নিঃশর্ত ব্যাংক গ্যারান্টি (Unconditional Bank Guarantee) নগদায়নে আদালত সাধারণত নিষেধাজ্ঞা দেবে না; সুপ্রতিষ্ঠিত জালিয়াতি (Fraud) ও অপূরণীয় ক্ষতি ছাড়া ক্যাশ আটকে রাখা বেআইনি: সুপ্রিম কোর্টের নজির

মামলার মৌলিক তথ্যাবলি ও বিচারিক পরিচিতি

মামলার নাম ও নম্বর: ফার্স্ট মিস আপিল নং ১১২/২০২৩ (First Miscellaneous Appeal No. 112 of 2023)
আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানি আপিল এখতিয়ার)
বিচারপতিবৃন্দ: মাননীয় বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান এবং মাননীয় বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদী
পক্ষগণ: স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক পিএলসি (আপিলকারী ব্যাংক) বনাম মেসার্স ইউনিভার্সাল অ্যাপারেলস লিমিটেড ও অন্য (রেসপনডেন্ট পক্ষ)
মূল আইন ও ধারা: চুক্তি আইন, ১৮৭২ এর ধারা ১২৬; দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ এর আদেশ ৩৯ নিয়ম ১ ও ২; সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ এর ধারা ৫৩ ও ৫৪
মূল আইনি সিদ্ধান্ত: নিঃশর্ত ও অপ্রত্যাহারযোগ্য ব্যাংক গ্যারান্টি (Unconditional and Irrevocable Bank Guarantee) মূল বাণিজ্যিক চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পৃথক চুক্তি। গ্রাহক ও সুবিধাভোগীর অভ্যন্তরীণ বিরোধের অজুহাতে আদালত ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন স্থগিত বা নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে না, যদি না ব্যাংকের অবগতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত জঘন্য জালিয়াতি (Established Fraud) অথবা অপূরণীয় অবিচার (Irretrievable Injustice) প্রমাণিত হয়।

১. বিরোধের পটভূমি ও মামলার বিবরণ

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জীবনীশক্তি হলো ব্যাংকিং জামানত ব্যবস্থা। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি, সরকারি টেন্ডার ও বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে কাজের নিশ্চয়তা হিসেবে ‘নিঃশর্ত ব্যাংক গ্যারান্টি’ (Unconditional Bank Guarantee) প্রদান করা হয়। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস— সুবিধাভোগী (Beneficiary) যখনই দাবি করবেন, ব্যাংক কোনো প্রশ্ন বা তদন্ত ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু প্রায়শই দেখা যায়, মূল সরবরাহকারী বা ঠিকাদার যখন কাজে গাফিলতি করেন এবং সুবিধাভোগী গ্যারান্টি নগদায়নের (Encashment) উদ্যোগ নেন, তখন ঠিকাদার দ্রুত দেওয়ানি আদালতে গিয়ে নিষেধাজ্ঞা (Injunction) প্রার্থনা করে অর্থ আটকে দেন। অত্র রায়ে সুপ্রিম কোর্ট এই ক্ষতিকর চর্চার বিরুদ্ধে অত্যন্ত বলিষ্ঠ আইনি নীতি ঘোষণা করেছেন।

মামলার বিবরণে প্রকাশ, দ্বিতীয় পক্ষ একটি আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশের বিপরীতে পোশাক সরবরাহের কাজের জামানত হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে সুবিধাভোগীর অনুকূলে ২০ কোটি টাকার একটি নিঃশর্ত ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যু করে। গ্যারান্টির শর্তে পরিষ্কার লেখা ছিল— সুবিধাভোগীর প্রথম লিখিত দাবিনামাতেই ব্যাংক কোনো বিতর্ক বা শর্ত ছাড়াই সমুদয় অর্থ পরিশোধে বাধ্য থাকবে (Payable on first demand without any demur)।

পরবর্তীতে সরবরাহকারী পণ্য সরবরাহের নির্ধারিত সময়সীমা ও গুণমান রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় সুবিধাভোগী উক্ত ব্যাংক গ্যারান্টিটি নগদায়নের জন্য স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের নিকট আনুষ্ঠানিক পত্র প্রেরণ করে। পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে একটি ঘোষণা ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মোকদ্দমা দায়ের করে এবং দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশের অধীনে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত দাখিল করে। বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ ব্যাংক গ্যারান্টির অর্থ পরিশোধের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। উক্ত নিষেধাজ্ঞার আদেশের বিরুদ্ধে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক হাইকোর্ট বিভাগে অত্র ফার্স্ট মিস আপিল দায়ের করে।

২. আপিলকারী ব্যাংকের আইনি বিতর্ক

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের পক্ষে বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি আদালতে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন:

  1. ব্যাংক গ্যারান্টির স্বায়ত্তশাসন নীতি (Autonomy of Bank Guarantee): চুক্তি আইনের ১২৬ ধারা এবং ব্যাংকিং নীতি অনুযায়ী ব্যাংক গ্যারান্টি হলো ব্যাংক ও সুবিধাভোগীর মধ্যকার একটি স্বাধীন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি। মূল চুক্তির বিরোধ বা পণ্য সরবরাহের মান নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার বিবাদের সাথে ব্যাংকের দায়বদ্ধতার কোনো সম্পর্ক নেই।
  2. আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং আস্থার সংকট: বাংলাদেশের একটি আদালত যদি কোনো প্রতিষ্ঠিত জালিয়াতি ছাড়া নিছক সাধারণ বিরোধের কারণে আন্তর্জাতিক নিঃশর্ত ব্যাংক গ্যারান্টির অর্থ আটকে দেয়, তবে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।
  3. নিষেধাজ্ঞার কঠোর ব্যতিক্রম: সুপ্রিম কোর্টের বহু রায় অনুযায়ী ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত— কেবল দুটি ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায়: (ক) প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত জঘন্য জালিয়াতি, এবং (খ) অপূরণীয় ক্ষতি। অত্র মামলায় এমন কোনো জালিয়াতির অভিযোগ নেই।

