মামলা স্থগিতের ১০ ধারার ৩টি শর্ত পূরণ না হলে স্টে নয়: পাশাপাশি শুনানিতে হাইকোর্টের রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ডিভিশন বেঞ্চ দেওয়ানী কার্যবিধির ১০ ধারায় মামলা স্থগিত (Stay of Suit under Section 10 CPC) এবং ২২ আদেশের ৪(৩) বিধিতে মোকদ্দমা তামাদি বা বিলোপ (Abatement of Suit) সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ রিভিশন মামলায় সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, দেওয়ানী কার্যবিধির ১০ ধারার আবশ্যিক ৩টি শর্তের কোনো একটিও অনুপস্থিত থাকলে পরবর্তী মোকদ্দমার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করা সম্পূর্ণ বেআইনি। দুই মামলার বিচার্য বিষয়, তফসিলভুক্ত জমি এবং পক্ষগণ সম্পূর্ণ এক না হলে পরবর্তী মামলা স্থগিত না করে আদালতের সহজাত ক্ষমতা (Section 151 CPC) প্রয়োগ করে উভয় মোকদ্দমার ‘পাশাপাশি শুনানি’ (Simultaneous Trial) পরিচালনাই সংঘাতহীন ন্যায়বিচারের একমাত্র বিধান। একইসঙ্গে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন যে, মামলা চলাকালে কোনো বিবাদী মারা যাওয়ার পর আরজি থেকে তার নাম কর্তন (Struck out) করা হলে ২২ আদেশের ৪(৩) বিধির অধীন পুরো মোকদ্দমা অ্যাবেট (Abate) হওয়ার কোনো অবকাশ থাকে না।
মামলাটি চট্টগ্রাম জেলার ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ২০০৪ সালে দায়েরকৃত স্বত্ব মোকদ্দমা Other Class Suit No. 152 of 2004 থেকে উদ্ভূত। মামলার মূল বাদী ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, চট্টগ্রাম।
মামলার মূল প্রেক্ষাপট ও ঘটনাবলী নিম্নরূপ:
- কলেজ কর্তৃপক্ষের স্বত্ব মামলা: হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ কর্তৃপক্ষ ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, চট্টগ্রামে ২০০৪ সালে Other Class Suit No. 152 of 2004 দায়ের করে। তাদের আরজির মূল দাবি ছিল— ২০০০ সালের একটি মামলায় (Other Suit No. 43 of 2000) বিবাদীপক্ষ গোপনে যে একতরফা রায় ও ডিক্রি হাসিল করেছিল, তা অবৈধ ও কলেজের ওপর বাধ্যকর নয় মর্মে ঘোষণা এবং কলেজের জমির ওপর বিবাদীদের নামে প্রস্তুতকৃত বি.এস ২৯ নম্বর খতিয়ান বেআইনি, ভিত্তিহীন ও বাতিল ঘোষণা করা।
- বিবাদী হোসনে আরার আপত্তি ও পূর্বের মামলা: মামলার ২ নম্বর বিবাদী হোসনে আরা লিখিত জবাব দাখিল করে দাবি করেন যে, একই বিষয়ে ১৯৯৮ সাল থেকে উক্ত ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতেই অপর একটি স্বত্ব মোকদ্দমা Other Class Suit No. 75 of 1998 বিচারাধীন রয়েছে। ওই পূর্ববর্তী মামলায় তিনি আর.এস ৪৮ নম্বর খতিয়ান বাতিল ও স্বত্ব ঘোষণার দাবি করেছিলেন।
