চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তিকৃত বিষয়ে নতুন মোকদ্দমা দায়ের বেআইনি: ৭ আদেশ ১১ বিধি ও রেস জুডিকেটা প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের নজির

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক তাৎপর্যপূর্ণ রায়ে সুস্পষ্ট আইনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ আপিল বিভাগ (Appellate Division) কর্তৃক যেসব বিরোধ ও স্বত্ব সংক্রান্ত বিষয় চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি (Past and Closed) হয়েছে, পরবর্তীকালে প্রতারণার (Fraud) ঢালাও ও অমূলক অভিযোগ তুলে নতুন করে স্বত্ব মোকদ্দমা দায়ের করে সেই নিষ্পত্তিকৃত বিষয়কে পুনরুজ্জীবিত করা যাবে না। মোকদ্দমার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নীতি (Principle of Finality of Litigation) এবং দোবারা দোষ বা রেস জুডিকেটা (Res Judicata – দেওয়ানী কার্যবিধির ১১ ধারা) নীতি বজায় রাখতে আদালত দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৭ নিয়ম ১১ (Order 7 Rule 11) এবং আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা ১৫১ ধারা (Section 151 CPC) প্রয়োগ করে শুরুতেই এমন আরজি খারিজ (Rejection of Plaint) করতে সম্পূর্ণ আইনসম্মতভাবে বাধ্য।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও সুদীর্ঘ বিচারিক ইতিহাস (Facts & Litigious Background)

আলোচ্য মামলাটির বিচারিক ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ, জটিল এবং দেশের শীর্ষ আদালত পর্যন্ত একাধিকবার আবর্তিত হয়েছে। বিরোধীয় নালিশি সম্পত্তির মূল মালিক ছিলেন প্রতিপক্ষগণের পূর্বসূরি আব্দুর রহমান, যিনি ১৯৫৫ সালের ২০ জুন তারিখের ২২২০ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত সাফ-কবলা দলিলমূলে উক্ত সম্পত্তি খরিদ করে নিরঙ্কুশ স্বত্ব ও দখলে অধিষ্ঠিত হন।

ঘটনার ধারাবাহিক ও প্রামাণ্য বিবরণ নিম্নরূপ:

