অনুপস্থিত থেকে ও সাদা খাতা দিয়ে রিভিউ আবেদন: বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় দুই প্রার্থী আজীবন নিষিদ্ধ
অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির (এনরোলমেন্ট) লিখিত পরীক্ষায় সম্পূর্ণ সাদা খাতা জমা দেওয়া এবং পরীক্ষায় পুরোপুরি অনুপস্থিত থেকেও ফলাফল পুনর্বিবেচনা বা রিভিউ আবেদন করার দায়ে দুই শিক্ষানবিশ আইনজীবীকে আজীবন বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। তাঁদের বিরুদ্ধে চরম জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ এনে বার কাউন্সিলের ভবিষ্যতের সব ধরনের পরীক্ষা থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ (ডিবার) ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সচিব (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ কামাল হোসেন শিকদার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে (স্মারক নং-বিবিসি/এনরোল/২০২৬/২৭৯৩) আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এনরোলমেন্ট কমিটির গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখের সভার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রতারণার নেপথ্য ঘটনা ও কারণ দর্শানোর নোটিশ
বার কাউন্সিলের বিজ্ঞপ্তির তথ্যানুযায়ী, বিগত ২৮ জুন ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট লিখিত পরীক্ষায় মুহাম্মদ সাইফুল আমিন নামের এক পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে সম্পূর্ণ সাদা খাতা জমা প্রদান করেন। অন্যদিকে, এম. আর. আকাশ নামের অপর এক পরীক্ষার্থী উক্ত লিখিত পরীক্ষায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিলেন। তবে পরবর্তীতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে এবং উত্তরপত্রে কোনো কিছু না লিখেও উভয়েই ফলাফল রিভিউ করার জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় লিখিত আবেদন দাখিল করেন।
পরবর্তী সময়ে খাতা পুনর্নিরীক্ষণ কার্যক্রমে বিষয়টি বার কাউন্সিলের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এনরোলমেন্ট কমিটির সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী গত ২৩ জুন ২০২৬ তারিখে অভিযুক্ত দুই প্রার্থীর কাছেই লিখিত কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ প্রেরণ করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থীরা উক্ত নোটিশের লিখিত জবাব দাখিল করেন। তবে এনরোলমেন্ট কমিটির ১৩ আগস্টের সভায় দাখিলকৃত সেই জবাবগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য, বাস্তবতা বিবর্জিত ও খামখেয়ালীপূর্ণ আখ্যা দিয়ে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়।
কমিটির সিদ্ধান্ত ও নীতিগত পর্যবেক্ষণ
এনরোলমেন্ট কমিটির সদস্যরা বিজ্ঞপ্তিতে কড়া অভিমত প্রকাশ করে জানান, পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকা এবং সম্পূর্ণ সাদা খাতা জমা দেওয়ার পরও ফলাফলের রিভিউ দাবি করার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা দেশের আইনজীবীদের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্থা—বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সঙ্গে অত্যন্ত সচেতনভাবে প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে এনরোলমেন্ট কমিটির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলা হয়-
“এহেন শিক্ষানবিশ প্রার্থীদের আইনজীবী সনদ প্রাপ্তির কোনো নৈতিক অধিকার থাকতে পারে না এবং আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হলে তারা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আইনি সেবা পাওয়ার অধিকারকে বিনষ্ট করে আইন অঙ্গনকে কলুষিত করার প্রয়াস রাখবে। আইন পেশার উচ্চ মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখার স্বার্থে এহেন প্রতারক পরীক্ষার্থীদের অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির পরীক্ষা থেকে স্থায়ীভাবে বারিত করে ভবিষ্যতে যেকোনো প্রার্থীকে এরূপ ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করতে কঠোর বার্তা প্রেরণ করা সমীচীন।”
আজীবন নিষিদ্ধ হওয়া প্রার্থীদের পরিচয় ও অভিযোগের বিবরণ
বার কাউন্সিলের বিজ্ঞপ্তিতে স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত হওয়া দুই প্রার্থীর পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। আজীবন নিষিদ্ধ হওয়া প্রার্থীরা হলেন-
১. মুহাম্মদ সাইফুল আমিন
রোল নং- ২৬৯৩৭/সাল ২০২৫, রেজিস্ট্রেশন নং- 202256894, পিতা: মুহাম্মদ রুহুল আমিন, সাং: শমসেরাবাদ, থানা: লক্ষ্মীপুর সদর, জেলা: লক্ষ্মীপুর।
অভিযোগ: বার কাউন্সিলের আইনজীবী তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সম্পূর্ণ সাদা খাতা জমা দিয়েও পরবর্তীতে নিজের ফলাফলের রিভিউ দাবি করে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছিলেন তিনি।
২. এম.আর. আকাশ
রোল নং- ৮৪২০৫/সাল ২০২৫, রেজিস্ট্রেশন নং- 202108348, পিতা: মোঃ সাইদুল ইসলাম, সাং: হোসেনপুর নর্থ, থানা: সিরাজগঞ্জ সদর, জেলা: সিরাজগঞ্জ।
অভিযোগ: উক্ত লিখিত পরীক্ষায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থেকেও প্রতারণামূলকভাবে পরবর্তীতে ফলাফল রিভিউ চেয়ে আবেদন দাখিল করেন তিনি।
আইন পেশার মর্যাদা রক্ষার বার্তা
আইন পেশার মর্যাদা, ভাবমূর্তি ও পেশাগত নৈতিকতার উচ্চ মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রাখতেই এনরোলমেন্ট কমিটি সর্বসম্মতভাবে এই চূড়ান্ত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বার কাউন্সিলের বিজ্ঞপ্তির অনুলিপি সংশ্লিষ্ট দুই প্রার্থীসহ দেশের সকল প্রয়োজনীয় ও জরুরি প্রশাসনিক মহলে কার্যার্থে এবং জ্ঞাতার্থে প্রেরণ করা হয়েছে। বার কাউন্সিল সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইন অঙ্গনকে কলুষমুক্ত রাখতে এবং ভবিষ্যৎ পরীক্ষার্থীদের জন্য কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেই এই জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখা হবে।

