১৬৮ দিনের বিলম্ব খারিজের আদেশ বাতিল: বাংলাদেশ রেলওয়ের আপিল শুনানির নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়
সরকারি সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়ের দায়ের করা একটি দেওয়ানি আপিলে ১৬৮ দিনের বিলম্ব মার্জনা বা মওকুফ করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। মামলায় বিলম্বের কারণ হিসেবে আইন উপদেষ্টার মতামত গ্রহণ, মামলার প্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর মাধ্যমে আপিলের স্মারকলিপি প্রস্তুত করার দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার যে ব্যাখ্যা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়েছিল, তা পর্যালোচনার পর সন্তোষজনক বলে গ্রহণ করেছেন উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে বিলম্ব মওকুফের আবেদন নামঞ্জুর করে লালমনিরহাটের জেলা জজের দেওয়া পূর্ববর্তী আদেশ বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের একক বেঞ্চ সিভিল রিভিশন নং ৪৬৮৬/২০০৪-এর রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট আদেশে উল্লিখিত তারিখ অনুযায়ী ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ রায় ঘোষণা করা হয় এবং সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে উক্ত রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। আদালত রিভিশন আবেদনের ওপর জারি করা রুল চূড়ান্ত বা মঞ্জুর করে বাংলাদেশ রেলওয়ের আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্ব মওকুফ করেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিম্ন আপিল আদালতকে উভয় পক্ষকে নোটিশ দিয়ে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দ্রুত আপিলটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ মামলায় কোনো পক্ষের ওপর আদালত কোনো প্রকার আর্থিক ব্যয় বা খরচ আরোপ করেননি।
বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান তাঁর রায়ে দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থায় বিলম্ব মওকুফের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের স্বার্থ, বিলম্বের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা এবং কারিগরি ত্রুটির কারণে মামলা খারিজ না করে মূল বিরোধের সারবত্তা বা গুণাগুণের ভিত্তিতে বিচারিক নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
মূল বিরোধ ও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট
মামলার নথি ও বিচারিক কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, লালমনিরহাটের সহকারী জজ আদালতে ২০০২ সালে অন্য শ্রেণির মামলা নং ৬৮/২০০২ দায়ের করেছিলেন শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। সেই মামলায় বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বিবাদী করা হয়। বাদী শফিকুল ইসলামের মূল আরজি বা আবেদনের বিষয়বস্তু ছিল, ১৯৯৪ সালের অপর একটি মামলা অর্থাৎ অন্য শ্রেণির মামলা নং ১১৭/১৯৯৪-এ ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ তারিখে প্রদত্ত রায় এবং ৫ অক্টোবর ১৯৯৭ তারিখে স্বাক্ষরিত ডিক্রিটি ছিল সম্পূর্ণ যোগসাজশমূলক, অনধিকারচর্চামূলক এবং তাঁর ওপর কোনোভাবেই আইনত বাধ্যকর নয় মর্মে আদালত থেকে একটি সুস্পষ্ট ঘোষণা পাওয়া।
বাংলাদেশ রেলওয়ে উক্ত মোকদ্দমায় অংশ নিয়ে লিখিত আপত্তি ও জবাব দাখিলের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। উভয় পক্ষের শুনানি, উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও যুক্তিতর্ক গ্রহণ শেষে লালমনিরহাটের সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ২৪ নভেম্বর ২০০৩ তারিখে বাদী শফিকুল ইসলামের অনুকূলে রায় ও ডিক্রি প্রদান করেন। উক্ত রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ডিক্রিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ৩০ নভেম্বর ২০০৩ তারিখে।
সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের এই রায় ও ডিক্রির দ্বারা সংক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে লালমনিরহাটের জেলা জজ আদালতে অন্য আপিল নং ২৮/২০০৪ দায়ের করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু তামাদি আইনে আপিল দায়েরের জন্য নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত ১৬৮ দিন অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর আপিলটি প্রস্তুত ও দাখিল করা সম্ভব হয়। এই দীর্ঘ ১৬৮ দিনের অনিচ্ছাকৃত বিলম্ব আইনগতভাবে মওকুফের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে তামাদি আইন, ১৯০৮-এর ৫ ধারার বিধান অনুযায়ী পৃথক একটি আবেদন দাখিল করা হয়েছিল।
জেলা জজ আদালতের বিলম্ব মওকুফের আবেদন খারিজের সিদ্ধান্ত
লালমনিরহাটের জেলা জজ আদালতে তামাদি আইনের ৫ ধারার আবেদনের ওপর শুনানির পর তৎকালীন জেলা জজ ১ আগস্ট ২০০৪ তারিখে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিলম্ব মওকুফের আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেন। জেলা জজের আদেশে বলা হয়েছিল, বিবাদী-আপিলকারী বাংলাদেশ রেলওয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ তারিখে বিচারিক আদালতের রায় ও ডিক্রির সত্যায়িত অনুলিপি বা সার্টিফায়েড কপি গ্রহণ করেছিল। অনুলিপি পাওয়ার পরও সংস্থাটি আপিল দায়ের করতে অতিরিক্ত ১৬৮ দিন অযৌক্তিক বিলম্ব করেছে। জেলা জজ আদালতের দৃষ্টিতে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের আবেদনে এই দীর্ঘ কালক্ষেপণের কোনো যথাযথ, সুনির্দিষ্ট ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিলম্ব মওকুফের আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার ফলে আপিলটি কার্যত তামাদির কারণে বাতিল হয়ে পড়ার উপক্রম হয়। লালমনিরহাটের জেলা জজের উক্ত আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে আইনগত প্রতিকার পেতে হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন আবেদন নং ৪৬৮৬/২০০৪ দায়ের করে। রিভিশন আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট আদেশের বিরুদ্ধে রুল নিশি জারি করেন। রুল জারির পাশাপাশি হাইকোর্ট আপিল আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের প্রদত্ত রায় ও ডিক্রির কার্যকারিতার ওপর ছয় মাসের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। পরবর্তীতে ২১ মে ২০০৬ তারিখে শুনানির পর স্থগিতাদেশের এই মেয়াদ আরও ছয় মাসের জন্য বর্ধিত করা হয়।
আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্বের পক্ষে বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যাখ্যা
হাইকোর্টে রিভিশন শুনানিকালে আদালত বাংলাদেশ রেলওয়ের দাখিলকৃত মূল রিভিশন আবেদন, মামলার নথি এবং নিম্ন আদালতে তামাদি আইনের ৫ ধারায় করা বিলম্ব মওকুফের দরখাস্ত বিশদভাবে পর্যালোচনা করেন। আদালত পর্যবেক্ষণে দেখতে পান, বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি সংবিধিবদ্ধ সরকারি সংস্থা বা রাষ্ট্রীয় পরিবহন প্রতিষ্ঠান হিসেবে যেকোনো আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আপিল দায়েরের পূর্বে একাধিক প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক ধাপ অনুসরণ করতে বাধ্য থাকে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে আদালতে দাখিলকৃত লিখিত ব্যাখ্যায় জানানো হয়:
- সিনিয়র সহকারী জজ আদালত থেকে রায় ও ডিক্রির সার্টিফায়েড কপি পাওয়ার পর মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে আপিল করার যৌক্তিকতা নির্ণয়ের জন্য তা অবিলম্বে সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন উপদেষ্টার কাছে আনুষ্ঠানিক মতামতের জন্য প্রেরণ করা হয়।
