ন্যায়বিচারে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া: দেশে প্রথম ই-পারিবারিক আপিল আদালতের আনুষ্ঠানিক যাত্রা
বিচারপ্রক্রিয়াকে আধুনিক ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় রূপান্তর এবং দেশের সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিচার বিভাগে যুক্ত হলো নতুন এক মাইলফলক। দেশে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ‘ই-পারিবারিক আপিল আদালত ৩’ এবং নতুন ‘ই-পারিবারিক আদালত ১৪’। এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পারিবারিক বিরোধ সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি এবং আপিল শুনানিতে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বিচারসেবা এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করল।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সম্মেলনকক্ষে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে এই দুটি আদালতের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নতুন এই সেবাগুলোর উদ্বোধন ঘোষণা করেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিচার বিভাগের সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিশেষ সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
বিচার বিভাগের প্রযুক্তিগত রূপান্তরে যৌথ উদ্যোগের প্রশংসা
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, বিচার বিভাগকে আধুনিক প্রযুক্তিবান্ধব করতে গত বছর যে বিশেষ উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতের এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি বিচারিক কার্যক্রমকে প্রযুক্তিভিত্তিক করতে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আইনমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, “আপনাদের নিরন্তর সহযোগিতা ছাড়া বিচার বিভাগের এই অগ্রযাত্রায় হয়তো আরও সময় লাগত। আপনারা এগিয়ে এসেছেন বলেই আমরা কাজটি শুরু করতে পেরেছি এবং সেই উদ্যোগকে আরও বিকশিত করতে পেরেছি। এ জন্য আপনাদের বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।”
তিনি আরও যোগ করেন, বিচার বিভাগের এই রূপান্তর নিছক কোনো পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি বিচারিক সেবাকে আরও কার্যকর, দ্রুতগামী এবং সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। এ ধরনের উদ্ভাবনী উদ্যোগ দেশের বিচারিক কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত পরিসরে স্বয়ংক্রিয় এবং ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার একটি টেকসই পথ তৈরি করছে।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে অবদানের স্বীকৃতি
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খানের অবদানের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন। দেশের উচ্চশিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে গুণগত পরিবর্তন আনার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন রূপান্তরমূলক পদক্ষেপে সম্পৃক্ত থাকার জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান এবং ড. মো. সবুর খানের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন।
ই-বেইল বন্ড ও দূরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের ধারাবাহিকতা
আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা ও মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমানোর জন্য এরই মধ্যে ‘ই-বেইল বন্ড’ চালু করা হয়েছে, যার সুফল সাধারণ মানুষ ও বিচারপ্রার্থীরা প্রতিনিয়ত পাচ্ছেন। এর ফলে জামিন সংক্রান্ত আদেশ দ্রুত কার্যকর হচ্ছে এবং হয়রানি বহুলাংশে কমেছে।
একই সাথে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সাক্ষ্য গ্রহণ এবং আদালতে ভার্চুয়াল হাজিরা নিশ্চিত করার বিষয়ে বিদ্যমান আইনি কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা করেন তিনি। আইনমন্ত্রী জানান, এই প্রযুক্তিগত আইনি বিধানগুলোকে কীভাবে দেশের প্রতিটি প্রান্তে আরও সমন্বিত ও বিস্তৃত পরিসরে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে মন্ত্রণালয় সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিচারিক কাঠামোর প্রতিটি ধাপে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সংযোজন বিচার বিভাগের গতিশীলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনলাইনে মামলার তথ্য ও ভার্চুয়াল শুনানির সুবিধা
নতুন চালু হওয়া ‘ই-পারিবারিক আপিল আদালত ৩’ এবং ‘ই-পারিবারিক আদালত ১৪’-এর মাধ্যমে পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি উল্লেখযোগ্য হারে কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। নতুন এই কাঠামোর আওতায় বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা ঘরে বসেই মামলার সর্বশেষ অবস্থা ও আদেশ সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য অনলাইনে জানার সুযোগ পাবেন।
ই-আদালত ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সুবিধাগুলো হলো:
- ভার্চুয়াল শুনানি: বিচারপ্রার্থীরা সরাসরি আদালতে উপস্থিত না হয়েও দূরবর্তী স্থান থেকে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে মামলার কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন।
- কাগজবিহীন আদালত: প্রথাগত নথিপত্রের ব্যবহার কমিয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে মামলার যাবতীয় তথ্য, পিটিশন ও আদেশ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
- খরচ ও সময় সাশ্রয়: আদালতে নিয়মিত শারীরিক উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা কমে যাওয়ায় বিচারপ্রার্থীদের যাতায়াত খরচ ও সময় উভয়ই সাশ্রয় হবে।
- স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: মামলার অগ্রগতি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হওয়ায় বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও নিশ্চিত হবে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে পূর্ববর্তী সাফল্যের ধারাবাহিকতা
দেশে প্রথম ই-পারিবারিক আপিল আদালত চালুর ভিত্তি রচিত হয়েছিল ইতিপূর্বে পরিচালিত দুটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে। সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে ঢাকা ফ্যামিলি কোর্ট ৫ এবং একই বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে চট্টগ্রাম ফ্যামিলি কোর্ট ১-এ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কারিগরি সহায়তায় তৈরি বিশেষায়িত এই বিচারিক সফটওয়্যারের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
উক্ত দুটি আদালতে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ইতিবাচক প্রমাণিত হওয়ায় এবং বিচারিক কার্যক্রমে গতি আসায়, এবার আপিল পর্যায়েও এই ই-ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে বিচারিক সেবায় ডিজিটাল রূপান্তরের পরিধি নিম্ন আদালত থেকে আপিল আদালত পর্যন্ত একীভূত হলো।
বিনা মূল্যে এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার সরবরাহ
এই জাতীয় উদ্যোগে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তাদের নিজস্ব সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও গবেষকদের তৈরি এন্টারপ্রাইজ-গ্রেড সফটওয়্যারটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিচার বিভাগের ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে এই সফটওয়্যারটি তৈরি করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বিচার বিভাগের মতো স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো আধুনিকায়নেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ
রাজধানীর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
- লিয়াকত আলী মোল্লা, সচিব, আইন ও বিচার বিভাগ;
- মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী, রেজিস্ট্রার জেনারেল, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট;
- মো. রফিকুল ইসলাম, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ;
- অ্যাডভোকেট মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া, সভাপতি, ঢাকা আইনজীবী সমিতি;
- অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবুল কালাম খান, সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা আইনজীবী সমিতি।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারক, আইন ও বিচার বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আইনজীবী এবং বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. আর. কবির, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. শেখ রাশেদ হায়দার নূরী, আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. রিয়াদুজ্জামান, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক মো. মেসবাউল ইসলাম জিয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি কারিগরি দলের সদস্যরা।
দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এই প্রথম পারিবারিক আপিল আদালতকে পূর্ণাঙ্গ ই-আদালত হিসেবে চালুর মাধ্যমে নারী, শিশু এবং পারিবারিক বিরোধে জর্জরিত বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত, সাশ্রয়ী ও ভোগান্তিহীন বিচারিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলো।


