বিচারার্থে গ্রহণ করার ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট কোনো অপরাধের অভিযোগ আনীত হলে The Code of Criminal Procedure, 1898 অনুসারে উক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের করণীয় কী?
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২২: ফৌজদারি কার্যবিধি
প্রশ্ন: বিচারার্থে গ্রহণ করার ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট কোনো অপরাধের নালিশ (Complaint) আনীত হলে The Code of Criminal Procedure, 1898 অনুসারে উক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের করণীয় কি কি? সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহ ও নজিরসহ বিস্তারিত আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও নালিশের ধারণা
ফৌজদারি মামলায় বিচার শুরুর প্রধান দুটি প্রবেশদ্বার রয়েছে—একটি হলো থানায় এজাহার দায়েরের মাধ্যমে জি.আর মামলা এবং অপরটি হলো ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট সরাসরি নালিশি দরখাস্ত দাখিলের মাধ্যমে সি.আর মামলা (Complaint Register Case)। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর ধারা ৪(১)(জ) অনুযায়ী নালিশের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং ধারা ১৯০(১)(ক) অনুযায়ী উপযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেট অপরাধ আমলে গ্রহণ (Cognizance) করেন।
আমলে গ্রহণের ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট নালিশ দায়েরের পর পরবর্তী কার্যক্রম কার্যবিধির ষোড়শ অধ্যায়ের ধারা ২০০ হতে ২০৪-এ ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
২. ধারা ২০০: বাদীর শপথপূর্বক জবানবন্দি গ্রহণ (Examination of Complainant)
ফৌজদারি কার্যবিধির ২০০ ধারা অনুযায়ী নালিশ পাওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেটের প্রথম ও বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হলো:
- শপথপূর্বক পরীক্ষা: ম্যাজিস্ট্রেট অবিলম্বে নালিশকারীকে এবং আদালতে উপস্থিত কোনো সাক্ষী থাকলে তাদেরকে শপথপূর্বক পরীক্ষা করবেন।
- সারসংক্ষেপ লিপিবদ্ধকরণ: উক্ত পরীক্ষার সারমর্ম (Substance of examination) লিখিত আকারে লিপিবদ্ধ করবেন।
- স্বাক্ষর গ্রহণ: লিখিত জবানবন্দিতে নালিশকারী ও উপস্থিত সাক্ষীদের স্বাক্ষর গ্রহণ করবেন এবং ম্যাজিস্ট্রেট নিজেও তাতে স্বাক্ষর প্রদান করবেন।
২০০ ধারার ব্যতিক্রম: সরকারি কর্মচারী কর্তৃক দায়িত্ব পালনকালে লিখিত নালিশ দাখিল করা হলে অথবা আদালত কর্তৃক নালিশ করা হলে (যেমন ধারা ১৯৫ ও ৪৭৬) বাদীকে শপথপূর্বক পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয় না।
৩. ধারা ২০২: পরোয়ানা জারি স্থগিত ও তদন্তের নির্দেশ (Postponement of Process)
যদি নালিশ ও ২০০ ধারার জবানবন্দি শুনে ম্যাজিস্ট্রেটের মনে কোনো সন্দেহ দেখা দেয় এবং তিনি তাৎক্ষণিকভাবে আসামির বিরুদ্ধে সমন বা ওয়ারেন্ট জারি করা সমীচীন মনে না করেন, তবে তিনি ধারা ২০২ অনুযায়ী—
- আসামির বিরুদ্ধে প্রসেস বা পরোয়ানা জারি স্থগিত রাখবেন; এবং
- অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট নিজে অনুসন্ধান (Inquiry) করবেন অথবা কোনো অধস্তন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কর্মকর্তা বা উপযুক্ত ব্যক্তিকে তদন্ত (Investigation) করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিবেন।
৪. ধারা ২০৩: নালিশ খারিজের ক্ষমতা (Dismissal of Complaint)
ম্যাজিস্ট্রেট যদি বাদীর জবানবন্দি এবং ২০২ ধারার তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে আসামির বিরুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার মতো “যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই” (No sufficient ground for proceeding), তবে তিনি নালিশটি সরাসরি খারিজ (Dismiss) করবেন।
কঠোর শর্ত: নালিশ খারিজ করতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটকে নথিতে আদেশের পেছনে সুস্পষ্ট কারণ সংক্ষিপ্ত আকারে লিপিবদ্ধ করতে হবে।
৫. ধারা ২০৪: প্রসেস বা তলবনামা জারি (Issue of Process)