- ১০ ধারা ও ২২ আদেশে বিবাদীর দুটি দরখাস্ত: বিচার চলাকালে ২ নম্বর বিবাদী হোসনে আরা দেওয়ানী কার্যবিধির ১০ ধারায় কলেজের ২০০৪ সালের পরবর্তী মামলাটির বিচার স্থগিতের আবেদন জানান। একইসঙ্গে তিনি ২২ আদেশের ৪(৩) বিধি ও ১৫১ ধারায় অপর একটি আবেদন করে দাবি করেন যে, ১ নম্বর বিবাদী ২০০৮ সালে মারা গেছেন এবং নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে তার ওয়ারিশ স্থলাভিষিক্ত না করায় পুরো মামলাটি তামাদি (Abate) হয়ে গেছে।
- যুগ্ম জেলা জজের আদেশ ও পাশাপাশি শুনানির নির্দেশ: ২০১৭ সালের ২৩ মার্চ ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত ৮৫ নম্বর আদেশে দেখতে পান যে বাদীপক্ষ ইতিপূর্বে মৃত ১ নম্বর বিবাদীর নাম আরজি থেকে কর্তন (Struck out) করে নিয়েছে, ফলে অ্যাবেটমেন্টের দরখাস্ত নামঞ্জুর করা হয়। একইসঙ্গে আদালত ১০ ধারার স্থগিতাদেশ না দিয়ে ১৯৯৮ সালের পুরনো মামলা এবং ২০০৪ সালের মামলা দুটি ‘পাশাপাশি শুনানিতে’ (Simultaneous Hearing) রাখার নির্দেশ দেন।
- হাইকোর্টে বিবাদীর দেওয়ানী রিভিশন: বিচারিক আদালতের এই আদেশে ক্ষুব্ধ হয়ে ২ নম্বর বিবাদী হোসনে আরা হাইকোর্ট বিভাগে Civil Revision No. 2518 of 2017 দায়ের করেন এবং রিভিশন শুনানি সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বিচারিক আদালতের কার্যক্রম স্থগিত করান।
🏛️ বাদী মহসিন কলেজ কর্তৃপক্ষের যুক্তি
- ১০ ধারার শর্ত পূরণ হয়নি: দুই মামলার প্রতিকার, নালিশি জমির পরিমাণ এবং পক্ষগণ সম্পূর্ণ এক নয়। ১৯৯৮ সালের মামলায় একতরফা ডিক্রি বা বি.এস ২৯ খতিয়ান চ্যালেঞ্জ ছিল না।
- মৃত বিবাদীর নাম কর্তন: ১ নম্বর বিবাদী মারা যাওয়ার পর আরজি থেকে তার নাম আইনসম্মতভাবে কেটে দেওয়া হয়েছে; সুতরাং ২২ আদেশের ৪(৩) বিধির কোনো অস্তিত্ব নেই।
- পাশাপাশি শুনানি সুবিচারের অনুকূল: দুই মামলা স্থগিত না রেখে একই আদালতে পাশাপাশি বিচার নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত আইনানুগ ও ন্যায়সঙ্গত।
🛡️ দরখাস্তকারী বিবাদী হোসনে আরার যুক্তি
- পূর্ববর্তী মামলা বিদ্যমান থাকায় ১০ ধারার স্থগিতাদেশ বাধ্যতামূলক: একই জমি নিয়ে ১৯৯৮ সালের মামলা আগেই দায়ের হয়েছে; সুতরাং পরবর্তী ২০০৪ সালের মামলা স্থগিত করা বাধ্যতামূলক ছিল।
- ওয়ারিশ স্থলাভিষিক্ত না করায় মামলা অ্যাবেট: ১ নম্বর বিবাদী ২০০৮ সালে মারা যাওয়ার পর কোনো ওয়ারিশ না আনায় পুরো মোকদ্দমাটি আইনত তামাদি হয়ে গেছে।
- ট্রায়াল কোর্টের আদেশ স্পিকিং অর্ডার নয়: যুগ্ম জেলা জজের আদেশটিতে পর্যাপ্ত কারণ ও আইনি ব্যাখ্যা না থাকায় তা বাতিলযোগ্য।
