অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার জন্য একটি দরখাস্ত মুসাবিদা

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১১: দেওয়ানী কার্যবিধি

প্রশ্ন: দেওয়ানী কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ১ ও ২ বিধি অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার (Temporary Injunction) মূল শর্তাবলী আলোচনা করুন। একটি দেওয়ানী মোকদ্দমায় অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রার্থনায় বিজ্ঞ আদালতে দাখিলের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ দরখাস্ত ও এফিডেভিট মুসাবিদা প্রস্তুত করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও আইনি নীতিমালা

দেওয়ানী মোকদ্দমা নিষ্পত্তিতে অনেক সময় দীর্ঘ কালক্ষেপণ হয়। এই দীর্ঘ সময়ে বিরোধীয় সম্পত্তি নষ্ট, ধ্বংস, হস্তান্তর বা আকৃতি পরিবর্তন হয়ে গেলে মামলার চূড়ান্ত ডিক্রি অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই মোকদ্দমার বিষয়বস্তু অক্ষত রাখা এবং বিদ্যমান অবস্থা (Status quo) বজায় রাখার স্বার্থে দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ ৩৯, বিধি ১ ও ২ অনুযায়ী আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা মঞ্জুর করেন।

২. অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা মঞ্জুরের তিনটি স্বর্ণসূত্র (Golden Principles)

সুপ্রিম কোর্টের বহু যুগান্তকারী নজির অনুযায়ী আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রদানের পূর্বে ৩টি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করেন:

  1. আপাতদৃষ্টিতে অনুকূল মামলা (Prima Facie Case): বাদীর আরজি ও দালিলিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে একটি যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য মামলার অস্তিত্ব থাকতে হবে।
  2. অপূরণীয় ক্ষতি (Irreparable Loss/Injury): বাদীকে প্রমাণ করতে হবে যে নিষেধাজ্ঞা না দিলে তার এমন অপূরণীয় ক্ষতি হবে যা ভবিষ্যতে কোনো অর্থ বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
  3. সুবিধার ভারসাম্য (Balance of Convenience and Inconvenience): আদালত পরিমাপ করবেন যে নিষেধাজ্ঞা দিলে বিবাদীর যে অসুবিধা হবে, না দিলে বাদীর তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি ও অসুবিধা হবে কি না।

৩. অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার পূর্ণাঙ্গ দরখাস্ত মুসাবিদা (Court Draft)

বিজ্ঞ ১ম সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, ঢাকা

দেওয়ানী মোকদ্দমা নং— ৩২০/২০১১

মোসাঃ ফাতেমা বেগম ………………………………………………………………. বাদী

-বনাম-

মোঃ করিম হোসেন ও অন্যান্য ………………………………………………….. বিবাদীগণ

দেওয়ানী কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ১ ও ২ বিধি সহ ধারা ১৫১ মতে বাদীর পক্ষে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রার্থনা।

বাদীর বিনীত নিবেদন এই যে—

১. অত্র আদালতের অধিক্ষেত্রে তপশিল বর্ণিত স্থাবর সম্পত্তিতে স্বত্ব ঘোষণা ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দাবিতে বাদী অত্র মোকদ্দমা দায়ের করেছেন।

২. বাদী তপশিল বর্ণিত সম্পত্তির খরিদা সূত্রে নিরঙ্কুশ মালিক ও শান্তিপূর্ণ ভোগদখলকার। আরজির বিবরণী অত্র দরখাস্তের অংশ হিসেবে গণ্য। বাদীর অনুকূলে একটি শক্তিশালী আপাতদৃষ্টিতে মামলা (Prima facie case) বিদ্যমান রয়েছে।

৩. বিবাদীগণ এলাকার চিহ্নিত ভূমিগ্রাসী ও দুর্দান্ত প্রকৃতির লোক। গত ২০/০৯/২০১১ ইং তারিখে বিবাদীগণ দলবদ্ধভাবে লাঠিসোটা নিয়ে বাদীর বৈধ তপশিলভুক্ত জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে বাদীর সীমানা প্রাচীর ভেঙে জোরপূর্বক দখলের হুমকি প্রদান করে।

৪. বিবাদীগণকে এখনই আদালত কর্তৃক অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দ্বারা নিবৃত্ত করা না হলে বিবাদীগণ বিরোধীয় সম্পত্তির দখল গ্রহণ করে এর প্রকৃতি ও শ্রেণি পরিবর্তন করবে, যাতে বাদীর অপূরণীয় ক্ষতি (Irreparable loss) সাধিত হবে যা অর্থ দ্বারা পূরণযোগ্য নয়।

৫. এমতাবস্থায় মোকদ্দমা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তপশিল বর্ণিত সম্পত্তিতে বিবাদীগণের অনধিকার প্রবেশ ও হস্তান্তর রোধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রদান ন্যায়বিচারের স্বার্থে একান্ত আবশ্যক।

