ভুয়া বাদী সাজিয়ে স্বাক্ষর জাল

বরগুনার আমতলীতে অন্য এক নারীকে প্রকৃত স্ত্রী সাজিয়ে তাঁর নাম ও পিতার নাম ব্যবহার করে স্বাক্ষর জাল এবং আদালতে মিথ্যা মামলা দায়েরের ঘটনায় সোহেল মাতুব্বর নামে এক ব্যক্তিকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দণ্ডবিধির পৃথক তিনটি ধারায় তাঁকে এ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বুধবার (৪ নভেম্বর) আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ইফতি হাসান ইমরান সামারি ট্রায়াল বা সংক্ষিপ্ত বিচারপ্রক্রিয়ায় এ রায় ঘোষণা করেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত সোহেল মাতুব্বর পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার চম্পাপুর ইউনিয়নের চালিতাবুনিয়া গ্রামের নান্নু মাতুব্বরের ছেলে।

যেভাবে জালিয়াতির আশ্রয় নেন সোহেল

আদালত সূত্রে জানা যায়, বরগুনার আমতলী উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের পুজাখোলা গ্রামের সান্টু মৃধার মেয়ে কুলসুম বেগমের সঙ্গে প্রায় ১১ বছর আগে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার চম্পাপুর ইউনিয়নের চালিতাবুনিয়া গ্রামের সোহেল মাতুব্বরের বিয়ে হয়। পরবর্তী সময়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌতুক দাবি নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়।

এর জেরে কুলসুম বেগম বাদী হয়ে ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল কলাপাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বামী সোহেল মাতুব্বরসহ অন্যদের বিরুদ্ধে যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটির নম্বর সিআর ৩২৫/২০২৫।

আদালত সূত্রের বরাতে জানা যায়, ওই মামলাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে সোহেল মাতুব্বর জালিয়াতির আশ্রয় নেন। তিনি অন্য এক নারীকে কুলসুম বেগম সাজিয়ে তাঁর নাম ও পিতার নাম ব্যবহার করেন এবং কুলসুম বেগমের স্বাক্ষর জাল করেন। এরপর পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার দাসের হাওলা গ্রামের জালাল রাঢ়ীর ছেলে মো. জুয়েল রাঢ়ীকে কুলসুম বেগমের স্বামী দেখিয়ে আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি যৌতুক মামলা দায়ের করান। মামলাটির নম্বর সিআর ১৭৮১/২০২৬।

দুই স্বামী দেখিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা

অভিযোগ অনুযায়ী, সোহেল মাতুব্বর ওই মামলার সত্যায়িত নকল সংগ্রহ করে কলাপাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন সিআর ৩২৫/২০২৫ নম্বর মামলায় উপস্থাপন করেন।

এর মাধ্যমে কুলসুম বেগমের দুজন স্বামী রয়েছেন এবং তিনি একই সময়ে দুজন স্বামীর সঙ্গে সংসার করছেন, এমন ধারণা আদালতের সামনে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন সোহেল মাতুব্বর।

পরবর্তী সময়ে বিষয়টি জানতে পেরে কুলসুম বেগম ২০২৬ সালের ৪ নভেম্বর আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর ১৭৮১/২০২৬ নম্বর মামলার বিষয়ে একটি দরখাস্ত দাখিল করেন।

সামারি ট্রায়ালে তিন ধারায় চার বছরের কারাদণ্ড

দরখাস্ত পাওয়ার পর আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করেন।

এতে মামলার বাদী সাজানো, স্বাক্ষর জাল ও আদালতে জাল নথি ব্যবহার করে প্রতারণার বিষয়টি প্রমাণিত হয় বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

এরপর আদালত অপরাধটি আমলে নিয়ে সামারি ট্রায়াল পরিচালনা করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে দণ্ডবিধির তিনটি পৃথক ধারায় সোহেল মাতুব্বরকে সাজা দেওয়া হয়। এর মধ্যে দণ্ডবিধির ৪৬৫ ধারায় দুই বছর, ৪৭১ ধারায় এক বছর এবং ৪১৭ ধারায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে তাঁর মোট কারাদণ্ডের পরিমাণ চার বছর।

আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. আবু বকর মোল্লা এ রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে, আদালতের দ্রুত বিচারিক পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, আদালতকে বিভ্রান্ত করতে জালিয়াতি ও মিথ্যা মামলার আশ্রয় নেওয়ার ঘটনায় এমন বিচারিক পদক্ষেপ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে এটি একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে।

Related Articles

Back to top button