দোষস্বীকারোক্তির আইনি ব্যবচ্ছেদ নিয়ে বিচারক শিহাবুল ইসলামের গ্রন্থ ‘ল অব কনফেশন’
ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো আসামির ‘দোষস্বীকারোক্তি’ বা কনফেশন (Confession) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর একটি বিষয়। একটিমাত্র স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে যেমন কোনো ব্যক্তির চূড়ান্ত দণ্ড নির্ধারিত হতে পারে, তেমনি আইনি ব্যত্যয় ঘটলে তা নিরপরাধ ব্যক্তির জীবন ও মর্যাদাকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এই জটিল আইনি বিষয়টির চুলচেরা বিশ্লেষণ ও ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বিচারক শিহাবুল ইসলামের বিশদ গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘LAW OF CONFESSION’ (ল অব কনফেশন)।
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তা জনাব শিহাবুল ইসলামের রচিত এটিই প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। ইংরেজি ভাষায় রচিত ৩৫৮ পৃষ্ঠার এই তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক গ্রন্থে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় তিন শতাধিক বিচারিক নজির এবং ফৌজদারি কার্যবিধির জটিল দিকগুলো সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। গ্রন্থটির মূল্যায়ন করতে গিয়ে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিশেষ জজ (সিনিয়র জেলা জজ) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বইটিকে দেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সবার জন্য একটি অনন্য ও প্রামাণ্য সংযোজন হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিচার ব্যবস্থায় দোষস্বীকারোক্তির গুরুত্ব ও বইটির প্রেক্ষাপট
ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত অংশীজনদের কাছে ‘কনফেশন’ অত্যন্ত নিত্যনৈমিত্তিক কিন্তু গভীর আইনি তাৎপর্যবাহী একটি প্রত্যয়। প্রতিদিনের বিচারিক কর্মযজ্ঞে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার জন্য উপযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করেন। বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটকে দেখতে হয় জবানবন্দিটি কোনো ধরনের প্ররোচনা, ভয়ভীতি বা বলপ্রয়োগ ছাড়া স্বেচ্ছায় দেওয়া হচ্ছে কি না। অন্যদিকে, শুনানির পর্যায়ে বিজ্ঞ আইনজীবীরা সেই জবানবন্দির সত্যতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে বিতর্ক তোলেন কিংবা তা প্রত্যাহারের আবেদন করেন। শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞ বিচারককে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি মানদণ্ড বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে জবানবন্দিটির ওপর ভিত্তি করে দণ্ডাদেশ প্রদান করা সমীচীন হবে, নাকি আসামিকে নির্দোষ বিবেচনা করে খালাস দিতে হবে।
আইনের এমন এক মৌলিক ভিত্তির ওপর বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে পূর্ণাঙ্গ, প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত (systematic) রেফারেন্স বইয়ের অভাব অনুভূত হচ্ছিল। সিনিয়র জেলা জজ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে দেশে একটি স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বইয়ের যে শূন্যতা ছিল, শিহাবুল ইসলামের এই গ্রন্থটি সেই দীর্ঘদিনের চাহিদা অনেকাংশেই পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে।
গ্রন্থের বিষয়বস্তু: তত্ত্ব, দর্শন ও বিচারিক নজিরের সমন্বয়
বইটিতে দোষস্বীকারোক্তির তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি এর ঐতিহাসিক বিবর্তন, দার্শনিক ভিত্তি, গ্রহণযোগ্যতা এবং সাক্ষ্যগত মূল্যকে সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় স্বীকারোক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন কোন দিক বিচারিক দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য এবং কোন কোন কারণে তা আদালতের কাছে অগ্রহণযোগ্য বা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে, সে সম্পর্কে বিশদ আলোচনা রয়েছে এতে।
গ্রন্থের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ হলো:
- সাংবিধানিক ও মানবাধিকারের দিক: বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক সুরক্ষা, মৌলিক অধিকার এবং ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারের বিশদ পর্যালোচনা।
