জামিনযোগ্য বনাম জামিনঅযোগ্য অপরাধ এবং মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে জামিনের বিধান | বার কাউন্সিল লিখিত ২০১২
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১২: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮
প্রশ্ন: ৮ জামিনযোগ্য (Bailable) এবং জামিনঅযোগ্য (Non-bailable) অপরাধের মধ্যে পার্থক্য কি? মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধে অভিযুক্ত আসামিকে কি জামিন দেওয়া যায়? ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারার শর্তাবলী, আদালতের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা ও সুপ্রিম কোর্টের নজিরসহ পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও জামিনের দর্শন
ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অন্যতম সর্বোচ্চ মূলনীতি হলো—“Presumption of Innocence” (বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামি নির্দোষ) এবং সুবিখ্যাত আইনি ম্যাক্সিম—“Bail is the rule, jail is the exception” (জামিনই সাধারণ নিয়ম, জেল হলো ব্যতিক্রম)। কোনো ব্যক্তিকে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে অনির্দিষ্টকাল কারাগারে আটক রাখা তার ব্যক্তিস্বাধীনতার সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। এই ভারসাম্য রক্ষার্থেই ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৬ ও ৪৯৭ ধারা প্রণীত হয়েছে।
২. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: জামিনযোগ্য বনাম জামিনঅযোগ্য অপরাধ
| তুলনার ক্ষেত্র | জামিনযোগ্য অপরাধ (ধারা ৪৯৬) | জামিনঅযোগ্য অপরাধ (ধারা ৪৯৭) |
|---|---|---|
| অধিকারের প্রকৃতি | আসামির সংবিধিবদ্ধ অলঙ্ঘনীয় আইনগত অধিকার। | আদালতের স্বেচ্ছাধীন বিচারিক ক্ষমতা (Discretion)। |
| আদালতের অবস্থান | আদালত বা পুলিশ জামিন মঞ্জুর করতে বাধ্য। | মামলার পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেন। |
| অপরাধের মাত্রা | তুলনামূলক লঘু অপরাধ (CrPC ২য় তফসিলে জামিনযোগ্য)। | গুরুতর ও জঘন্য অপরাধ (যেমন খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ)। |
৩. মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধে জামিনের বিশেষ শর্তাবলী (Section 497(1))
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭(১) ধারার সাধারণ নিয়ম হলো—যদি বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে যে আসামি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ করেছে, তবে সাধারণ নিয়মে জামিন দেওয়া যাবে না। কিন্তু একই ধারার শর্তাংশে (Proviso to Section 497(1)) আদালতকে ৪টি বিশেষ শ্রেণির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী জামিন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে:
- আসামি যদি ১৬ (ষোলো) বৎসরের কম বয়স্ক কোনো ব্যক্তি হয়;
- আসামি যদি কোনো নারী (Female) হন;
- আসামি যদি কোনো গুরুতর অসুস্থ (Sick) ব্যক্তি হন;
- আসামি যদি কোনো শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী ও অক্ষম (Infirm) ব্যক্তি হন।
উক্ত ৪টি ক্যাটাগরির যে কোনো একটিতে পড়লে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মামলায়ও বিজ্ঞ আদালত আসামিকে বিশেষ মানবিক ও আইনি বিবেচনায় জামিনে মুক্তি দিতে পারেন।
৪. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)
- হাজী মকবুল হোসেন বনাম রাষ্ট্র (51 DLR (AD) 124): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, কেবল ধারা ৩০২ থাকার কারণেই জামিন নাকচ করা যাবে না; মামলার উপাদান ও আসামির ব্যক্তিগত অসুস্থতা বিবেচনা করে আদালত ৪৯৭ ধারায় জামিন দিতে পারেন।
- বেগম খালেদা জিয়া বনাম রাষ্ট্র (70 DLR (AD) 1): আপিল বিভাগ রায় দেন যে, বয়স্ক ও অসুস্থ নারী আসামির ক্ষেত্রে ৪৯৭ ধারার শর্তাংশের সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে জামিন প্রদান আইনসম্মত।
৫. উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, জামিনযোগ্য বনাম জামিনঅযোগ্য অপরাধ এবং মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে জামিনের বিধান বিচার প্রশাসনের ব্যক্তিস্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী।
৩.১. বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালতে ৪৯৭ ধারার পূর্ণাঙ্গ জামিন আবেদনের আনুষ্ঠানিক ড্রাফট
বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালত, ঢাকা
ফৌজদারি মিস মোকদ্দমা নং ……… / ২০২৪ (উদ্ভবী জি.আর নং ৪৫/২০২৩, ধারা ৩০২/৩৪ দণ্ডবিধি)
মোসা: রহিমা খাতুন (আসামি হাজতি)
— বনাম —
রাষ্ট্র — বিপরীত পক্ষ
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারার শর্তাংশ মতে নিয়মিত জামিনের দরখাস্ত
আসামিপক্ষে বিজ্ঞ আদালত সমীপে নিবেদন এই যে—
- দরখাস্তকারী একজন বৃদ্ধা, অসুস্থ ও নিরীহ নারী। এজাহারে তাহার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট মারাত্মক আঘাতের অভিযোগ নাই; নিছক পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে তাকে জড়ানো হইয়াছে।