রায়ে হাইকোর্ট বিভাগ দেওয়ানী কার্যবিধির ১০ ধারার (Res Sub-Judice) মূলনীতি বিশদভাবে তুলে ধরেন। কোনো পরবর্তী মামলা স্থগিত করতে হলে আদালতের সামনে এই ৩টি শর্ত অবশ্যই অবিচ্ছেদ্যভাবে উপস্থিত থাকতে হবে:
- ১. বিচার্য বিষয় প্রত্যক্ষ ও মৌলিকভাবে অভিন্ন হওয়া (Directly and Substantially in Issue): পরবর্তী মামলার মূল বিরোধ বা বিচার্য বিষয় পূর্ববর্তী মোকদ্দমার মূল বিচার্য বিষয়ের সাথে প্রত্যক্ষ ও মৌলিকভাবে এক হতে হবে।
- ২. পক্ষগণের অভিন্নতা (Identity of Parties): উভয় মামলার পক্ষগণ অথবা তাদের বৈধ উত্তরাধিকারী বা প্রতিনিধি সম্পূর্ণ একই হতে হবে।
- ৩. একই স্বত্বের অধীন মামলা পরিচালনা (Litigating under the same title): উভয় মামলায় পক্ষগণকে একই অধিকার ও স্বত্বের সূত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।
আইনি সিদ্ধান্ত: এই তিনটি শর্তের কোনো একটি শর্তও যদি অনুপস্থিত থাকে, তবে দেওয়ানী কার্যবিধির ১০ ধারা অনুযায়ী মামলা স্থগিতের কোনো আদেশ দেওয়া যাবে না।
মাননীয় বিচারপতি জেসমিন আরা বেগম (যিনি রায় ঘোষণা করেন) এবং মাননীয় বিচারপতি মো: ইকবাল কবির উভয় মামলার নথি পর্যালোচনা করে নিম্নোক্ত তাৎপর্যপূর্ণ আইনি সিদ্ধান্ত প্রদান করেন:
ক. দুই মামলার বিচার্য বিষয় ও তফসিল ভিন্ন হওয়ায় ১০ ধারা অপ্রযোজ্য:
হাইকোর্ট লক্ষ্য করেন, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের ২০০৪ সালের মামলার মূল প্রার্থনা হলো ২০০০ সালের একটি প্রতারণামূলক একতরফা ডিক্রি এবং বি.এস ২৯ নম্বর খতিয়ান বাতিল। পক্ষান্তরে বিবাদীর ১৯৯৮ সালের মামলা ছিল আর.এস ৪৮ নম্বর খতিয়ান বাতিল সংক্রান্ত। দুই মামলার জমির পরিমাণ এবং পক্ষগণের তালিকাও হুবহু এক নয়। সুতরাং ১০ ধারার অপরিহার্য শর্ত অনুপস্থিত থাকায় পরবর্তী মামলা স্থগিত করার কোনো আইনগত সুযোগ নেই।
খ. ১৫১ ধারায় পাশাপাশি শুনানি (Simultaneous Trial) ন্যায়বিচারের হাতিয়ার:
আদালত দ্ব্যর্থহীনভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, যদিও ১০ ধারার শর্ত শতভাগ মেলেনি, তবুও যেহেতু উভয় মামলার জমি ও পক্ষদের মধ্যে কিছুটা যোগসূত্র রয়েছে, সেহেতু পরস্পরবিরোধী বিচারিক রায় এড়াতে এবং সুবিচার নিশ্চিত করতে দেওয়ানী আদালতের ১৫১ ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা রয়েছে মামলা দুটিকে ‘পাশাপাশি শুনানিতে’ রাখার। যুগ্ম জেলা জজ আদালত পাশাপাশি শুনানির আদেশ দিয়ে প্রকারান্তরে ১০ ধারার স্থগিতাদেশ নামঞ্জুর করেছেন, যা সম্পূর্ণ বিধিসম্মত।
গ. নাম কর্তনের পর ২২ আদেশ ৪(৩) বিধির তামাদির প্রশ্ন অবান্তর:
হাইকোর্ট পরিষ্কার করে বলেন, ১ নম্বর বিবাদী মৃত্যুর পর বাদীপক্ষ দরখাস্ত দিয়ে আরজি থেকে তার নাম বাদ বা কর্তন করে নিয়েছে। যখন কোনো মৃত ব্যক্তির নাম আরজি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেই ব্যক্তির মৃত্যুর কারণে ২২ আদেশের ৪(৩) বিধির অধীন পুরো মোকদ্দমা বাতিল বা অ্যাবেট হওয়ার আর কোনো আইনগত ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে না।
- রুল ডিসচার্জ (Rule Discharged): বিবাদী হোসনে আরার দায়েরকৃত দেওয়ানী রিভিশন আবেদনটি সরাসরি খারিজ (Discharged) করা হলো।
- যুগ্ম জেলা জজের আদেশ বহাল: চট্টগ্রাম ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতের ৮৫ নম্বর আদেশ বহাল রাখা হলো এবং স্থগিতাদেশ বাতিল করা হলো।
- দ্রুত বিচারের নির্দেশ: ট্রায়াল কোর্টকে ১৯৯৮ সালের এবং ২০০৪ সালের মামলা দুটি পাশাপাশি শুনানির মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করার কড়া নির্দেশ প্রদান করা হলো।
১. ১০ ধারার শর্ত বাধ্যতামূলক
বিষয়বস্তু, পক্ষ ও স্বত্ব শতভাগ অভিন্ন না হলে কোনো মামলা ১০ ধারায় স্থগিত করা যাবে না; কোনো একটি শর্ত বাদ পড়লে আবেদন বাতিলযোগ্য।
২. স্থগিতের বিকল্প পাশাপাশি শুনানি
পরস্পর সম্পর্কিত মামলায় স্থগিতাদেশ বিচারকে প্রলম্বিত করে; তাই ১৫১ ধারায় পাশাপাশি শুনানি করাই আদালতের সর্বোত্তম নীতি।
৩. নাম কর্তনে অ্যাবেটমেন্ট দূর
মৃত বিবাদীর নাম আরজি থেকে আইনসম্মতভাবে বাদ দেওয়া হলে ২২ আদেশের ৪(৩) বিধির তামাদির প্রশ্ন কার্যকর থাকে না।
৪. টেকনিক্যাল ত্রুটি আদেশের জন্য মারাত্মক নয়
আদালতের আদেশ যদি আইনে টেকসই হয়, তবে নিছক সংক্ষিপ্ত বা নন-স্পিকিং হওয়ার টেকনিক্যাল কারণে তা রিভিশনে বাতিল হয় না।
শুধুমাত্র একই খতিয়ানের জমি হলেই ১০ ধারায় স্টে পাওয়া যাবে না; নিশ্চিত করুন যে প্রার্থিত প্রতিকার ও দাবির মূল ভিত্তি হুবহু একই।
মামলা বছরের পর বছর আটকে না রেখে ১৫১ ধারায় দুটি ফাইল একই এজলাসে পাশাপাশি শুনানির বিকল্প প্রার্থনা রাখুন যাতে দ্রুত রায় পাওয়া যায়।
মৃত বিবাদীর বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিকার না থাকলে বা ওয়ারিশ না পাওয়া গেলে আরজি সংশোধনে তার নাম কেটে দিন; এতে অ্যাবেটমেন্টের বিপদ কেটে যাবে।
বিচারিক আদালত যখন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পাশাপাশি শুনানির মতো যৌক্তিক আদেশ দেয়, তখন হাইকোর্টে রিভিশন করে সময়ক্ষেপণ করা অর্থহীন।
প্রতিপক্ষ গোপনে একতরফা ডিক্রি হাসিল করে থাকলে তা বাতিলের জন্য স্বতন্ত্র স্বত্ব মামলা করাই আইনসঙ্গত পথ, যা মহসিন কলেজ সফলভাবে অনুসরণ করেছে।

