মারাত্মক জখম অপরাধে সহায়তা বেআইনী জনতা জালিয়াতি ও অনিষ্ট সাধনের ব্যাখ্যা – ২০১৪

🏛️ বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার বিগত সালের প্রশ্নব্যাংক (২০১১–২০২৫):
বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তি লিখিত পরীক্ষা ২০১৪ — গ্রুপ ‘ঘ’ (দণ্ডবিধি)

দণ্ডবিধির মৌলিক অপরাধসমূহের বিশদ ব্যাখ্যা ও উদাহরণ: মারাত্মক জখম, সহায়তা, বেআইনি জনতা, জালিয়াতি ও অনিষ্ট সাধন

১. মূল প্রশ্ন (Examination Question)

৮. উদাহরণসহ যেকোন ৪টি ব্যাখ্যা করুন: [পূর্ণমান: ১৬] ক) মারাত্মক জখম (Grievous Hurt)
খ) অপরাধ সংঘটনে সহযোগীতা (Abetment)
গ) বেআইনী জনতা (Unlawful Assembly)
ঘ) জালিয়াতি (Forgery)
ঙ) অনিষ্ট সাধন (Mischief)

২. (ক) মারাত্মক জখম (Grievous Hurt – Section 320, Penal Code)

দণ্ডবিধির ৩১৯ ধারায় আঘাতের (Hurt) সংজ্ঞা দেওয়ার পর ৩২০ ধারায় আঘাতের চরম রূপ হিসেবে ৮ শ্রেণীর আঘাতকে সংবিধিবদ্ধভাবে ‘মারাত্মক জখম’ বা Grievous Hurt হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই তালিকাটি সীমাবদ্ধ (Exhaustive):

  1. পুরুষত্বহীনকরণ (Emasculation): কোনো পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা বা পুরুষত্ব স্থায়ীভাবে নষ্ট করা।
  2. দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে বিনষ্টকরণ: যেকোনো একটি বা উভয় চোখের দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট করা।
  3. শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে বিনষ্টকরণ: যেকোনো একটি বা উভয় কানের শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট করা।
  4. যেকোনো অঙ্গ বা সন্ধির বিনাশ: শরীরের কোনো অঙ্গ বা জোড়া বিচ্ছিন্ন করা বা নষ্ট করা।
  5. অঙ্গ বা জোড়ার কর্মক্ষমতা স্থায়ীভাবে বিনষ্টকরণ: কোনো অঙ্গ বা গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা স্থায়ীভাবে হ্রাস বা ধ্বংস করা।
  6. মাথা বা চেহারার স্থায়ী বিকৃতি: মুখমণ্ডল বা মাথার স্থায়ী রূপহানি করা (যেমন- এসিড নিক্ষেপ বা কুঠার দিয়ে চেহারা কেটে ফেলা)।
  7. হাড় বা দাঁত ভাঙা বা স্থানচ্যুত করা (Fracture or dislocation of a bone or tooth): যেকোনো হাড় বা দাঁত ভেঙে ফেলা বা নিজ স্থান থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
  8. জীবন বিপন্নকারী বা ২০ দিনের নিদারুণ শারীরিক কষ্ট: এমন আঘাত যার ফলে আহত ব্যক্তির জীবন বিপন্ন হয় অথবা সে একটানা ২০ দিন বা ততোধিক সময় নিদারুণ শারীরিক যন্ত্রণায় ভোগে বা তার স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পাদনে অক্ষম থাকে।

উদাহরণ ও শাস্তি: ‘ক’ একটি লোহার রড দিয়ে ‘খ’-এর বাম হাতে প্রচণ্ড আঘাত করে তার হাতের হাড় ভেঙে ফেলল। এটি ৩২০ ধারার ৭ম দফা অনুযায়ী মারাত্মক জখম। স্বেচ্ছায় মারাত্মক জখম ঘটানোর শাস্তি ধারা ৩২৫ মতে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড; মারাত্মক অস্ত্র দ্বারা ঘটালে ধারা ৩২৬ মতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।

৩. (খ) অপরাধ সংঘটনে সহায়তা বা প্ররোচনা (Abetment – Section 107, Penal Code)

দণ্ডবিধির ১০৭ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি ৩টি উপায়ের যেকোনো একটির মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনে সহায়তা (Abetment) করতে পারে:

  1. প্ররোচিত করার মাধ্যমে (Instigation): সক্রিয়ভাবে কাউকে কোনো অপরাধমূলক কাজ করার জন্য প্ররোচিত, প্রলুব্ধ বা উৎসাহিত করা।
  2. ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে (Conspiracy): অপরাধমূলক কাজ সম্পাদনের উদ্দেশ্যে এক বা একাধিক ব্যক্তির সাথে ষড়যন্ত্রে যুক্ত হওয়া এবং সেই ষড়যন্ত্রের অনুসরণে কোনো কাজ সংঘটিত হওয়া।
  3. ইচ্ছাকৃত সহযোগিতার মাধ্যমে (Intentional Aiding): কোনো কাজ করে বা অবৈধভাবে কাজ থেকে বিরত থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ সংঘটনের পথ সুগম করা (যেমন- হত্যাকারীকে গোপনে বিষ সরবরাহ করা বা ডাকাতির সুবিধার্থে বাড়ির দারোয়ান কর্তৃক ফটক খোলা রাখা)।

