্রার্থনাসমূহ (Prayer clause);
  • সত্যপাঠ ও স্বাক্ষর (Verification under Order VI Rule 15)।

৪. লিখিত বিবৃতির আবশ্যকীয় উপাদানসমূহ (Order VIII Rules 1–6)

বিবাদী কর্তৃক দাখিলকৃত লিখিত বক্তব্যে নিম্নোক্ত আইনি উপাদানসমূহ থাকতে হয়:

  • সুনির্দিষ্ট অস্বীকৃতি (Specific Denial – Rule 3): আরজির প্রতিটি অনুচ্ছেদের অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে খণ্ডন বা অস্বীকার করতে হবে। কোনো অভিযোগ এড়িয়ে গেলে বা কেবল ঢালাওভাবে অস্বীকার করলে তা আদালতে স্বীকার (Admitted) বলে গণ্য হতে পারে (Doctrine of Non-traverse)।
  • নতুন প্রতিরক্ষা বা আইনি আপত্তি (New facts – Rule 2): মামলাটি তামাদিতে বারিত, রেস জুডিকাটায় বারিত, অথবা চুক্তিটি অবৈধ—এ জাতীয় কোনো বিশেষ আইনি আপত্তি থাকলে তা স্পষ্টভাবে তুলতে হবে।
  • সেট-অফ ও পাল্টা দাবি (Set-off & Counter-claim – Rules 6 & 6A): বিবাদী বাদীর নিকট আইনসঙ্গত কোনো অর্থ পাওনা থাকলে তা সমন্বয়ের দাবি করতে পারে।

৫. প্লিডিংস সংশোধনের আইনি বিধান ও সীমাবদ্ধতা (Order VI Rule 17 CPC)

দেওয়ানি কার্যবিধির ৬ আদেশের ১৭ নিয়ম অনুযায়ী বিজ্ঞ আদালত মোকদ্দমার যে কোনো পর্যায়ে ন্যায়বিচারের স্বার্থে উভয় পক্ষের প্লিডিংস সংশোধনের অনুমতি দিতে পারেন:

  1. বিচারিক ট্রায়াল শুরুর পূর্বে: যদি সংশোধনের ফলে মূল মামলার চরিত্র বা ধরন (Nature and Character of the Suit) সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত না হয় এবং অপর পক্ষের ওপর অপূরণীয় অবিচার না ঘটে, তবে আদালত উদারভাবে সংশোধনের অনুমতি দেন।
  2. ট্রায়াল শুরুর পরবর্তী কঠোর শর্ত (Proviso to Rule 17): ট্রায়াল বা বিচারকার্য (সাক্ষ্য গ্রহণ) শুরু হওয়ার পর আদালত কোনো অবস্থাতেই সংশোধনের অনুমতি দেবেন না, যতক্ষণ না পক্ষ প্রমাণ করতে পারে যে যথেষ্ট সতর্কতা (Due Diligence) সত্ত্বেও বিষয়টি পূর্বে উত্থাপন করা সম্ভব ছিল না।

৬. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)

  • আব্দুল লতিফ বনাম মোসা: নূরজাহান (48 DLR (AD) 144): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, প্লিডিংসের বাইরে কোনো সাক্ষ্য আদালত গ্রহণ করবেন না (No evidence can be looked into upon a plea never put forward in pleadings)।
  • কাজী সিরাজুল হক বনাম মো: সোলায়মান (32 DLR 210): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, প্লিডিংস সংশোধনের মাধ্যমে যদি তামাদিতে বারিত কোনো নতুন অধিকার অনুপ্রবেশ করানোর অপচেষ্টা করা হয়, তবে আদালত উক্ত সংশোধনের আবেদন সরাসরি নাকচ করবেন।

৭. উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, প্লিডিংস কি এবং আরজি ও লিখিত বিবৃতির আবশ্যকীয় উপাদানসমূহ দেওয়ানি বিচারের ভিত্তিপ্রস্তর। নিখুঁত ও আইনসঙ্গত প্লিডিংস একদিকে যেমন আদালতের সময় সাশ্রয় করে, তেমনি ন্যায়বিচারের পথকে উন্মুক্ত ও বিতর্কাতীত রাখে।

৫.১. প্লিডিংসের অসম্পূর্ণতা ও আরজি প্রত্যাখ্যান (Order VII Rule 11 CPC)

যদি প্লিডিংস যথাযথভাবে প্রস্তুত করা না হয়, তবে মোকদ্দমার শুরুতেই আরজি প্রত্যাখ্যানের মারাত্মক ঝুঁকি থাকে। দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৭ নিয়ম ১১ অনুযায়ী নিম্নোক্ত ৪টি কারণে আদালত আরজি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন:

  1. আরজিতে মোকদ্দমার কারণ (Cause of Action) সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ না পেলে;
  2. দাবিকৃত প্রতিকারের মূল্যায়ন কম দেখানো হলে এবং আদালতের নির্দেশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা সংশোধন না করলে;
  3. আরজিতে পর্যাপ্ত কোর্ট ফি দাখিল না করলে এবং সময় দেওয়া সত্ত্বেও কোর্ট ফি প্রদানে ব্যর্থ হলে;
  4. আরজির কোনো বক্তব্য দ্বারা মামলাটি কোনো সংবিধিবদ্ধ আইন দ্বারা সরাসরি বারিত (Barred by any law) বলে প্রতীয়মান হলে (যেমন তামাদিতে বারিত বা নোটিশ ছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে মামলা)।

৫.২. দেওয়ানি আরজির পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক মুসাবিদা (Plaint Draft)

বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ ১ম আদালত, ঢাকা

দেওয়ানি মোকদ্দমা নং ……… / ২০২৪

বাদী: মো: আব্দুল জলিল, পিতা- মৃত কাশেম আলী, সাং- ধানমন্ডি, ঢাকা।
— বনাম —
বিবাদী: মো: রফিকুল ইসলাম, পিতা- জমির উদ্দিন, সাং- মিরপুর, ঢাকা।

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা মতে স্বত্ব ঘোষণার আরজি

বাদী পক্ষ বিজ্ঞ আদালত সমীপে বিনীত নিবেদন করিতেছে যে—

  1. বাদী নিম্ন তপশিল বর্ণিত সম্পত্তির খরিদা সূত্রে ও নামজারি সূত্রে একমাত্র নিরঙ্কুশ মালিক ও শান্তিপূর্ণ বাস্তব দখলে বসবাস করিয়া আসিতেছেন।
  2. বিবাদী উক্ত সম্পত্তিতে কোনো প্রকার স্বত্ব বা অধিকার না থাকা সত্ত্বেও গত ১৫/০১/২০২৪ তারিখে বাদীর স্বত্ব অস্বীকার করিয়া ভুয়া দাবি উত্থাপন করিয়াছে।
  3. উক্ত অস্বীকারের কারণে বাদীর স্বত্বের ওপর কালো মেঘের ছায়া সৃষ্টি হওয়ায় বাদী অত্র ঘোষণার মোকদ্দমা দায়ের করিলেন।

প্রার্থনা: অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে, নিম্ন তপশিল জমিতে বাদীর ১৬ আনা স্বত্ব সাব্যস্তের ঘোষণা ডিক্রি দান করিতে বিজ্ঞ আদালতের মর্জি হয়।

Related Articles

Back to top button