অতএব বিনীত প্রার্থনা:
বিজ্ঞ আদালত সুবিচার বিবেচনায় মোকদ্দমা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তপশিলভুক্ত সম্পত্তিতে বিবাদীগণ যেন কোনো প্রকার অনধিকার প্রবেশ, নির্মাণ কাজ বা শ্রেণি পরিবর্তন না করতে পারেন, সে মর্মে একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ দানে মর্জি হয়।

তপশিল সম্পত্তির বিবরণ

জেলা ঢাকা, থানা মিরপুর, মৌজা পাইকপাড়া, সি.এস ও এস.এ দাগ নং— ৪৫০, আর.এস দাগ নং— ৯৮০, মোট জমির পরিমাণ ৬ (ছয়) শতাংশ।


হলফনামা (Affidavit)

আমি মোসাঃ ফাতেমা বেগম, বয়স ৪৫ বছর, স্বামী মোঃ রফিকুল ইসলাম, সাং পাইকপাড়া, থানা মিরপুর, জেলা ঢাকা, পেশা গৃহিণী, ধর্ম ইসলাম, জাতীয়তা বাংলাদেশি—এই মর্মে শপথপূর্বক ঘোষণা করছি যে:

১. আমি অত্র মোকদ্দমার বাদী এবং দরখাস্তের যাবতীয় তথ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত হয়ে অত্র এফিডেভিট সম্পাদন করছি।

২. অত্র দরখাস্তের ১ হতে ৫ দফার বিবরণ আমার জ্ঞান ও বিশ্বাস মতে সম্পূর্ণ সত্য এবং বিজ্ঞ আদালতের উপস্থিতিতে অদ্য ২৩/০৯/২০১১ ইং তারিখে স্বাক্ষর প্রদান করিলাম।

হলফকারী

৪. উচ্চ আদালতের নজির

  • আকরাম হোসেন বনাম মমতাজ বেগম (51 DLR 212): অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার জন্য বাদীকে আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান মামলার পাশাপাশি অপূরণীয় ক্ষতির প্রমাণ দাখিল করতে হবে।
  • ডেল্টা স্পিনিং মিলস বনাম সোনালী ব্যাংক (47 DLR (AD) 165): অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা প্রদানের পূর্বে সুবিধার ভারসাম্য অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করতে হবে।

৫. উপসংহার

দেওয়ানী আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা মোকদ্দমার বিষয়বস্তু সংরক্ষণে সর্বাধিক ব্যবহৃত প্রতিকার। নিখুঁত আইনি শর্ত পূরণ ও যথাযথ ড্রাফটিং আদালতের ইতিবাচক আদেশ নিশ্চিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

৪.১. অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ৩টি সোনালী মাপকাঠি ও ড্রাফটিংয়ের অপরিহার্য উপাদান

দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ১ ও ২ নিয়মে অন্তর্বর্তীকালীন ও অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন প্রস্তুতকালে নিম্নোক্ত উপাদানসমূহ প্রমাণের মাধ্যমে তুলে ধরতে হয়:

  • প্রাথমিক দৃষ্টিতে দৃশ্যমান মামলা (Prima Facie Case): আরজি ও দালিলিক প্রমাণ দৃষ্টে বাদীর স্বত্ব ও দখলের একটি বাস্তবসম্মত প্রাথমিক ভিত্তি বিদ্যমান থাকতে হবে;
  • অপূরণীয় ক্ষতি (Irreparable Injury): নিষেধাজ্ঞা না দিলে বিরোধীয় সম্পত্তির প্রকৃতি এমনভাবে পরিবর্তিত হবে যা পরে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে মেরামত করা সম্ভব নয়;
  • সুবিধার ভারসাম্য (Balance of Convenience): নিষেধাজ্ঞা দিলে বিবাদীর যে ক্ষতি হবে, না দিলে বাদীর ক্ষতি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি হবে (আবুল হোসেন বনাম সোনালী ব্যাংক, 39 DLR (AD) 88)।

আইনি সিদ্ধান্ত: অতএব, এই ৩টি উপাদানের নিখুঁত সন্নিবেশ ঘটিয়ে হলফনামাসহ দাখিলকৃত দরখাস্তের মাধ্যমেই কেবল আদালত থেকে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা হাসিল করা সম্ভব।

৪.২. নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার মারাত্মক পরিণতি (আদেশ ৩৯ নিয়ম ২ক)

দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ২ক নিয়ম অনুযায়ী আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশ অমান্য করা চরম আদালত অবমাননা। বিজ্ঞ আদালত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনকারীর যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করতে পারেন এবং তাকে সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত দেওয়ানি কারাগারে আটক রাখার কঠোর নির্দেশ প্রদান করতে পারেন।

৪.৩. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও পরীক্ষার্থীর জন্য দিকনির্দেশনা

আপিল বিভাগ (আবুল হোসেন বনাম সোনালী ব্যাংক, 39 DLR (AD) 88) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে প্রাথমিক মামলা ও অপূরণীয় ক্ষতি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা আবশ্যক। পরীক্ষায় ৩৯ আদেশের ১ ও ২ নিয়মের দরখাস্তের সাথে হলফনামা ও তপশিল নিখুঁতভাবে লেখা বাঞ্ছনীয়।

Related Articles

Back to top button