  • ভাড়াটিয়া সাইফুজ্জামানের সাথে বিরোধ ও উচ্ছেদ ডিক্রি: ১৯৮৭ সালে মূল মালিক আব্দুর রহমান নালিশি সম্পত্তিটি সাইফুজ্জামান নামক এক ব্যক্তির নিকট মাসিক ভাড়ায় প্রদান করেন। ভাড়া বকেয়া পড়ায় আব্দুর রহমান ১৯৯৭ সালে উচ্ছেদ ও বকেয়া ভাড়া আদায়ের জন্য SCC মোকদ্দমা নং ৪/১৯৯৭ দায়ের করেন। এর বিপরীতে ভাড়াটিয়া সাইফুজ্জামান সম্পত্তিটি কেনার বায়না দাবি করে স্বত্ব মোকদ্দমা নং ৬/১৯৯৭ (Title Suit for Specific Performance of Contract) দায়ের করেন। ১৯৯৯ সালের ২২ জুন বিজ্ঞ আদালত উভয় মোকদ্দমা একত্রে শুনানি করে উচ্ছেদ মামলা ডিক্রি করেন এবং বায়না চুক্তি প্রবলের মামলাটি সরাসরি খারিজ করে দেন।
  • আপিল বিভাগ পর্যন্ত ভাড়াটিয়ার পরাজয়: সাইফুজ্জামান উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে দেওয়ানী রিভিশন নং ৩৬৯৬/১৯৯৯ দায়ের করেন, যা ২০০১ সালের ২৫ জুলাই খারিজ হয়। পরবর্তীতে তিনি আপিল বিভাগে সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং ৬০/২০০২ দায়ের করলে ২০০৩ সালের ৫ মে আপিল বিভাগও তা চূড়ান্তভাবে খারিজ করে দেন। এর ফলে সম্পত্তিতে সাইফুজ্জামানের কোনো ক্রয়স্বত্ব নেই এবং তিনি কেবলই উচ্ছেদযোগ্য ভাড়াটিয়া— তা দেশের সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
  • জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকে বন্ধক ও অর্থঋণ মামলা: ইত্যবসরে ভাড়াটিয়া সাইফুজ্জামান অপর দুই ব্যক্তি শফিকুল ইসলাম এবং মজিবুর রহমানের সাথে যোগসাজশ করে প্রকৃত মালিক আব্দুর রহমানের অজ্ঞাতে নালিশি সম্পত্তিটি জাল দলিলের মাধ্যমে আইএফআইসি ব্যাংক লিমিটেড (IFIC Bank)-এ বন্ধক রেখে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করেন। ঋণ খেলাপি হওয়ায় ব্যাংক ১৯৯৮ সালে অর্থঋণ মোকদ্দমা নং ৪১/১৯৯৮ দায়ের করে এবং ২০০১ সালে একতরফা ডিক্রির ভিত্তিতে নিলাম জারির উদ্যোগ নেয় (অর্থঋণ ডিক্রি জারি কেস নং ১৩/২০০১)।
  • প্রকৃত মালিকের অর্থঋণ দায়মুক্তি ও আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক রায়: পত্রিকায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেখে মূল মালিক আব্দুর রহমান ২০০৩ সালে বিবিধ মোকদ্দমা নং ৭৯/২০০৩ দায়ের করে একতরফা ডিক্রি রদ করান। এরপর অর্থঋণ আদালতে বিচার শেষে আদালত রায় দেন যে ঋণগ্রহীতা শফিকুল ও মজিবুর ঋণের জন্য দায়ী, কিন্তু মূল মালিক আব্দুর রহমান এই ঋণের জন্য দায়ী নন। ব্যাংক উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে গেলে হাইকোর্ট বিভাগ ২০০৮ সালের ৪ জুন দেওয়ানী রিভিশন নং ২৫৮১/২০০৫-এ রুল অ্যাবসলিউট করে সুস্পষ্ট রায় দেন যে মূল মালিক আব্দুর রহমানের ওপর ব্যাংকের ঋণের কোনো দায় নেই। ব্যাংক আপিল বিভাগে সিপিএলএ নং ২৩০৬/২০০৯ দায়ের করলে ২০১২ সালের ৮ এপ্রিল আপিল বিভাগ ব্যাংকের লিভ পিটিশন খারিজ করে হাইকোর্টের রায় চূড়ান্তভাবে বহাল রাখেন।
  • রিট পিটিশন খারিজ ও নতুন স্বত্ব মামলার কূটকৌশল: এরপর বর্তমান দরখাস্তকারী দিন ইসলাম শিকদার (যিনি নিজেকে কথিত নিলাম ক্রেতা ও ভাড়াটিয়া পক্ষের দাবিদার বলে পরিচয় দেন) ২০১২ সালে হাইকোর্টে রিট পিটিশন নং ১৬৫৬৭/২০১২ দায়ের করেন। ২০২০ সালের ১২ মার্চ হাইকোর্ট উক্ত রিট রুল খারিজ করে দেন। সকল ফোরামে পরাজিত হয়ে দিন ইসলাম শিকদার ২০২১ সালে ঢাকার ৩য় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে স্বত্ব মোকদ্দমা নং ১১৯২/২০২১ (পরবর্তীতে পুনঃনম্বরকৃত ১৭/২০২৩) দায়ের করে পূর্ববর্তী সকল ডিক্রিকে অকার্যকর ঘোষণা চেয়ে নতুন মামলা ফাঁদেন।

২. বাদি ও বিবাদি পক্ষের আইনি অবস্থান ও দ্বন্দ্ব (Pleadings of the Parties)