- আইন উপদেষ্টার ইতিবাচক আইনি মতামত পাওয়ার পর আপিল দায়েরের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অর্থ বরাদ্দ, মামলার পরিচালনা ব্যয় এবং ফিস অনুমোদনের জন্য অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও আর্থিক দপ্তরে ফাইল নড়াচড়া করতে হয় এবং একাধিক অনুমোদন সম্পন্ন করতে হয়।
- প্রয়োজনীয় আর্থিক ব্যয় অনুমোদিত হওয়ার পর নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রয়োজনীয় লিখিত ব্রিফ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। এরপর আইনজীবী সমস্ত নথি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে আপিলের আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি (মেমোরেন্ডাম অব আপিল) এবং বিলম্ব মওকুফের আবেদনপত্রটি আইনানুগভাবে প্রস্তুত করেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বক্তব্য ছিল, সরকারি ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার দাপ্তরিক নিয়মানুবর্তিতা ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণেই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আপিল দায়ের করতে মোট ১৬৮ দিনের অতিরিক্ত সময় অতিবাহিত হয়েছিল। এখানে কর্তৃপক্ষের কোনো ব্যক্তিগত গাফিলতি, চরম অবহেলা বা অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না।
হাইকোর্ট রেলওয়ের এই যুক্তি ও কার্যপ্রণালী মূল্যায়ন করে অভিমত দেন যে, বিলম্বের পক্ষে দেওয়া এই প্রশাসনিক ব্যাখ্যা সম্পূর্ণরূপে সন্তোষজনক ছিল। এই ব্যাখ্যা তামাদি আইনের ৫ ধারায় বর্ণিত ‘যথেষ্ট কারণ’ বা ‘সাফিশিয়েন্ট কজ’ প্রতিষ্ঠার আইনগত শর্তাদি পূরণ করে। ফলে নিম্ন আপিল আদালতের জেলা জজের উচিত ছিল কঠোর কারিগরি অবস্থান না নিয়ে আবেদনটি মঞ্জুর করা।
সরকারি সংস্থার ক্ষেত্রে বিলম্ব মওকুফের বিষয়ে উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক নজির
বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান তাঁর রায়ে দেওয়ানি মামলায় বিলম্ব মওকুফের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের উচ্চ আদালতসমূহের একাধিক যুগান্তকারী রায় ও আইনি নীতি বিস্তারিতভাবে উদ্ধৃত করেন।
১. সরকার বিশেষ কোনো বাড়তি সুবিধা পেতে পারে না
হাইকোর্ট আপিল বিভাগের সুপরিচিত ‘বাংলাদেশ বনাম জাহেরউদ্দিন’ মামলার নজির উল্লেখ করেন, যা ১৯৮৬ সালের বিএলডি (আপিল বিভাগ) ১৮০-এ প্রকাশিত হয়েছিল। সেই রায়ে আপিল বিভাগ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, তামাদি আইনের ক্ষেত্রে সরকার কোনো বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত বা স্বতন্ত্র শ্রেণিভুক্ত মামলাকারী নয়। তবে আদালত এটিও স্বীকার করেছিলেন যে, একটি আপিল দায়েরের পূর্বে সরকারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তর ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের সম্মতি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকে। তাই সরকারি মামলায় পরিস্থিতিভেদে যুক্তিসংগতভাবে কিছুটা বেশি সময় লাগা অস্বাভাবিক নয়। উপযুক্ত মামলায় আদালত এই প্রশাসনিক বাস্তবতাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারেন। তবুও সরকার ও সাধারণ নাগরিক—উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই বিলম্বের কারণ প্রমাণের আবশ্যকীয় মানদণ্ড একই থাকবে।
২. সরকারি কাজের প্রশাসনিক জটিলতা নমনীয়ভাবে বিবেচনার সুযোগ
