মারাত্মক জখম অপরাধে সহায়তা বেআইনী জনতা জালিয়াতি ও অনিষ্ট সাধনের ব্যাখ্যা – ২০১৪
দণ্ডবিধির মৌলিক অপরাধসমূহের বিশদ ব্যাখ্যা ও উদাহরণ: মারাত্মক জখম, সহায়তা, বেআইনি জনতা, জালিয়াতি ও অনিষ্ট সাধন
১. মূল প্রশ্ন (Examination Question)
৮. উদাহরণসহ যেকোন ৪টি ব্যাখ্যা করুন: [পূর্ণমান: ১৬]
ক) মারাত্মক জখম (Grievous Hurt)
খ) অপরাধ সংঘটনে সহযোগীতা (Abetment)
গ) বেআইনী জনতা (Unlawful Assembly)
ঘ) জালিয়াতি (Forgery)
ঙ) অনিষ্ট সাধন (Mischief)
২. (ক) মারাত্মক জখম (Grievous Hurt – Section 320, Penal Code)
দণ্ডবিধির ৩১৯ ধারায় আঘাতের (Hurt) সংজ্ঞা দেওয়ার পর ৩২০ ধারায় আঘাতের চরম রূপ হিসেবে ৮ শ্রেণীর আঘাতকে সংবিধিবদ্ধভাবে ‘মারাত্মক জখম’ বা Grievous Hurt হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই তালিকাটি সীমাবদ্ধ (Exhaustive):
- পুরুষত্বহীনকরণ (Emasculation): কোনো পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা বা পুরুষত্ব স্থায়ীভাবে নষ্ট করা।
- দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে বিনষ্টকরণ: যেকোনো একটি বা উভয় চোখের দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট করা।
- শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে বিনষ্টকরণ: যেকোনো একটি বা উভয় কানের শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট করা।
- যেকোনো অঙ্গ বা সন্ধির বিনাশ: শরীরের কোনো অঙ্গ বা জোড়া বিচ্ছিন্ন করা বা নষ্ট করা।
- অঙ্গ বা জোড়ার কর্মক্ষমতা স্থায়ীভাবে বিনষ্টকরণ: কোনো অঙ্গ বা গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা স্থায়ীভাবে হ্রাস বা ধ্বংস করা।
- মাথা বা চেহারার স্থায়ী বিকৃতি: মুখমণ্ডল বা মাথার স্থায়ী রূপহানি করা (যেমন- এসিড নিক্ষেপ বা কুঠার দিয়ে চেহারা কেটে ফেলা)।
- হাড় বা দাঁত ভাঙা বা স্থানচ্যুত করা (Fracture or dislocation of a bone or tooth): যেকোনো হাড় বা দাঁত ভেঙে ফেলা বা নিজ স্থান থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
- জীবন বিপন্নকারী বা ২০ দিনের নিদারুণ শারীরিক কষ্ট: এমন আঘাত যার ফলে আহত ব্যক্তির জীবন বিপন্ন হয় অথবা সে একটানা ২০ দিন বা ততোধিক সময় নিদারুণ শারীরিক যন্ত্রণায় ভোগে বা তার স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পাদনে অক্ষম থাকে।
উদাহরণ ও শাস্তি: ‘ক’ একটি লোহার রড দিয়ে ‘খ’-এর বাম হাতে প্রচণ্ড আঘাত করে তার হাতের হাড় ভেঙে ফেলল। এটি ৩২০ ধারার ৭ম দফা অনুযায়ী মারাত্মক জখম। স্বেচ্ছায় মারাত্মক জখম ঘটানোর শাস্তি ধারা ৩২৫ মতে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড; মারাত্মক অস্ত্র দ্বারা ঘটালে ধারা ৩২৬ মতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।
৩. (খ) অপরাধ সংঘটনে সহায়তা বা প্ররোচনা (Abetment – Section 107, Penal Code)
দণ্ডবিধির ১০৭ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি ৩টি উপায়ের যেকোনো একটির মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনে সহায়তা (Abetment) করতে পারে:
- প্ররোচিত করার মাধ্যমে (Instigation): সক্রিয়ভাবে কাউকে কোনো অপরাধমূলক কাজ করার জন্য প্ররোচিত, প্রলুব্ধ বা উৎসাহিত করা।
- ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে (Conspiracy): অপরাধমূলক কাজ সম্পাদনের উদ্দেশ্যে এক বা একাধিক ব্যক্তির সাথে ষড়যন্ত্রে যুক্ত হওয়া এবং সেই ষড়যন্ত্রের অনুসরণে কোনো কাজ সংঘটিত হওয়া।