৩. সুবিধাভোগী ও সরবরাহকারী পক্ষের যুক্তি

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞ আইনজীবী দাবি করেন যে, সুবিধাভোগী অন্যায়ভাবে চুক্তি ভঙ্গ করেছে এবং মালামাল গ্রহণ করার পরও ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নের চেষ্টা করছে যা একটি অনৈতিক পদক্ষেপ। অতএব দেওয়ানি আদালত ন্যায়বিচারের স্বার্থেই স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দিয়েছেন।

৪. হাইকোর্ট বিভাগের গভীর আইনি ও আন্তর্জাতিক নজির বিশ্লেষণ

মাননীয় ডিভিশন বেঞ্চ চুক্তি আইনের বিধানাবলী, প্রিভি কাউন্সিল, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের শতবর্ষের প্রতিষ্ঠিত নজিরসমূহ বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেন:

ক) ব্যাংক গ্যারান্টির পবিত্রতা ও কার্যকারিতা

আদালত উল্লেখ করেন, নিঃশর্ত ব্যাংক গ্যারান্টি নগদ টাকার সমতুল্য (Equivalent to cash deposit)। যখন একটি ব্যাংক তার প্রতিশ্রুতিপত্র দ্বারা কোনো পক্ষকে অর্থ প্রদানের নিঃশর্ত নিশ্চয়তা দেয়, তখন আদালতকে অবশ্যই সেই প্রতিশ্রুতির সম্মান রক্ষা করতে হবে। আদালত যদি সাধারণ দেওয়ানি মামলার মতো এতে হস্তক্ষেপ করে নিষেধাজ্ঞা প্রদান শুরু করে, তবে বাণিজ্যিক লেনদেনের চাকা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়বে। কোনো ব্যবসায়ী বা বিদেশি বিনিয়োগকারী আর বাংলাদেশি ব্যাংকের গ্যারান্টির ওপর ভরসা করতে পারবেন না।

খ) নিষেধাজ্ঞার দুটি সুনির্দিষ্ট ও সংকীর্ণ ব্যতিক্রম

মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ সুদৃঢ়ভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নে নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার জন্য পক্ষকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করতে হবে যে ঘটনাটিতে নিম্নলিখিত দুটি ব্যতিক্রমের অন্তত একটি বিদ্যমান:

  • সুপ্রতিষ্ঠিত জালিয়াতি (Established Fraud): জালিয়াতিটি এমন হতে হবে যা গ্যারান্টির মূল ভিত্তিকেই ধ্বংস করে দেয় এবং সেই জালিয়াতি সম্পর্কে খোদ ব্যাংকের পূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে। সাধারণ চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ কোনো জালিয়াতি নয়।
  • অপূরণীয় অবিচার (Irretrievable Injustice): এমন এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি যেখানে অর্থ পরিশোধ হয়ে গেলে পরবর্তীতে মূল মামলায় ডিক্রি পেলেও কোনোভাবেই সেই অর্থ আর উদ্ধার করা সম্ভব হবে না (যেমন সুবিধাভোগী কোনো দেউলিয়া সত্তা বা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বাসিন্দা)।

গ) সুপ্রিম কোর্টের নজিরসমূহের উদ্ধৃতি

হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক নজির BCIC vs. M/S. Modern Builders Ltd. (52 DLR (AD) 160), United Commercial Bank Ltd. vs. Bank of India (AIR 1981 SC 1426) এবং Svenska Handelsbanken vs. M/S Indian Charge Chrome (1994) 1 SCC 502 উল্লেখ করে বলেন:

“The courts should be extremely slow and reluctant in granting an injunction to restrain the realization of an unconditional bank guarantee. The commitment of the bank is absolute and must be honored free from interference by the courts, save in exceptional cases of clear fraud to the knowledge of the bank or irretrievable damage.”

অত্র মামলায় পণ্য সরবরাহকারী ও ক্রেতার মধ্যে যে বিবাদ তা খাঁটি বাণিজ্যিক বিরোধ যা মূল মামলার বিচার বা সালিশের (Arbitration) মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে পারে। এতে কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত জালিয়াতির প্রমাণ নেই।

৬. চূড়ান্ত রায় ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

সার্বিক আইনি ও তথ্যগত পর্যালোচনার ভিত্তিতে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ফার্স্ট মিস আপিলটি পূর্ণাঙ্গভাবে মঞ্জুর করেন। নিম্ন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নের ওপর নিষেধাজ্ঞার আদেশকে বেআইনি ও বাতিল ঘোষণা করে তা প্রত্যাহার করা হলো।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক পিএলসিকে সুবিধাভোগীর চাহিদামাফিক ব্যাংক গ্যারান্টির অর্থ অবিলম্বে পরিশোধের আইনি স্বাধীনতা প্রদান করা হলো। তবে পণ্য সরবরাহকারী মূল মামলাটি নিম্ন আদালতে গুণাগুণের ভিত্তিতে চালিয়ে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবেন।

৭. করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button