🛡️ বাদী/দরখাস্তকারী দিন ইসলাম শিকদারের দাবি

  1. প্রতারণার (Fraud) অভিযোগ: বাদীর দাবি, মূল মালিক আব্দুর রহমান ১৯৯২ সালে হক অ্যান্ড কোম্পানি ল ফার্মের মাধ্যমে নোটিশ পেয়েই ব্যাংকে বন্ধকের কথা জানতেন; অথচ তিনি ২০০৩ সালে আদালতে মিথ্যা দাবি করেছেন যে তিনি প্রথম পত্রিকায় নিলাম দেখে বিষয়টি জানতে পারেন। এটি আদালতের সাথে প্রতারণা।
  2. আপিল বিভাগের রায়ে নিলাম বিষয়ে সিদ্ধান্ত ছিল না: বাদীর দাবি, আপিল বিভাগ সিপিএলএ নং ২৩০৬/২০০৯-এ ব্যাংকের নিলাম বা নিলাম খরিদের বৈধতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেননি, সুতরাং নতুন করে স্বত্ব মোকদ্দমা চলতে কোনো বাধা নেই।
  3. আরজি খারিজের বিরোধিতা: বাদী দাবি করেন যে তার আরজিতে স্পষ্ট কজ অব অ্যাকশন (Cause of Action) রয়েছে এবং সাক্ষ্য গ্রহণ ছাড়া মোকদ্দমাটি প্রাথমিক পর্যায়ে আরজি খারিজ করা আইনের ভুল।

🏛️ বিবাদী/প্রতিপক্ষ আব্দুর রহমানের ওয়ারিশগণের জবাব

  1. রেস জুডিকেটা ও লিটিগেশনের সমাপ্তি: বিরোধীয় সম্পত্তির স্বত্ব, উচ্ছেদ এবং ব্যাংকের দায়ের বিষয়টি আপিল বিভাগ (CPLA 60/2002 ও CPLA 2306/2009) কর্তৃক চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ ও সিপিসির ১১ ধারা মতে উচ্চ আদালতের রায় অধস্তন আদালতের জন্য চূড়ান্ত ও অলঙ্ঘনীয়।
  2. আইনের অপব্যবহার (Abuse of Court Process): একই পক্ষ বা তাদের স্থলাভিষিক্তরা বারবার হেরে গিয়ে আদালতের প্রক্রিয়া বিলম্বিত ও মূল মালিকদের হয়রানি করার উদ্দেশ্যে নতুন মোকদ্দমা দায়ের করেছে।
  3. ৭ আদেশ ১১ বিধি ও ১৫১ ধারায় সরাসরি খারিজযোগ্য: যেহেতু মোকদ্দমাটি আইন দ্বারা বারিত (Barred by Law) এবং কোনো বৈধ কারণ নেই, তাই বিচারিক আদালত শুরুতেই আরজি খারিজ করে সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

৩. অধস্তন আদালতের বিচারিক পর্যালোচনা ও আরজি খারিজ (Subordinate Courts)

ঢাকার ৩য় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে স্বত্ব মোকদ্দমা নং ১৭/২০২৩ দায়েরের পর বিবাদীপক্ষ দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশের ১১ বিধি সহপঠিত ১১ ও ১৫১ ধারায় আরজি খারিজের দরখাস্ত দাখিল করেন:

  • বিচারিক আদালত (৩য় যুগ্ম জেলা জজ আদালত, ঢাকা – ২০২৩): ২০২৩ সালের ৭ মার্চ বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ আদালত দরখাস্তটি মঞ্জুর করে বাদীর আরজি খারিজ (Rejection of Plaint) করে দেন। আদালত অভিমত দেন যে, যে বিষয়ে দেশের আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায় দিয়ে আব্দুর রহমানের স্বত্ব ও নির্দোষিতা ঘোষণা করেছেন, সেই একই বিষয় নিয়ে পুনরায় স্বত্ব মোকদ্দমা চালানো সুস্পষ্টভাবে আইন দ্বারা বারিত এবং বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহার।
  • আপিল আদালত (৬ষ্ঠ অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত, ঢাকা – ২০২৫): বিচারিক আদালতের উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে বাদী দেওয়ানী আপিল নং ১১৭/২০২৪ দায়ের করেন। ঢাকার ৬ষ্ঠ অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি আপিলটি সরাসরি খারিজ করে বিচারিক আদালতের আরজি খারিজের আদেশ আইনসম্মত ঘোষণা করেন।

উভয় আদালতের উক্ত অভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে দিন ইসলাম শিকদার হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানী রিভিশন নং ৬৬১/২০২৫ দায়ের করলে আদালত রুল জারি করেন।