- ইচ্ছাকৃত সহযোগিতার মাধ্যমে (Intentional Aiding): কোনো কাজ করে বা অবৈধভাবে কাজ থেকে বিরত থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ সংঘটনের পথ সুগম করা (যেমন- হত্যাকারীকে গোপনে বিষ সরবরাহ করা বা ডাকাতির সুবিধার্থে বাড়ির দারোয়ান কর্তৃক ফটক খোলা রাখা)।
উদাহরণ ও শাস্তি: ‘ক’ প্রকাশ্যে ‘খ’-কে চিৎকার করে বলল— “ঐ পুলিশ অফিসারকে গুলি করে মেরে ফেল!” এবং সেই প্ররোচনায় ‘খ’ পুলিশ অফিসারকে গুলি করল। এখানে ‘ক’ ১০৭ ও ১০৯ ধারা অনুযায়ী খুনে প্ররোচনার দায়ে মূল অপরাধীর সমান শাস্তির যোগ্য হবে।
৪. (গ) বেআইনী জনতা (Unlawful Assembly – Section 141, Penal Code)
দণ্ডবিধির ১৪১ ধারা অনুযায়ী কমপক্ষে ৫ বা ততোধিক ব্যক্তির সমাবেশ বেআইনি জনতা হিসেবে গণ্য হবে, যদি উক্ত সমাবেশের অভিন্ন উদ্দেশ্য নিম্নোক্ত ৫টি বিষয়ের যেকোনো একটি হয়:
- সরকার, সংসদ বা সরকারি কর্মচারীকে তার আইনসম্মত ক্ষমতা প্রয়োগে বলপ্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন করা।
- আইন বা আইনসঙ্গত বিচারিক প্রক্রিয়া কার্যকরকরণে বাধা দেওয়া।
- কোনো অনিষ্ট সাধন (Mischief), অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশ (Criminal Trespass) বা অন্য কোনো অপরাধ সংঘটন করা।
- অপরাধমূলক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির সম্পত্তির দখল গ্রহণ বা কোনো পথ, পানি বা ইজমেন্টের অধিকার ভোগে বাধা দেওয়া।
- কাউকে এমন কোনো কাজ করতে বাধ্য করা যা করতে সে আইনত বাধ্য নয়, অথবা কোনো কাজ করা থেকে বিরত রাখা যা করার আইনগত অধিকার তার রয়েছে।
শাস্তি: ধারা ১৪৩ মতে বেআইনি জনতার সদস্য হওয়ার শাস্তি ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড; মারাত্মক অস্ত্রসজ্জিত হয়ে যোগ দিলে ধারা ১৪৪ মতে ২ বছর কারাদণ্ড।
৫. (ঘ) জালিয়াতি (Forgery – Section 463 & 464, Penal Code)
সংজ্ঞা (ধারা ৪৬৩): জনসাধারণ বা কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধন বা দাবি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে, অথবা প্রতারণা করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা দলিল তৈরি করাকে জালিয়াতি বলে।
মিথ্যা দলিল তৈরির ৩টি উপায় (ধারা ৪৬৪):
- অসাধু বা প্রতারণামূলকভাবে কোনো দলিলে স্বাক্ষর, সিল বা সম্পাদন করা এমন ব্যক্তিকে বিশ্বাস করানোর জন্য যে তা অন্য কোনো ব্যক্তির কর্তৃত্বে স্বাক্ষরিত হয়েছে।
- বৈধভাবে স্বাক্ষরিত দলিলের কোনো বস্তুগত অংশ দলিলের কর্তৃত্ব ছাড়া গোপনে ঘষামাজা করে পরিবর্তন করা (যেমন- চেকে ১,০০০ টাকার পাশে একটি শূন্য বসিয়ে ১০,০০০ টাকা বানানো)।
- প্রতারণামূলকভাবে কোনো অপ্রকৃতিস্থ, মাতাল বা অসচেতন ব্যক্তিকে দলিলের প্রকৃতি না জানিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া।
উদাহরণ ও শাস্তি: ধারা ৪৬৫ মতে সাধারণ জালিয়াতির শাস্তি ২ বছর কারাদণ্ড; মূল্যবান জামানত বা উইল জালিয়াতির শাস্তি ধারা ৪৬৭ মতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।
৬. (ঙ) অনিষ্ট সাধন (Mischief – Section 425, Penal Code)
সংজ্ঞা (ধারা ৪২৫): জনসাধারণের বা কোনো ব্যক্তির অন্যায় ক্ষতি করার অভিপ্রায়ে বা জেনে-শুনে কোনো সম্পত্তির এমন কোনো পরিবর্তন সাধন করা বা ধ্বংস করা, যার ফলে উক্ত সম্পত্তির মূল্য বা উপযোগিতা বিনষ্ট বা হ্রাস পায়, তাকে ‘অনিষ্ট সাধন’ বলে।
উদাহরণ ও শাস্তি: ‘ক’ শত্রুতাবশত ‘খ’-এর ফসলের ক্ষেতে লবণ বা বিষাক্ত রাসায়নিক ছিটিয়ে সমস্ত ফসল নষ্ট করে দিল। এটি ৪২৫ ধারামতে অনিষ্ট সাধন। ধারা ৪২৭ মতে ৫০ টাকা বা তদূর্ধ্ব মূল্যের ক্ষতিসাধনে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড; আর বাসগৃহে অগ্নিসংযোগ করে অনিষ্ট সাধনে ধারা ৪৩৬ মতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

