পারিবারিক আদালতের দেনমোহর ও খোরপোষ ডিক্রি জারিতে ডিক্রিদার কোনো সম্পত্তি দেখাতে না পারলেও দেনাদারকে সরাসরি দেওয়ানি আটকাদেশ (Civil Prison) প্রদানের ক্ষমতা: হাইকোর্ট
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত: পারিবারিক আদালত আইনের ১৬(৪) ধারার বিধান একটি বিশেষ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধান। পারিবারিক আদালতের ডিক্রিকৃত দেনমোহর ও খোরপোষের অর্থ আদায়ের নিমিত্তে ডিক্রিদার স্ত্রী যদি স্বামীর কোনো দৃশ্যমান স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি প্রদর্শন করতে অক্ষম হন, তবে আদালত হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না। অর্থ পরিশোধে ইচ্ছাকৃত অবহেলাকারী স্বামীকে দেওয়ানি কার্যবিধির ৫১ ধারার কঠোর আনুষ্ঠানিকতা ব্যতিরেকেই সরাসরি দেওয়ানি কারাগারে (Civil Imprisonment) আটকাদেশ দেওয়ার পূর্ণ আইনগত এখতিয়ার পারিবারিক আদালতের রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এই সিদ্ধান্ত দেশের আইন অঙ্গনে একটি ঐতিহাসিক ও ল্যান্ডমার্ক দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশে পারিবারিক আদালতের রায় ও ডিক্রি ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় বিপত্তি দেখা দেয় তা বাস্তবায়নে বা কার্যকরীকরণে। অনেক অসাধু স্বামী আদালতের ডিক্রিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে স্বীয় নামীয় জমিজমা অন্য আত্মীয়দের নামে হস্তান্তর বা বেনামি করে ফেলেন এবং চাকরি বা ব্যবসায়ের আয় গোপন রাখেন। স্ত্রী যখন পারিবারিক ডিক্রি জারির মামলা (Execution Case) দায়ের করেন, তখন স্বামী আদালতে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে বলেন— “আমার নামে কোনো জমি বা ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, আমাকে কীভাবে ডিক্রি দেবেন?” সাধারণ দেওয়ানি কার্যবিধির ৫১ ধারা অনুযায়ী রায়খাতককে জেলে পাঠাতে হলে ডিক্রিদারকে প্রমাণ করতে হয় যে দেনাদারের টাকা পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি পরিশোধ করছেন না। কিন্তু নারীদের এই অসহায়ত্ব দূর করতে পারিবারিক আদালত আইনে একটি বিশেষ ও কঠোর ক্ষমতা সংযোজিত হয়েছে। অত্র মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ দেনমোহর ও ভরণপোষণের টাকা আদায়ে পারিবারিক আদালতের সেই চরম বিচারিক ক্ষমতার প্রয়োগকে সমুন্নত রেখেছেন।
মামলার বিবরণী থেকে প্রকাশ, প্রতিপক্ষ মোছা. বিলকিস বানু দরখাস্তকারী মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে বকেয়া দেনমোহর বাবদ ৫ লক্ষ টাকা এবং সন্তানের বিগত দুই বছরের খোরপোষ বাবদ ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার ডিক্রি লাভ করেন। রায় ঘোষণার পর দীর্ঘ এক বছর অতিক্রান্ত হলেও স্বামী আমিনুল ইসলাম এক পয়সাও পরিশোধ করেননি।
অবশেষে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে ডিক্রি জারি মোকদ্দমা দায়ের করেন। জারি মামলায় আদালত স্বামীকে একাধিকবার ডিক্রির টাকা পরিশোধের তাগিদ প্রদান করেন। কিন্তু স্বামী আদালতে হাজির হয়ে লিখিত আপত্তি দিয়ে দাবি করেন যে, তাঁর নামে কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই এবং তিনি বর্তমানে বেকার। স্ত্রী তাঁর কোনো ব্যাংক হিসাব বা জমিজমার তালিকা দাখিল করতে পারেননি, বিধায় দেওয়ানি কার্যবিধি অনুযায়ী তাঁকে জেলে পাঠানো যায় না। পারিবারিক আদালত স্বামীর এই আপত্তি সরাসরি খারিজ করে তাঁকে অনতিবিলম্বে ডিক্রির টাকা জমা দিতে বলেন এবং ব্যর্থতায় তিন মাসের জন্য দেওয়ানি কারাগারে আটকের পরোয়ানা জারি করেন। উক্ত আটকাদেশের বিরুদ্ধে স্বামী জেলা জজ আদালতে আপিল করে ব্যর্থ হয়ে হাইকোর্টে এই সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।
অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, পারিবারিক আদালতের উদ্দেশ্য হলো অসহায় নারী ও শিশুদের দ্রুত অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রদান। স্বামী শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ একজন পুরুষ মানুষ হয়ে নিজের স্ত্রীর দেনমোহর ও সন্তানের ভরণপোষণ না দিয়ে ‘সম্পত্তি নেই’ বলে পার পেয়ে যেতে পারেন না। পারিবারিক আদালত আইন সাধারণ দেওয়ানি কার্যবিধির চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে। জেলা জজ আদালত আটকাদেশ বহাল রাখেন।
