সুপ্রিম কোর্ট বারের বার্ষিক ভোজে গরুর মাংস ও পৃথক খাদ্য ব্যবস্থাপনার আবেদন
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক ভোজ বা ‘ব্রেকআপ পার্টি’র বিপুল ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আইনজীবীদের জন্য মানসম্মত ও পর্যাপ্ত খাবার নিশ্চিত করতে একটি ব্যতিক্রমী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্মাবলম্বী আইনজীবীদের জন্য গরুর মাংস এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বী আইনজীবীদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক ব্যবস্থাপনায় খাসির মাংস ও নিরামিষভোজীদের জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা চেয়ে অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক বরাবর একটি লিখিত আবেদন দাখিল করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন।
আর্থিক হিসাব ও বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়ে আইনজীবীর পর্যবেক্ষণ
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক বরাবরে জমা দেওয়া ওই আবেদনে আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন উল্লেখ করেন, প্রতি বছর বার্ষিক ভোজ উপলক্ষে অ্যাসোসিয়েশনের প্রত্যেক আইনজীবী সদস্যের কাছ থেকে ৮০০ টাকা করে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। তাঁর দাখিলকৃত তথ্য ও হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট বারের সক্রিয় সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯৪ জনে। সেই অনুযায়ী বার্ষিক এই আয়োজনের জন্য আইনজীবীদের কাছ থেকে চাঁদা বাবদ মোট সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ টাকা।
আবেদনে আইনজীবী দাবি করেন, সদস্যদের কাছ থেকে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা সত্ত্বেও বার্ষিক ভোজে পরিবেশন করা খাবারের মান ও পরিমাণ কখনোই কাঙ্ক্ষিত বা আশানুরূপ পর্যায়ে থাকে না। বিপুলসংখ্যক আইনজীবী ভোজে অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত খাবার নিয়ে একধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়। আবেদনকারী এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বাজারে খাসির মাংসের অতিরিক্ত উচ্চমূল্যকে চিহ্নিত করেছেন।
খাসির মাংসের সংকট ও বাবুর্চিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
দাখিলকৃত আবেদনে বাজারের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি খাসির মাংসের গড় মূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা। মাংসের এই চড়া মূল্যের কারণে বার্ষিক ভোজে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। খাদ্য পরিবেশন শুরু হওয়ার পর দুই থেকে তিন ব্যাচ আইনজীবীদের খাবার দেওয়ার পরেই খাসির মাংসের ঘাটতি দেখা দেয় এবং পর্যাপ্ত মাংস সরবরাহ করা সম্ভব হয় না বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি আবেদনে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, বার্ষিক ভোজে অংশ নেওয়া তরুণ আইনজীবীরা যাতে বেশি পরিমাণে খাসির মাংস খেতে না পারেন, সেজন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বাবুর্চিরা খাবারে বিশেষ ধরনের খাদ্য-রাসায়নিক ব্যবহার করে থাকেন বলে শোনা যায়। খাবারের পর্যাপ্ততা না থাকা এবং এই ধরনের নানাবিধ অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছরই বিপুল অর্থ খরচ করেও সাধারণ সদস্যদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।
গরুর মাংস চালুর যৌক্তিকতা ও ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
সমস্যার সমাধান হিসেবে আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন ইসলাম ধর্মাবলম্বী আইনজীবীদের খাদ্যতালিকায় গরুর মাংস অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্যই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তাঁর মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অংশের কাছে গরুর মাংস অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাদ্য এবং খাসির মাংসের তুলনায় এর বাজারমূল্য তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম।
একটি সুনির্দিষ্ট খরচের উদাহরণ দিয়ে আবেদনে বলা হয়, ভোজে পরিবেশনের জন্য যদি প্রতিটি ২ লাখ টাকা মূল্যের ১০টি স্বাস্থ্যবান ষাঁড়গরু ক্রয় করা হয়, তবে মোট ব্যয় হবে প্রায় ২০ লাখ টাকা। এর ফলে একদিকে যেমন বার্ষিক ভোজে গরুর মাংসের পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে আয়োজনের সামগ্রিক ব্যয়ভার বহুলাংশে কমে আসবে। এ ছাড়া বারের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং আসন্ন বার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা যদি ভোজ উপলক্ষে অ্যাসোসিয়েশনকে গরু উপহার দিতে চান, তবে মাংস ক্রয়ের ক্ষেত্রে বারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয়ের পরিমাণ আরও কমে যাবে বলে তিনি মত দেন।
হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও নিরামিষভোজীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থার প্রস্তাব
সংখ্যাগরিষ্ঠদের জন্য গরুর মাংসের পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বী আইনজীবীদের ধর্মীয় অনুভূতি ও খাদ্যাভ্যাসের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন আবেদনকারী। আবেদনে হিন্দু ধর্মাবলম্বী আইনজীবীদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক জোন বা এলাকা নির্ধারণ করে সেখানে স্বাস্থ্যকর ও মানসম্মত খাসির মাংস পরিবেশনের সুস্পষ্ট ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
আইনজীবী মামুনের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের সামাজিক অনুষ্ঠান ও চিরায়ত ঐতিহ্যে সব সময় বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব খাদ্যাভ্যাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে পৃথক খাবারের ব্যবস্থা করার রীতি প্রচলিত রয়েছে। তিনি মনে করেন, এই ধরনের সম্মানজনক ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা প্রকৃতপক্ষে আবহমান বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরই বহিঃপ্রকাশ।
একই সঙ্গে তিনি নিরামিষভোজী আইনজীবী এবং হিন্দুধর্মের বৈষ্ণব রীতির অনুসারী সদস্যদের কথাও আবেদনে উল্লেখ করেন। তাঁদের জন্য অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন পরিবেশে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে উন্নতমানের নিরামিষ খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
সম্পাদক বরাবর চূড়ান্ত অনুরোধ
আবেদনের উপসংহারে মো. মাহমুদুল হাসান মামুন জোর দিয়ে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক ভোজের বিপুল খরচ নিয়ন্ত্রণ, খাবারের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং সবার জন্য তৃপ্তিদায়ক খাবারের নিশ্চয়তা দিতে খাদ্য তালিকায় এই সংস্কার আনা প্রয়োজন। তিনি ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য গরুর মাংস, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনায় খাসির মাংস এবং নিরামিষভোজীদের জন্য বিশেষ নিরামিষ খাবার নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদকের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেন।