রায়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে ‘গভর্নমেন্ট বনাম আলাউদ্দিন, মৃতের উত্তরাধিকারীগণ’ মামলার সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা হয়, যা ৬ বিএলসি (আপিল বিভাগ) ১০১-এ লিপিবদ্ধ রয়েছে। উক্ত রায়ে আপিল বিভাগ উল্লেখ করেছিলেন, আইনের চোখে সরকার সাধারণ মামলাকারীর সমকক্ষ হলেও সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বহুস্তরীয় প্রশাসনিক জটিলতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই উপযুক্ত ও যথার্থ ক্ষেত্রে সরকারের বিলম্বের বিষয়ে আদালত সহানুভূতিশীল, বাস্তববাদী ও নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারেন।
৩. বিলম্বের অজুহাতে মামলার মূল গুণাগুণ উপেক্ষা করা অনুচিত
দেরিতে দায়েরকৃত আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে উদার দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের সপক্ষে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় ‘কালেক্টর, ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন, অনন্তনাগ বনাম এমএসটি কাতিজি’ (এআইআর ১৯৮৭ এসসি ১৩৫৩)-এর নীতি হাইকোর্ট উদ্ধৃত করেন। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও ৫৯ ডিএলআর (আপিল বিভাগ) ১ মামলায় উক্ত নীতিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন।
এই নীতিমালার ভিত্তিতে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দেন, কোনো সচেতন মামলাকারী ইচ্ছাকৃতভাবেদেরিতে আদালতে এসে ঝুঁকি নিতে চায় না, কারণ এতে তার নিজের কোনো বাড়তি লাভ হয় না। সামান্য বা অনিচ্ছাকৃত বিলম্বের কারণে যদি আপিল খারিজ করে দেওয়া হয়, তবে একটি সম্ভাবনাময় মামলার দরজা শুরুতেই রুদ্ধ হয়ে যায় এবং ন্যায়বিচার চূড়ান্তভাবে ব্যাহত হয়। পক্ষান্তরে, বিলম্ব মওকুফ করে দিলে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে মামলার মূল মেধা বা গুণাগুণের ভিত্তিতে বিচার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা ন্যায়বিচারের মূল লক্ষ্য।
৪. প্রতিটি দিনের বিলম্ব ব্যাখ্যার ধারণার যান্ত্রিক প্রয়োগ নয়
আইনে বহুল প্রচলিত নীতি রয়েছে যে ‘প্রতিটি দিনের বিলম্বের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা থাকতে হবে’। তবে হাইকোর্ট সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, এই নীতিকে আদালত কখনোই অতিমাত্রায় কারিগরি, অনমনীয় বা যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করবে না। বরং বিলম্বের পেছনে কার্যকর কারণ কী ছিল, তা বাস্তববাদী মনোভঙ্গি নিয়ে বিচারিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে দেখতে হবে।
আদালতের মতে, কোনো আবেদনকারী কারণ দর্শাতে দেরি করলেই আদালত নিজে থেকে ধরে নিতে পারেন না যে বিলম্বটি ইচ্ছাকৃত, খামখেয়ালিপূর্ণ বা অসৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। যতক্ষণ না বিরোধী পক্ষ অসৎ উদ্দেশ্যের জোরালো প্রমাণ হাজির করতে পারে, ততক্ষণ আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অনুকূলে থাকা বাঞ্ছনীয়।
৫. কারিগরি সূক্ষ্মতার চেয়ে বস্তুনিষ্ঠ ন্যায়বিচার সর্বাগ্রে
হাইকোর্টের রায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ন্যায়বিচার বনাম পদ্ধতিগত কারিগরি নিয়মের সংঘাতের মীমাংসা। রায়ে বলা হয়, যখন প্রক্রিয়াগত বা কারিগরি নিয়ম এবং মূল ন্যায়বিচার পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন আদালতকে অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অনিচ্ছাকৃত বিলম্বের কারণে কোনো পক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা সমীচীন নয়; কারণ কারও অনিচ্ছাকৃত ভুলের সুযোগ নিয়ে অপর পক্ষের অন্যায্য সুবিধা লাভের কোনো আইনগত বা নৈতিক অধিকার জন্মায় না।
রায়ে প্রখ্যাত আইনি দর্শনের উল্লেখ করে বলা হয়, বিচার বিভাগের প্রকৃত মর্যাদা কেবল পদ্ধতিগত জটিলতার অজুহাতে ভুল সিদ্ধান্তকে আঁকড়ে ধরায় নয়, বরং বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা গ্রহণ করে যেকোনো অন্যায়কে সংশোধন করার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপরই আদালতের সুনাম প্রতিষ্ঠিত থাকে।