👤 আবেদনকারী / দরখাস্তকারী পক্ষের আইনি যুক্তি
- দেওয়ানি কার্যবিধির ৫১ ধারার ব্যত্যয়: দেওয়ানি কার্যবিধির ধারা ৫১ এবং আদেশ ২১ নিয়ম ৩৭ ও ৪০ অনুসারে, কোনো দেনাদারকে দেওয়ানি কারাগারে পাঠাতে হলে আদালতকে ইতিবাচক সাক্ষ্য দ্বারা নিশ্চিত হতে হবে যে দেনাদারের অর্থ পরিশোধের বাস্তব সক্ষমতা রয়েছে এবং তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে অর্থ পরিশোধ বিলম্বিত করছেন। সম্পত্তি না থাকলে কাউকে জেলে পাঠানো মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
- আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ: আইসিসিপিআর (ICCPR) এর ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিছক চুক্তির দেনা পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে কাউকে কারাগারে আটক রাখা যায় না।
- সম্পত্তির তালিকার অনুপস্থিতি: ডিক্রিদার স্ত্রী স্বামীর কোনো ক্রোকযোগ্য সম্পত্তি আরজিতে দেখাতে পারেননি।
👥 বিপরীতপক্ষ / বাদীর আইনি অবস্থান
- পারিবারিক আদালত আইনের বিশেষ চরিত্র: পারিবারিক আদালত আইনের ১৬(৪) ধারায় সুস্পষ্ট বলা হয়েছে যে, আদালত চাইলে কোনো সম্পত্তি ক্রোক বা নিলামের পদক্ষেপ ছাড়াই সরাসরি দেনাদারকে অনধিক তিন মাসের জন্য দেওয়ানি কারাগারে পাঠাতে পারেন। পারিবারিক আদালতের বিশেষ বিধানের সামনে দেওয়ানি কার্যবিধির সাধারণ শর্তাবলী প্রযোজ্য নয়।
- দেনমোহর সাধারণ দেওয়ানি ঋণ নয়: দেনমোহর ও সন্তানের খোরপোষ কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক চুক্তি নয়; এটি একটি পবিত্র শরিয়তি ও সামাজিক দায়। সুস্থ শরীরে ঘুরে বেড়ানো একজন পুরুষ নিজের সন্তানের ভরণপোষণ দেবে না— এই ধরনের নির্লজ্জতাকে প্রশ্রয় দিলে পারিবারিক আইন অর্থহীন হয়ে পড়বে।
- অধস্তন আদালতের রায় ও আদেশ সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং প্রচলিত বিচারিক চর্চার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- আবেদনকারী পক্ষের বক্তব্য মামলার মূল আইনি ভিত্তি ও নথিপত্রের বিপরীতে দাঁড়ায় না।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের সামনে মূল বিচার্য বিষয় ছিল: (১) সংশ্লিষ্ট বিশেষ আইনের বিধানাবলি কি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল, নাকি তা লংঘিত হয়েছে? (২) অধস্তন আদালত কি এখতিয়ারবহির্ভূত আদেশ প্রদান বা প্রমাণের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে গুরুতর বিচারিক ভুল (Jurisdictional Error) করেছেন? এবং (৩) মামলার সামগ্রিক ঘটনা ও নথিপত্র বিবেচনায় সংক্ষুব্ধ পক্ষের আবেদন কি আইনত মঞ্জুরযোগ্য?
বিজ্ঞ বিচারপতি উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি গ্রহণ করেন, মামলার আরজি, জবাব ও মূল নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন এবং আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির আলোকে প্রতিটি বিচার্য বিষয়ের নিষ্পত্তি করেন।
মাননীয় একক বেঞ্চ পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ এর ধারা ১৬(৪), সংবিধানের মৌলিক অধিকার এবং সুপ্রিম কোর্টের নজিরসমূহ বিশদভাবে পর্যালোচনা করেন:
ক) বিশেষ আইন বনাম সাধারণ আইনের দ্বন্দ্ব (Specialia Generalibus Derogant)
আদালত উল্লেখ করেন, আইনের সর্বজনীন মূলনীতি হলো— বিশেষ আইনের বিধান সাধারণ আইনের সাধারণ বিধানকে রদ করে দেয় (Special law overrides general law)। পারিবারিক আদালত আইন একটি বিশেষায়িত আইন যার উদ্দেশ্য হলো দুর্বল পক্ষের সুরক্ষা। ধারা ১৬(৪) অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করে:
“Where a decree remains unsatisfied, the Family Court may, in its discretion, order that the judgment-debtor be detained in the civil prison for a term not exceeding three months.”
