জালিয়াতি করে মিথ্যা মামলা: স্বামীর চার বছরের কারাদণ্ড

বরগুনার আমতলীতে স্ত্রীকে ফাঁসাতে অন্য নারীকে স্ত্রী সাজিয়ে ভুয়া পরিচয়ে মামলা দায়ের ও স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগে সোহেল মাতুব্বর নামের এক ব্যক্তিকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দণ্ডবিধির পৃথক তিনটি ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে বিজ্ঞ আদালত এই সাজা প্রদান করেন।

আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিজ্ঞ বিচারক ইফতি হাসান ইমরান সামারি ট্রায়াল বা সংক্ষিপ্ত বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এ যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। সাজাপ্রাপ্ত সোহেল মাতুব্বর পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার চম্পাপুর ইউনিয়নের চালিতাবুনিয়া গ্রামের নান্নু মাতুব্বরের ছেলে।

পারিবারিক বিরোধ থেকে ঘটনার সূত্রপাত

মামলা ও আদালত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বরগুনার আমতলী উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের পুজাখোলা গ্রামের বাসিন্দা সান্টু মৃধার মেয়ে কুলসুম বেগমের সঙ্গে প্রায় ১১ বছর আগে সোহেল মাতুব্বরের পারিবারিকভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয়। বৈবাহিক জীবনের একটি পর্যায়ে এসে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে যৌতুক দাবিকে কেন্দ্র করে তীব্র পারিবারিক বিরোধের সৃষ্টি হয়।

উক্ত বিরোধের ধারাবাহিকতায় কুলসুম বেগম নিজের আইনগত অধিকার রক্ষায় বাধ্য হয়ে ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল কলাপাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন। স্বামী সোহেল মাতুব্বরসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারায় দায়ের করা সেই মামলাটির নম্বর ছিল সিআর ৩২৫/২০২৫।

আদালতকে বিভ্রান্ত করতে জালিয়াতির আশ্রয়

আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিজের বিরুদ্ধে চলমান যৌতুক মামলাটি নস্যাৎ করা এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে সোহেল মাতুব্বর এক সুদূরপ্রসারী জালিয়াতির পরিকল্পনা করেন। তিনি অন্য এক অজ্ঞাত নারীকে তাঁর প্রকৃত স্ত্রী কুলসুম বেগম সাজিয়ে তাঁর নাম ও পিতার নাম হুবহু ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে কুলসুম বেগমের ভুয়া স্বাক্ষর তৈরি ও জাল করে নতুন একটি মামলার ক্ষেত্র তৈরি করেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার দাসের হাওলা গ্রামের বাসিন্দা জালাল রাঢ়ীর ছেলে মো. জুয়েল রাঢ়ীকে কুলসুম বেগমের দ্বিতীয় স্বামী হিসেবে দেখানো হয়। এরপর ওই সাজানো কুলসুম বেগমকে বাদী বানিয়ে জুয়েল রাঢ়ীর বিরুদ্ধে আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আরও একটি সাজানো যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়, যার মামলা নম্বর সিআর ১৭৮১/২০২৬।

দুই স্বামী দেখিয়ে প্রতারণার কৌশল

অভিযোগে জানা যায়, আমতলী আদালতে ভুয়া পরিচয়ে মামলা দায়েরের পর সোহেল মাতুব্বর অত্যন্ত ধূর্ততার সঙ্গে ওই মামলার সত্যায়িত নকল বা সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে তিনি সেই কাগজপত্র কলাপাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন তাঁর নিজের সিআর ৩২৫/২০২৫ নম্বর মামলায় প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।

সোহেল মাতুব্বর আদালতের সামনে এমন একটি বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালান যে, তাঁর স্ত্রী কুলসুম বেগম একই সঙ্গে দুজন স্বামীর সঙ্গে সংসার পরিচালনা করছেন এবং তাঁর চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ। এর ফলে কলাপাড়া আদালতে বিচারাধীন যৌতুক মামলাটির গুরুত্ব নষ্ট করার অপচেষ্টা চালানো হয়।

তবে এই জালিয়াতির ঘটনাটি একপর্যায়ে কুলসুম বেগমের নজরে আসে। তিনি বিষয়টি জানতে পেরে ২০২৬ সালের ৪ নভেম্বর আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হন এবং সিআর ১৭৮১/২০২৬ নম্বর মামলার ভুয়া বাদীর পরিচয় ও জালিয়াতির প্রতিকার চেয়ে একটি লিখিত দরখাস্ত দাখিল করেন।

সংক্ষিপ্ত বিচারে তিন ধারায় রায় ঘোষণা

আদালত কুলসুম বেগমের দরখাস্তটি গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেন এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন। একই সঙ্গে বিজ্ঞ বিচারক সংশ্লিষ্ট যাবতীয় নথি, মামলার আরজি, ওকালতনামা ও স্বাক্ষর গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই করেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানে প্রকাশ পায় যে, কুলসুম বেগম ওই মামলাটি আদৌ দায়ের করেননি; বরং সোহেল মাতুব্বর অন্য এক নারীকে বাদী সাজিয়ে ও ভুয়া স্বাক্ষর তৈরি করে আদালতে প্রতারণামূলক নথি দাখিল করেছেন।

আদালতের নথিপত্রে জালিয়াতি এবং বিচার বিভাগের সঙ্গে প্রতারণার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিচারক তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধটি আমলে নেন। এরপর সামারি ট্রায়াল বা সংক্ষিপ্ত বিচারপদ্ধতি অনুসরণ করে সোহেল মাতুব্বরের বিরুদ্ধে সরাসরি সাজা ঘোষণা করা হয়।

রায়ে বিচারক দণ্ডবিধির পৃথক তিনটি ধারায় সোহেল মাতুব্বরকে দোষী সাব্যস্ত করেন। এর মধ্যে:

  • দণ্ডবিধির ৪৬৫ ধারায় জালিয়াতির অপরাধে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড,
  • দণ্ডবিধির ৪৭১ ধারায় জাল নথি খাঁটি হিসেবে ব্যবহারের অপরাধে ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, এবং
  • দণ্ডবিধির ৪১৭ ধারায় প্রতারণার অপরাধে আরও ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

সব মিলিয়ে সোহেল মাতুব্বরকে মোট চার বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. আবু বকর মোল্লা আদালতের এই কারাদণ্ডের আদেশ প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া

এদিকে জালিয়াতির বিরুদ্ধে আদালতের এমন তাৎক্ষণিক ও কঠোর পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীরা। তাঁদের মতে, বিচার ব্যবস্থাকে অপব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এবং আদালতকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা বন্ধে এই রায় একটি কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মিথ্যা মামলা ও জালিয়াতির মতো অপরাধ দমনে আদালতের এমন ন্যায়ানুগ পদক্ষেপ সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমাতে সহায়ক হবে।

Related Articles

Back to top button