বরিশালে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় আইনজীবী সজল চক্রবর্তীর মৃত্যু: পরিকল্পিত হত্যা কি না খতিয়ে দেখার দাবি সহকর্মীদের
বরিশাল নগরে সকালে প্রাতর্ভ্রমণে বের হয়ে একটি বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় সজল কুমার চক্রবর্তী (৬০) নামের এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে নগরের প্রাণকেন্দ্র সদর রোড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। পথচারীরা তাঁকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকালের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত সজল কুমার চক্রবর্তী বরিশাল নগরের কালীবাড়ি রোড এলাকার বাসিন্দা এবং দক্ষিণা রঞ্জন চক্রবর্তীর ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও আকস্মিক মৃত্যুর খবরে বরিশাল জেলা আদালতপাড়ায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
পেছন থেকে মোটরসাইকেলের ধাক্কা ও হাসপাতালে মৃত্যু
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট মো. শাহ্ আলম জানান, বৃহস্পতিবার সকালে আইনজীবী সজল কুমার চক্রবর্তী প্রতিদিনের মতো হাঁটার জন্য বের হয়েছিলেন। তিনি সদর রোড ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় পেছন দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগতির মোটরসাইকেল তাঁকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার আঘাতে তিনি ছিটকে রাস্তায় পড়ে যান এবং তাঁর শরীরে ও মাথায় মারাত্মক জখম হয়।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন ও পথচারীরা দ্রুত এগিয়ে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে দ্রুত সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করার নির্দেশ দেন।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার জুয়েল চন্দ্র শীল জানান, বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে আইনজীবী সজল কুমার চক্রবর্তীকে গুরুতর ও মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছিল। কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সকাল ৮টার কিছু সময় পর তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরে তাঁর মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়। আইনি সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
নিছক দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড: সহকর্মীদের সন্দেহ
আইনজীবী সজল কুমার চক্রবর্তীর এমন আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী আইনজীবীরা। সহকর্মীদের অনেকের অভিযোগ, তিনি বেশ কিছু স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের জের ধরে কোনো পক্ষ পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
অ্যাডভোকেট মো. শাহ্ আলম বলেন, সজল কুমার চক্রবর্তী অত্যন্ত সততা ও দক্ষতার সঙ্গে আদালতে মামলা পরিচালনা করতেন। স্পর্শকাতর মামলা মোকাবিলার কারণে তাঁর কোনো শত্রু তৈরি হয়েছিল কি না অথবা এই দুর্ঘটনার পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তিনি নিছক কোনো সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন, নাকি এর পেছনে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে—তা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করতে হবে।
আইনজীবী নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন এবং দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
একজন আটক, মোটরসাইকেলচালককে গ্রেপ্তারের অভিযান
ঘটনার বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম জানান, পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনার পরপরই স্থানীয় জনতা মোটরসাইকেলে থাকা এক আরোহীকে হাতেনাতে আটক করে টহল পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে।
ওসি আরও জানান, আটক আরোহীকে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মোটরসাইকেলটি শনাক্ত করা হয়েছে এবং এর মূল চালককে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক দল অভিযান শুরু করেছে। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে কোতোয়ালি থানা পুলিশ নিশ্চিত করেছে।