আইনসভা ইচ্ছা করেই এই ধারায় দেওয়ানি কার্যবিধির ৫১ ধারার দীর্ঘ অনুসন্ধান বা সম্পত্তির শর্ত বাতিল করেছে। পারিবারিক আদালতের বিচারককে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে, দেনাদার যদি কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া সময়ক্ষেপণ করেন, তবে আদালত সরাসরি তাঁকে দেওয়ানি আটকাদেশে পাঠাতে পারবেন।
খ) সুপ্রিম কোর্টের অবিসংবাদিত নজিরসমূহ
হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত Md. Sheikh Nazrul Islam vs. Halima Khatun (Civil Revision No. 118 of 2023) এবং ঢাকা হাইকোর্টের ল্যান্ডমার্ক রায় Abdul Khaleque vs. Rokeya Begum (44 DLR 273) উদ্ধৃত করেন। আপিল বিভাগ সুস্পষ্ট রায় দিয়েছেন:
“The obligation of a father to maintain his child and a husband to pay dower is not conditional upon the wife locating his properties. A physically capable man cannot plead insolvency to evade payment of maintenance. The executing court under the Family Courts Act is fully empowered to issue a warrant of arrest and commit the judgment-debtor to civil prison to compel compliance.”
দরখাস্তকারী স্বামী একজন সুস্থ সবল মানুষ এবং সমাজে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি সন্তানের খোরপোষ না দিয়ে নিছক সম্পত্তি গোপন করে পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন যা চরম অনৈতিক।
মহামান্য আদালত আরও অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে বিচারিক আদালতগুলোর দায়িত্ব হলো কোনো যান্ত্রিক বা অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। উচ্চ আদালতের দীর্ঘ নজির ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই ব্যাখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
চূড়ান্ত রায় ও আদেশ: সার্বিক আইনি ও বাস্তবিক পর্যালোচনার পর মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সিভিল রিভিশন আবেদনটি সরাসরি খারিজ করেন। নিম্ন পারিবারিক আদালত ও জেলা জজ আদালতের আটকাদেশের রায়কে সম্পূর্ণ সঠিক ও আইনানুগ ঘোষণা করা হলো।
আদালত নির্দেশ দেন যে, দরখাস্তকারী স্বামীকে অত্র রায়ের প্রত্যায়িত কপি পাওয়ার তারিখ হতে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত সমুদয় অর্থ পারিবারিক আদালতে জমা দিতে হবে। অন্যথায় পারিবারিক আদালত অবিলম্বে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়ানি আটকাদেশের পরোয়ানা জারি করে তাঁকে তিন মাসের জন্য দেওয়ানি কারাগারে প্রেরণ করবেন।
- সুনির্দিষ্ট আইনি নীতি: পারিবারিক আদালতের দেনমোহর ও খোরপোষ ডিক্রি জারিতে ডিক্রিদার কোনো সম্পত্তি দেখাতে … সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নীতি দেশের সকল আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক।
- সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা: সুপ্রিম কোর্টের ঘোষিত এই রায় দেশের প্রতিটি আদালত ও ট্রাইব্যুনালকে নজির হিসেবে মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
- প্রক্রিয়াগত ত্রুটির মারাত্মক প্রভাব: আইনের অলঙ্ঘনীয় বিধান অমান্য করে গৃহীত যেকোনো প্রশাসনিক বা বিচারিক পদক্ষেপ গোড়াতেই বাতিলযোগ্য।
- নাগরিক ও ব্যবসায়িক অধিকারের সুরক্ষা: সমতা, সততা এবং সুশাসনের স্বার্থে এই রায় বিচারপ্রার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।
- সম্পত্তি না পেলেও জারি মামলা করুন: স্বামীর দৃশ্যমান কোনো জমি বা ব্যাংক হিসাব না থাকলেও অবিলম্বে পারিবারিক আদালতে জারি মামলা (Execution Case) দায়ের করুন।
- সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রার্থনা: জারি আদালতে আবেদন করে স্বামীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি কারাগারে আটকের পরোয়ানা জারি করার প্রার্থনা জানান; পারিবারিক আদালত ১৬(৪) ধারায় সরাসরি পরোয়ানা দিতে ক্ষমতাবান।
- টাকা পরিশোধেই মুক্তি: দেওয়ানি কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় স্বামী যদি ডিক্রির টাকা পরিশোধ করেন, তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তিলাভ করবেন; অন্যথায় মেয়াদ পূর্ণ করতে হবে।
- মামলা বা যেকোনো আইনি নোটিশের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই সাম্প্রতিকতম নজিরটি সঠিকভাবে উদ্ধৃত করুন।
- বিচারিক আদালতে মামলা শুনানিকালে মূল সংবিধিবদ্ধ বিধানের সাথে তথ্যের সামঞ্জস্য প্রমাণে সচেষ্ট থাকুন।
