রেস জুডিকাটা, ডিক্রী, অন্তর্বর্তীকালীন মুনাফা, কজ অব একশন, সেট-অফ ও বিকল্প সমন জারী | বার কাউন্সিল লিখিত ২০১২

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১২: দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮

প্রশ্ন: ৩ দেওয়ানি কার্যবিধির আলোকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলির আইনি সংজ্ঞা, উপাদান ও তাৎপর্য আলোচনা করুন: (ক) রেস জুডিকাটা (Res Judicata – Section 11), (খ) ডিক্রি (Decree – Section 2(2)), (গ) অন্তর্বর্তীকালীন মুনাফা (Mesne Profits – Section 2(12)), (ঘ) মোকদ্দমার কারণ (Cause of Action), (ঙ) সেট-অফ (Set-off – Order VIII Rule 6), এবং (চ) বিকল্প সমন জারি (Substituted Service – Order V Rule 20)। [পূর্ণমান: ১৫]

(ক) রেস জুডিকাটা (Res Judicata – Section 11 CPC)

দেওয়ানি কার্যবিধির ১১ ধারায় রেস জুডিকাটা বা ‘দোবারা দোষ’ নীতি বিধিবদ্ধ হয়েছে। কোনো উপযুক্ত আদালত যদি কোনো মোকদ্দমার সরাসরি ও মূল বিচার্য বিষয় পক্ষগণের মধ্যে পূর্ণ শুনানি অন্তে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করে, তবে পরবর্তীতে একই পক্ষ বা তাদের প্রতিনিধির মধ্যে একই বিষয়ে নতুন কোনো মামলা আদালত গ্রহণ করতে পারবে না। দর্শন: “Nemo debet bis vexari pro una et eadem causa” (একই কারণে কাউকে দুবার হয়রানি করা যাবে না)।

(খ) ডিক্রি (Decree – Section 2(2) CPC)

ধারা ২(২) অনুযায়ী ডিক্রি হলো কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক প্রদত্ত এমন এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা (Formal Expression of Adjudication), যা মামলার বিতর্কিত সকল বা যে কোনো বিষয়ে পক্ষগণের অধিকার চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ (Conclusively determines the rights of the parties) করে। ডিক্রি দুই প্রকার হতে পারে: প্রাথমিক ডিক্রি (Preliminary Decree) এবং চূড়ান্ত ডিক্রি (Final Decree)। আরজি প্রত্যাখ্যান (Order VII Rule 11) এবং প্রত্যর্পণের আদেশ (Section 144) ডিক্রি হিসেবে গণ্য হয়।

(গ) অন্তর্বর্তীকালীন মুনাফা (Mesne Profits – Section 2(12) CPC)

কোনো স্থাবর সম্পত্তিতে বেআইনিভাবে দখলদার কোনো ব্যক্তি উক্ত দখলকালীন সময়ে যে মুনাফা বা লাভ বাস্তবিকই অর্জন করেছে, অথবা সাধারণ দক্ষতায় অর্জন করতে পারত, এবং তার সাথে যুক্ত ন্যায্য সুদসহ উক্ত অর্থকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন মুনাফা (Mesne Profits)’ বলা হয়। তবে অবৈধ দখলদার কর্তৃক জমিতে নিজ খরচে কৃত কোনো স্থায়ী উন্নয়নের (Improvements) মুনাফা এতে অন্তর্ভুক্ত হবে না।

(ঘ) মোকদ্দমার কারণ (Cause of Action)

মোকদ্দমার কারণ হলো এমন কিছু মৌলিক ঘটনার সমষ্টি (Bundle of facts), যা বাদীকে আদালতে এসে বিবাদীর বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার দাবি করার অধিকার জন্মায়। এটি ছাড়া কোনো আরজি আদালতে টিকে থাকতে পারে না। আরজিতে মোকদ্দমার কারণ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত না হলে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৭ নিয়ম ১১(ক) অনুযায়ী আরজি সরাসরি প্রত্যাখ্যানযোগ্য হয়।

(ঙ) সেট-অফ (Set-off – Order VIII Rule 6 CPC)

কোনো অর্থ আদায়ের মামলায় (Money Suit) বিবাদী যদি বাদীর দাবিকৃত অর্থের বিপরীতে বাদীর নিকট হতে তার নিজের পাওনা সুনির্দিষ্ট অংকের অর্থ (Ascertained sum of money) সমন্বয় করার লিখিত দাবি তোলে, তবে তাকে ‘সেট-অফ’ বলে। এর শর্ত হলো: অর্থটি আইনগতভাবে আদায়যোগ্য (Legally recoverable) হতে হবে এবং আদালতের আর্থিক এখতিয়ারের মধ্যে থাকতে হবে।

(চ) বিকল্প সমন জারি (Substituted Service – Order V Rule 20 CPC)

বিবাদী যদি সমন এড়ানোর জন্য গোপনে পলাতক থাকে বা সমন গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে, তবে আদালত সাধারণ নিয়মের বিকল্প হিসেবে আদেশ ৫ নিয়ম ২০ অনুযায়ী বিকল্প সমন জারির নির্দেশ দিতে পারেন। আদালত বিবাদীর বসতবাড়ির প্রকাশ্য স্থানে সমনের কপি লটকিয়ে দিয়ে, স্থানীয় ঢাকঢোল পিটিয়ে, অথবা বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে সমন জারি কার্যকর করতে পারেন, যা ব্যক্তিগত জারির সমান কার্যকর গণ্য হয়।