- দরখাস্তকারী বিগত ৬ মাস যাবৎ জেল হাজতে আটক রহিয়াছেন এবং তিনি গুরুতর হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হইয়া কারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন, যাহার মেডিকেল রিপোর্ট অত্র দরখাস্তের সহিত সংযুক্ত করা হইল।
- ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭(১) ধারার শর্তাংশ অনুযায়ী অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধা নারী হিসেবে দরখাস্তকারী বিশেষ জামিন সুবিধা লাভের পূর্ণ হকদার। জামিন পাইলে তিনি কখনোই পলাতক হইবেন না।
প্রার্থনা: অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে দরখাস্তকারী আসামিকে বিজ্ঞ আদালতের সন্তোষজনক যে কোনো বন্ডে নিয়মিত জামিনে মুক্তির আদেশদানে মর্জি হয়।
৩.২. জামিন বাতিলের আইনি ক্ষমতা ও শর্তাবলী (Section 497(5) CrPC)
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭(৫) ধারা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ বা দায়রা জজ আদালত জামিনে মুক্ত যে কোনো আসামিকে পুনরায় গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দিতে পারেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট (রাষ্ট্র বনাম মো: সোলায়মান, 35 DLR (AD) 124) রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, জামিন মঞ্জুর করার চেয়ে জামিন বাতিল করা অনেক বেশি কঠিন। জামিন বাতিলের বৈধ কারণসমূহ:
- আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখালে বা সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার অপচেষ্টা করলে;
- আসামি বিদেশে বা অন্যত্রে পলাতক হওয়ার স্পষ্ট ঝুঁকি সৃষ্টি করলে;
- আসামি পুনরায় একই ধরনের গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ সংঘটন করলে;
- বিচারিক আদালত এখতিয়ারবিহীনভাবে বা আইনের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জামিন দিলে।
৩.৩. আগাম জামিন (Anticipatory Bail under Section 498 CrPC)
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ ও বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালতকে যেকোনো আমলযোগ্য অপরাধে গ্রেফতারের পূর্বেই আসামিকে আগাম জামিন (Anticipatory Bail) প্রদানের অসাধারণ এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ (রাষ্ট্র বনাম প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস, 63 DLR (AD) 10) রায়ে সিদ্ধান্ত দেন যে, যদি আসামির বিরুদ্ধে কোনো অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা হয়রানিমূলক উদ্দেশ্যে গ্রেফতারের স্পষ্ট ঝুঁকি থাকে, তবে ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষায় ৪৯৮ ধারায় সীমিত সময়ের জন্য আগাম জামিন প্রদান সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত।
৩.২. জামিন বাতিলের আইনি ক্ষমতা ও শর্তাবলী (Section 497(5) CrPC)
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭(৫) ধারা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ বা দায়রা জজ আদালত জামিনে মুক্ত যে কোনো আসামিকে পুনরায় গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দিতে পারেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট (রাষ্ট্র বনাম মো: সোলায়মান, 35 DLR (AD) 124) রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, জামিন মঞ্জুর করার চেয়ে জামিন বাতিল করা অনেক বেশি কঠিন। জামিন বাতিলের বৈধ কারণসমূহ:
- আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখালে বা সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার অপচেষ্টা করলে;
- আসামি বিদেশে বা অন্যত্রে পলাতক হওয়ার স্পষ্ট ঝুঁকি সৃষ্টি করলে;
- আসামি পুনরায় একই ধরনের গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ সংঘটন করলে;
- বিচারিক আদালত এখতিয়ারবিহীনভাবে বা আইনের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জামিন দিলে।
৩.৩. আগাম জামিন (Anticipatory Bail under Section 498 CrPC)
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ ও বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালতকে যেকোনো আমলযোগ্য অপরাধে গ্রেফতারের পূর্বেই আসামিকে আগাম জামিন (Anticipatory Bail) প্রদানের অসাধারণ এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ (রাষ্ট্র বনাম প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস, 63 DLR (AD) 10) রায়ে সিদ্ধান্ত দেন যে, যদি আসামির বিরুদ্ধে কোনো অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা হয়রানিমূলক উদ্দেশ্যে গ্রেফতারের স্পষ্ট ঝুঁকি থাকে, তবে ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষায় ৪৯৮ ধারায় সীমিত সময়ের জন্য আগাম জামিন প্রদান সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত।