- স্বেচ্ছাপ্রণোদনার পরীক্ষা (Voluntariness): একটি স্বীকারোক্তি প্রকৃতপক্ষে স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের আইনি ও বাস্তবসম্মত পরামিতি।
- ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব ও জবানবন্দি গ্রহণের আইনি কাঠামো: পুলিশি হেফাজত থেকে আদালতে উপস্থাপনের পর আইন নির্ধারিত সতর্কতা অবলম্বন এবং প্রয়োজনীয় সময় প্রদান সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা।
- উপমহাদেশের প্রায় ৩০০ বিচারিক নজির: বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের উচ্চ আদালতের প্রায় তিন শত নজির (Precedents) বিশ্লেষণ করে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে আইনি নীতির যথাযথ প্রয়োগে দোষী ব্যক্তিকে দণ্ড দেওয়া সম্ভব এবং একই সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ বা জোরপূর্বক আদায় করা স্বীকারোক্তি খারিজ করে নিরপরাধ ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়া যায়।
“বইটিতে দোষস্বীকারোক্তি (Confession) সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়কে যেভাবে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে লেখক বইটিকে তাঁর জ্ঞান-অনুরাগের ‘প্রথম প্রেম’ গণ্য করে পাঠকের জন্য উপভোগ্য করার প্রাণান্তর চেষ্টা করেছেন। ইংরেজি ভাষায় লেখা হলেও বইটির ভাষা সরল, প্রাঞ্জল ও সহজবোধ্য। জেলা জজ পদমর্যাদার বিচারক জনাব শিহাবুল ইসলাম তাঁর লেখায় যেমন Confession-এর তাত্ত্বিক দিক তুলে ধরেছেন, তেমনি তাঁর বিচারিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার অসাধারণ প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।”
আইন জগতের দিকপালদের মূল্যায়ন
গ্রন্থটিতে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি জনাব হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর লেখা ভূমিকা বা মুখবন্ধ (Foreword)। বিচার বিভাগের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালনকারী একজন বিদগ্ধ আইনবিদের ইতিবাচক মূল্যায়ন বইটির গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতাকে সুদৃঢ় করেছে।
পর্যালোচনায় বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন আরও উল্লেখ করেন, নেভি-ব্লু রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডে সোনালি হরফে বাঁধানো বইটির প্রচ্ছদ যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি ভেতরের রচনার গভীরতা ও বিশ্লেষণের বস্তুনিষ্ঠতাও অনন্য। তিনি বলেন, “কথায় আছে, ‘আগে তো দর্শনধারী, তারপরে না হয় গুণ বিচারী।’ হ্যাঁ, প্রথম দেখায় বইটির প্রচ্ছদ আমার মন কেড়ে নিল। কিন্তু বইটি পড়তে শুরু করার পর উপলব্ধি হলো, এর আকর্ষণ শুধু প্রচ্ছদে সীমাবদ্ধ নয়; বিষয়বস্তু, বিশ্লেষণ, উপস্থাপনা এবং লেখকের চিন্তার গভীরতাই বইটির প্রকৃত সৌন্দর্য।”
আইন বিষয়ের শিক্ষার্থী, গবেষক, শিক্ষক, আইনজীবী, বিচারক এবং ফৌজদারি বিচার প্রশাসন নিয়ে কর্মরত যে কারও জন্য বইটি একটি অপরিহার্য হ্যান্ডবুক হিসেবে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আইন গ্রন্থাগারেও এটি সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে স্থান পাওয়ার যোগ্য।
বইটির প্রকাশনা ও প্রাপ্তিস্থান
আইন বিষয়ক প্রকাশনা সংস্থা ‘বুনইয়ান পাবলিকেশন্স’ থেকে প্রকাশিত LAW OF CONFESSION গ্রন্থটির নির্ধারিত মূল্য রাখা হয়েছে ৮০০ টাকা, তবে কমিশন মূল্যে এটি ৫০০ টাকায় সংগ্রহ করা যাচ্ছে।
বইটি দেশের প্রধান প্রধান আইন বই বিপণন কেন্দ্রগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে:
- আমিন বুক হাউজ
- ইউনিভার্সাল বুক হাউজ
- রহিম ল বুক হাউজ
- শামিম ল বুক হাউজ
- মিঠু ল বুক হাউজ
এছাড়া প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বুনইয়ান পাবলিকেশন্সের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করে সরাসরি ক্রয়ের সুবিধাও রাখা হয়েছে (মোবাইল নম্বর: ০১৯০৭৩৫০৮৯৬)।
আইনাঙ্গনের বিশিষ্টজনরা প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন যে, প্রথম গ্রন্থেই যে নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও গভীর গবেষণার স্বাক্ষর বিচারক শিহাবুল ইসলাম রেখেছেন, আগামী দিনেও তা অব্যাহত থাকবে এবং তাঁর লেখনী দেশের আইন সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