উপসংহার

উপরোক্ত ৬টি আইনি পরিভাষা দেওয়ানি বিচার প্রশাসনের প্রাণভোমরা। এদের সঠিক জ্ঞান দেওয়ানি মামলা পরিচালনা ও দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

(ছ) রেস জুডিকাটা বনাম রেস সাবজুডিসের গভীর তুলনামূলক সারণী

তুলনার বিষয় রেস জুডিকাটা (ধারা ১১) রেস সাবজুডিস (ধারা ১০)
মামলার স্ট্যাটাস পূর্ববর্তী মামলা আদালত কর্তৃক চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। পূর্ববর্তী মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
আইনি প্রভাব পরবর্তী মোকদ্দমা সরাসরি খারিজ ও বিচার সম্পূর্ণ বারিত। পরবর্তী মোকদ্দমার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত (Stay) থাকে।
আদালতের এখতিয়ার পূর্ববর্তী আদালতের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে কার্যকর। উভয় আদালতই সমমর্যাদার এখতিয়ারসম্পন্ন হতে হয়।

(জ) ডিক্রি বনাম আদেশের (Decree vs Order) মৌলিক পার্থক্যসমূহ

দেওয়ানি কার্যবিধির ২(২) ধারা মতে ডিক্রি যেখানে পক্ষগণের অধিকার চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করে এবং এর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রথম আপিল (Section 96) চলে, ২(১৪) ধারা মতে ‘আদেশ (Order)’ হলো কোনো দেওয়ানি আদালতের এমন কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত যা ডিক্রি নয়। যে সকল আদেশের বিরুদ্ধে আপিল চলে তা ৪৩ আদেশে সুনির্দিষ্টভাবে তালিকাভুক্ত রয়েছে; বাকি সকল সাধারণ আদেশের বিরুদ্ধে কেবল দেওয়ানি রিভিশন (Section 115) দায়ের করা যায়।

(ঝ) ডিক্রি জারির বিভিন্ন পদ্ধতি ও আনুষ্ঠানিক দরখাস্তের ড্রাফট (Execution of Decree – Section 51 & Order XXI Rule 11 CPC)

দেওয়ানি কার্যবিধির ৫১ ধারা অনুযায়ী ডিক্রিদার বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে নিম্নোক্ত ৫টি পদ্ধতিতে ডিক্রি জারি বা কার্যকর করতে পারেন:

  1. ডিক্রিকৃত সুনির্দিষ্ট সম্পত্তি সরাসরি বাদীর নিকট হস্তান্তরপূর্বক;
  2. দায়িকের সম্পত্তি ক্রোক ও নিলাম বিক্রয়ের মাধ্যমে;
  3. দায়িককে দেওয়ানি কারাগারে গ্রেফতার ও আটক রাখার মাধ্যমে;
  4. দায়িকের সম্পত্তির ওপর রিসিভার (তত্ত্বাবধায়ক) নিয়োগের মাধ্যমে;
  5. প্রতিকারের প্রকৃতি বিবেচনা করে আদালত যেভাবে সমীচীন মনে করেন।

বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, ঢাকা

দেওয়ানি জারি মোকদ্দমা নং ……… / ২০২৪ (উদ্ভবী দেওয়ানি মোকদ্দমা নং ৪৫/২০২২)

ডিক্রিদার: মো: আব্দুর রহিম — বনাম — দায়িক: মো: কামাল উদ্দিন

দেওয়ানি কার্যবিধির ২১ আদেশ ১১ নিয়ম মতে ডিক্রি জারির দরখাস্ত

ডিক্রিদার পক্ষ বিনীত নিবেদন করিতেছে যে, অত্র আদালতের দেওয়ানি মোকদ্দমা নং ৪৫/২০২২-এ বাদীর অনুকূলে প্রদত্ত বিগত ১০/০১/২০২৩ তারিখের ডিক্রি অনুযায়ী দায়িক তপশিল সম্পত্তির দখল ছাড়িয়া দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আদালতের নাজির ও বেলীফ মারফত সরজমিনে লাল নিশান উড্ডয়নপূর্বক ডিক্রিদারকে খাস দখল অর্পণের নির্দেশদানে বিজ্ঞ আদালতের মর্জি হয়।

৪.৪. জারির বাধা ও তৃতীয় পক্ষের প্রতিকার (আদেশ ২১ নিয়ম ৯৭-১০১)

ডিক্রি জারিকালে কোনো তৃতীয় পক্ষ সরল বিশ্বাসে স্বত্ব দাবি করে দখলে বাধা দিলে ডিক্রিদার ২১ আদেশের ৯৭ নিয়মে দরখাস্ত করতে পারেন। বিজ্ঞ আদালত উক্ত বাধার ওপর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পরিচালনা করে ৯৮ থেকে ১০১ নিয়ম অনুযায়ী আদেশ প্রদান করবেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ (আব্দুল মজিদ বনাম সমীরন নেসা, 39 DLR (AD) 188) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, জারির এই কার্যধারা মূল মোকদ্দমার মতোই পক্ষগণের অধিকার চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করে।

Related Articles

Back to top button