যদি ম্যাজিস্ট্রেট সন্তুষ্ট হন যে আসামির বিরুদ্ধে মামলার বিচার শুরুর যথেষ্ট উপাদান রয়েছে, তবে তিনি ধারা ২০৪ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিবেন:
- সমন জারি (Summons): ২য় তফসিলে অপরাধটি যদি প্রথম দৃষ্টে সমনযোগ্য মামলা (Summons case) হয়, তবে আসামিকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করবেন।
- পরোয়ানা জারি (Warrant): অপরাধটি যদি পরোয়ানাযোগ্য (Warrant case) হয়, তবে আদালত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অথবা উপযুক্ত মনে করলে সমন জারি করবেন।
৬. ২০৩ ধারায় নালিশ খারিজ হলে বাদীর প্রতিকার ও নারাজি পিটিশন
ম্যাজিস্ট্রেট যদি ২০৩ ধারায় নালিশ খারিজ করে দেন, তবে সংক্ষুব্ধ নালিশকারীর জন্য দুটি আইনি প্রতিকার উন্মুক্ত থাকে:
- দায়রা জজ বা হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন (Revision under Section 436 & 439A): দায়রা জজ আদালত ২০৩ ধারার খারিজ আদেশ বেআইনি মনে করলে অতিরিক্ত অনুসন্ধানের (Further inquiry) নির্দেশ দিয়ে মোকদ্দমা রিমান্ডে পাঠাতে পারেন।
- নারাজি পিটিশন (Naraji Petition): তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি আসামিদের অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন, তবে বাদী উক্ত রিপোর্টের বিরুদ্ধে নারাজি পিটিশন দাখিল করতে পারেন, যা ম্যাজিস্ট্রেট নতুন নালিশ হিসেবে বিবেচনা করে পুনঃশুনানি গ্রহণ করবেন।
৭. উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী নজিরসমূহ
- নুরুল হক বনাম রাষ্ট্র (39 DLR (AD) 166): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, ধারা ২০০ অনুযায়ী বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করা আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক; এটি ছাড়া প্রসেস জারি বা খারিজ করা এখতিয়ার বহির্ভূত।
- আজিজুর রহমান বনাম মকবুল হোসেন (45 DLR 280): ২০৩ ধারায় নালিশ খারিজ করতে হলে বিচারিক মন প্রয়োগ (Judicial mind) করে কারণ উল্লেখ করতে হবে; নিছক দায়সারা আদেশে নালিশ খারিজ অবৈধ।
- মোশাররফ হোসেন বনাম রাষ্ট্র (49 DLR 332): নারাজি দরখাস্ত দাখিলের পর তা ২০০ ধারার জবানবন্দির ন্যায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে হবে।
৮. উপসংহার
ফৌজদারি কার্যবিধির ২০০ হতে ২০৪ ধারার বিন্যাস বিচার প্রশাসনের ভারসাম্য রক্ষা করে। এটি একদিকে যেমন নিরপরাধ নাগরিককে মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা থেকে ২০২ ও ২০৩ ধারার সুরক্ষাকবচ দেয়, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করতে ২০৪ ধারায় আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত করায়।
৪. নালিশি মামলায় ম্যাজিস্ট্রেটের প্রাথমিক বিচারিক অনুসন্ধান ও আইনি পর্যালোচনা
ফৌজদারি কার্যবিধির ২০০ ধারায় অভিযোগকারীর জবানবন্দি গ্রহণের পর বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট যদি মামলার বিষয়ে নিশ্চিত হতে না পারেন, তবে তিনি নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নিতে পারেন:
- অনুসন্ধান বা তদন্তের নির্দেশ (ধারা ২০২): ম্যাজিস্ট্রেট স্বয়ং বিচারিক অনুসন্ধান পরিচালনা করতে পারেন অথবা কোনো প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন;
- অভিযোগ খারিজ (ধারা ২০৩): জবানবন্দি ও অনুসন্ধানের ফলাফলে যদি কোনো অপরাধের প্রাথমিক উপাদান না পাওয়া যায়, তবে ম্যাজিস্ট্রেট সংক্ষিপ্ত কারণ লিপিবদ্ধপূর্বক নালিশটি খারিজ করতে পারেন;
- সমন বা ওয়ারেন্ট ইস্যু (ধারা ২০৪): প্রাথমিক সাক্ষ্যে অপরাধ সংগঠনের যৌক্তিক কারণ থাকলে আসামির প্রতি সমন বা পরোয়ানা জারি করে মামলার মূল বিচারিক কার্যক্রম শুরু করবেন।
৫. ২০৩ ধারার খারিজের বিরুদ্ধে রিভিশন ও সুপ্রিম কোর্টের নজির
সুপ্রিম কোর্ট (শাহজাহান বনাম রাষ্ট্র, 43 DLR 190) মামলায় সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, ২০৩ ধারায় নালিশ খারিজের আদেশ কোনো চূড়ান্ত বিচারিক খালাস নয়। সংক্ষুব্ধ বাদী বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৬ ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত তদন্তের জন্য রিভিশন দায়ের করতে পারেন অথবা যথাযথ উপাদান প্রাপ্তিসাপেক্ষে নতুন নালিশ দাখিল করতে পারেন।