হাইকোর্টের চূড়ান্ত আদেশ ও নির্দেশনা
সব আইনি নজির এবং মামলার সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ শেষে বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান রায়ে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিলম্ব মওকুফের দরখাস্তে যেসব প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিবরণ দেওয়া হয়েছিল, তা তামাদি আইনের ৫ ধারার বিধান অনুযায়ী যথেষ্ট ও যুক্তিসংগত ছিল। লালমনিরহাটের জেলা জজ আবেদনটি খারিজ করার সময় বিদ্যমান আইনি নজির, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে জেলা জজের সেই বিতর্কিত আদেশে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ করা অপরিহার্য ও আইনসংগত।
এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হাইকোর্ট রুল চূড়ান্ত করে লালমনিরহাটের জেলা জজ কর্তৃক ১ আগস্ট ২০০৪ তারিখে প্রদত্ত খারিজ আদেশ বাতিল ঘোষণা করেন। একই সাথে অন্য আপিল নং ২৮/২০০৪ দায়েরের ক্ষেত্রে রেলওয়ের ১৬৮ দিনের বিলম্ব নিঃশর্তভাবে মওকুফ করার আদেশ দেন।
হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট আপিল আদালতকে নির্দেশ দেন, মামলার সমস্ত পক্ষকে বিধি মোতাবেক উপযুক্ত নোটিশ প্রদান করে আইনের বিধান মেনে দ্রুত আপিলের শুনানি ও নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। নির্দেশনায় উচ্চ আদালত বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, আপিলটি সেই ২০০৪ সালে দায়ের করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার কারণে এখন কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।
এই রায়ে রিভিশন মোকদ্দমার ব্যয়ের বিষয়ে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি, অর্থাৎ কোনো পক্ষের ওপর খরচ চাপানো হয়নি। এছাড়া হাইকোর্ট কর্তৃক পূর্বে প্রদত্ত অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং অধস্তন আদালতের মূল নথি রায়ের অনুলিপিসহ কালবিলম্ব না করে সংশ্লিষ্ট আদালতে ফেরত পাঠানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ের সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য
এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট করেছেন: তামাদি আইনের নির্ধারিত সময়সীমার গুরুত্ব অনস্বীকার্য হলেও তা যেন কোনোভাবেই বিরোধের গুণাগুণ বিচারের পথ বন্ধের হাতিয়ার না হয়। বিলম্ব মওকুফের আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আদালতকে কারণের সত্যতা, বাস্তবসম্মত পরিস্থিতি এবং বৃহত্তর ন্যায়বিচারের স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ফাইল অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতার দরুন বিলম্ব হলে, তা যদি তথ্যপ্রমাণসহ আদালতে তুলে ধরা হয়, তবে তা তামাদি আইনের ৫ ধারায় ‘যথেষ্ট কারণ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।
একই সাথে আদালত এটিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সরকারি প্রতিষ্ঠান বলেই কোনো বিশেষ দায়মুক্তি বা স্বয়ংক্রিয় অধিকার পাওয়া যায় না। প্রতিটি সরকারি দপ্তরকেই তাদের বিলম্বের সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য কারণ প্রমাণের দায় বহন করতে হবে।
উল্লেখ্য, হাইকোর্ট এই রিভিশন রায়ে কেবলমাত্র আপিল দায়েরের ১৬৮ দিনের বিলম্ব মার্জনা করেছেন। মূল মামলায় ১৯৯৭ সালের রায় ও ডিক্রি প্রকৃতপক্ষে যোগসাজশমূলক ছিল কি না, সে বিষয়ে হাইকোর্ট কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত প্রদান করেননি। সেই মূল বিরোধের আইনি মেরিট বিচার করে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট আপিল আদালতের ওপর ন্যস্ত রয়েছে।