উদাহরণ ও শাস্তি: ‘ক’ প্রকাশ্যে ‘খ’-কে চিৎকার করে বলল— “ঐ পুলিশ অফিসারকে গুলি করে মেরে ফেল!” এবং সেই প্ররোচনায় ‘খ’ পুলিশ অফিসারকে গুলি করল। এখানে ‘ক’ ১০৭ ও ১০৯ ধারা অনুযায়ী খুনে প্ররোচনার দায়ে মূল অপরাধীর সমান শাস্তির যোগ্য হবে।

৪. (গ) বেআইনী জনতা (Unlawful Assembly – Section 141, Penal Code)

দণ্ডবিধির ১৪১ ধারা অনুযায়ী কমপক্ষে ৫ বা ততোধিক ব্যক্তির সমাবেশ বেআইনি জনতা হিসেবে গণ্য হবে, যদি উক্ত সমাবেশের অভিন্ন উদ্দেশ্য নিম্নোক্ত ৫টি বিষয়ের যেকোনো একটি হয়:

  1. সরকার, সংসদ বা সরকারি কর্মচারীকে তার আইনসম্মত ক্ষমতা প্রয়োগে বলপ্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন করা।
  2. আইন বা আইনসঙ্গত বিচারিক প্রক্রিয়া কার্যকরকরণে বাধা দেওয়া।
  3. কোনো অনিষ্ট সাধন (Mischief), অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশ (Criminal Trespass) বা অন্য কোনো অপরাধ সংঘটন করা।
  4. অপরাধমূলক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির সম্পত্তির দখল গ্রহণ বা কোনো পথ, পানি বা ইজমেন্টের অধিকার ভোগে বাধা দেওয়া।
  5. কাউকে এমন কোনো কাজ করতে বাধ্য করা যা করতে সে আইনত বাধ্য নয়, অথবা কোনো কাজ করা থেকে বিরত রাখা যা করার আইনগত অধিকার তার রয়েছে।

শাস্তি: ধারা ১৪৩ মতে বেআইনি জনতার সদস্য হওয়ার শাস্তি ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড; মারাত্মক অস্ত্রসজ্জিত হয়ে যোগ দিলে ধারা ১৪৪ মতে ২ বছর কারাদণ্ড।

৫. (ঘ) জালিয়াতি (Forgery – Section 463 & 464, Penal Code)

সংজ্ঞা (ধারা ৪৬৩): জনসাধারণ বা কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধন বা দাবি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে, অথবা প্রতারণা করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা দলিল তৈরি করাকে জালিয়াতি বলে।

মিথ্যা দলিল তৈরির ৩টি উপায় (ধারা ৪৬৪):

  • অসাধু বা প্রতারণামূলকভাবে কোনো দলিলে স্বাক্ষর, সিল বা সম্পাদন করা এমন ব্যক্তিকে বিশ্বাস করানোর জন্য যে তা অন্য কোনো ব্যক্তির কর্তৃত্বে স্বাক্ষরিত হয়েছে।
  • বৈধভাবে স্বাক্ষরিত দলিলের কোনো বস্তুগত অংশ দলিলের কর্তৃত্ব ছাড়া গোপনে ঘষামাজা করে পরিবর্তন করা (যেমন- চেকে ১,০০০ টাকার পাশে একটি শূন্য বসিয়ে ১০,০০০ টাকা বানানো)।
  • প্রতারণামূলকভাবে কোনো অপ্রকৃতিস্থ, মাতাল বা অসচেতন ব্যক্তিকে দলিলের প্রকৃতি না জানিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া।

উদাহরণ ও শাস্তি: ধারা ৪৬৫ মতে সাধারণ জালিয়াতির শাস্তি ২ বছর কারাদণ্ড; মূল্যবান জামানত বা উইল জালিয়াতির শাস্তি ধারা ৪৬৭ মতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।

৬. (ঙ) অনিষ্ট সাধন (Mischief – Section 425, Penal Code)

সংজ্ঞা (ধারা ৪২৫): জনসাধারণের বা কোনো ব্যক্তির অন্যায় ক্ষতি করার অভিপ্রায়ে বা জেনে-শুনে কোনো সম্পত্তির এমন কোনো পরিবর্তন সাধন করা বা ধ্বংস করা, যার ফলে উক্ত সম্পত্তির মূল্য বা উপযোগিতা বিনষ্ট বা হ্রাস পায়, তাকে ‘অনিষ্ট সাধন’ বলে।

উদাহরণ ও শাস্তি: ‘ক’ শত্রুতাবশত ‘খ’-এর ফসলের ক্ষেতে লবণ বা বিষাক্ত রাসায়নিক ছিটিয়ে সমস্ত ফসল নষ্ট করে দিল। এটি ৪২৫ ধারামতে অনিষ্ট সাধন। ধারা ৪২৭ মতে ৫০ টাকা বা তদূর্ধ্ব মূল্যের ক্ষতিসাধনে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড; আর বাসগৃহে অগ্নিসংযোগ করে অনিষ্ট সাধনে ধারা ৪৩৬ মতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

Related Articles

Back to top button