৪. সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের গভীর আইনি বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ

মাননীয় বিচারপতি মো: আলী রেজা দীর্ঘ চার কার্যদিবস ব্যাপী শুনানি গ্রহণ করেন এবং নিম্ন আদালতের মূল নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে দেওয়ানী কার্যবিধির মৌলিক মূলনীতিসমূহ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেন:

📜 ১. মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নীতি (Finality of Litigation) ও আপিল বিভাগের রায়ের অলঙ্ঘনীয়তা

হাইকোর্ট সুদৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন যে, বিচার প্রশাসনের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো— “Interest reipublicae ut sit finis litium” (জনস্বার্থেই মোকদ্দমার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া আবশ্যক)। দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ আপিল বিভাগ যখন কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করেন, তখন সেই বিষয়টি ‘Past and Closed’ (অতীত ও চূড়ান্তভাবে নিষ্পন্ন) হয়ে যায়।

  • যেহেতু আপিল বিভাগ সিপিএলএ নং ৬০/২০০২ এবং সিপিএলএ নং ২৩০৬/২০০৯-এ চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করেছেন যে আব্দুর রহমানের কোনো ব্যাংকিং দায় ছিল না এবং ভাড়াটিয়ার উচ্ছেদ বৈধ, সেহেতু অধস্তন কোনো আদালত বা পক্ষ সেই রায়কে উপেক্ষা করে নতুন মামলা খাড়া করতে পারে না।
  • আইনসম্মত পদ্ধতি (Review বা উপযুক্ত ফোরাম) ব্যতীত সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে পাশ কাটিয়ে কোল্যাটেরাল প্রসিডিং (Collateral Proceeding)-এর মাধ্যমে নতুন মামলা করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

🔍 ২. প্রতারণার (Fraud) অভিযোগের কঠোর আইনি মানদণ্ড

বাদীপক্ষের মূল যুক্তি ছিল যে আব্দুর রহমান ১৯৯২ সালের নোটিশ গোপন করে ২০০৩ সালে প্রতারণার মাধ্যমে একতরফা ডিক্রি রদ করিয়েছেন। হাইকোর্ট এই যুক্তি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে আইনের নীতি স্পষ্ট করেন:

  • প্রতারণা কখনোই অনুমান করা যায় না (Fraud is never to be presumed): আইন অনুযায়ী প্রতারণার অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে প্লেডিংসে উল্লেখ করতে হয় এবং অকাট্য, সুসংগত ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দ্বারা প্রমাণ করতে হয়।
  • নিছক পূর্বজ্ঞাত থাকা প্রতারণা নয়: কোনো বিরোধ বা অভিযোগ সম্পর্কে কেবল পূর্বজ্ঞান (Mere prior knowledge) থাকলেই তা প্রতারণা হিসেবে গণ্য হয় না। আইনের দৃষ্টিতে প্রতারণা হলো— আদালতকে বা অপর কোনো পক্ষকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করে বেআইনি সুবিধা আদায়ের অসৎ অভিপ্রায়।
  • অর্থঋণ মোকদ্দমা, অর্থঋণ আপিল, দেওয়ানী রিভিশন ২৫৮১/২০০৫, সিপিএলএ ২৩০৬/২০০৯ এবং রিট ১৬৫৬৭/২০১২— দীর্ঘ ২৫ বছরের এই বিচারিক পরিক্রমায় কোনো আদালতেই এই জাতীয় প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সুতরাং নতুন মোকদ্দমায় এটি কেবলই একটি ফাঁপা অজুহাত।

⚖️ ৩. দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশের ১১ বিধি ও ১৫১ ধারার অপরিহার্য প্রয়োগ

অনেকে মনে করেন যে আরজি খারিজ কেবল ৭ আদেশের ১১ বিধির নির্দিষ্ট চারটি গ্রাউন্ডেই হতে পারে। হাইকোর্ট স্পষ্ট করেন যে:

  • যখন কোনো মামলা দৃশ্যত রেস জুডিকেটা বা চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকৃত বিষয়কে পুনরায় উস্কে দেওয়ার জন্য দায়ের করা হয়, তখন দেওয়ানী আদালতের দায়িত্ব হলো আদালতের প্রক্রিয়াকে কলুষিত হতে না দেওয়া।
  • দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫১ ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা (Inherent Power): আদালত তার সহজাত ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটিয়ে বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহার (Abuse of the process of the court) রোধকল্পে প্রাথমিক পর্যায়েই আরজি খারিজ করে মামলাটি সমূলে বিনষ্ট করতে সম্পূর্ণ ক্ষমতাবান।

📚 ৪. আপিল বিভাগের যে নজিরসমূহ হাইকোর্ট গ্রহণ করেছে
  • আব্দুল জলিল বনাম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (7 MLR (AD) 258): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, ব্যাংকিং ঋণ ও সম্পত্তির স্বত্ব যদি পূর্বে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে থাকে, তবে নতুন করে স্বত্ব মোকদ্দমা দায়েরের সুযোগ নেই এবং তা আরজি খারিজযোগ্য।
  • ৫৩ ডিএলআর (এডি) ১২ (53 DLR (AD) 12): বিচারিক আদালত কর্তৃক গৃহীত এই নজিরটির নীতি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রযোজ্য বলে হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দেন।

৫. উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আদেশ (Final Verdict)

🏆 মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত রায় ও নির্দেশনাবলী

সকল তথ্য, আইন ও নজির পর্যালোচনা শেষে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ নিম্নোক্ত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন:

  • ১. রুল খারিজ (Rule Discharged): দেওয়ানী রিভিশন নং ৬৬১/২০২৫-এর রুলটি কোনো খরচ ছাড়াই সরাসরি খারিজ করা হলো।
  • ২. স্থগিতাদেশ ও স্থিতাবস্থা প্রত্যাহার: ইতিপূর্বে হাইকোর্ট কর্তৃক জারিকৃত যেকোনো স্থগিতাদেশ বা স্থিতাবস্থা (Status Quo) অবিলম্বে প্রত্যাহার ও বাতিল করা হলো।
  • ৩. আরজি খারিজের আদেশ চূড়ান্ত বহাল: ঢাকার ৩য় যুগ্ম জেলা জজ আদালত কর্তৃক আরজি খারিজের আদেশ এবং ৬ষ্ঠ অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের আপিল খারিজের রায়কে সম্পূর্ণ সঠিক ও আইনসঙ্গত হিসেবে চূড়ান্তভাবে বহাল রাখা হলো।
  • ৪. নথিপত্র প্রেরণের নির্দেশ: এই রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে অধস্তন সংশ্লিষ্ট আদালতসমূহে প্রেরণ করার নির্দেশ দেওয়া হলো।

৬. এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল আইনি কারণসমূহ (Ratio Decidendi)
  1. মামলাবাজির সীমাহীন বিস্তার রোধ: যদি একবার আপিল বিভাগ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া মামলাকে নিছক ‘প্রতারণার’ সাধারণ বয়ান জুড়ে দিয়ে নতুন নামে চালু করতে দেওয়া হতো, তবে দেওয়ানী মোকদ্দমার কখনো সমাপ্তি হতো না।
  2. আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতার মর্যাদা: দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫১ ধারা আদালতকে এমন ক্ষমতা দেয় যেন কোনো মামলাবাজ ব্যক্তি আদালতের মাধ্যমেই আদালতের প্রক্রিয়ার অবমাননা করতে না পারে।
  3. আইনগত অধিকার ও স্বত্বের সুরক্ষা: প্রকৃত জমির মালিক যিনি দীর্ঘ ২৫ বছর লড়াই করে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করেছেন, তাকে সুরক্ষাহীন করে নতুন মামলার জাঁতাকলে ফেলা ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

৭. বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের জন্য ৫টি গুরুত্বপূর্ণ আইনি শিক্ষা
🚫
১. নিষ্পত্তিকৃত বিষয়ে নতুন মামলা করার ঝুঁকি নেবেন না:
উচ্চ আদালতে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয়ে নতুন মোড়কে স্বত্ব মামলা করলে তা ৭ আদেশ ১১ বিধিতে খারিজ হয়ে যাবে এবং বাদীকে জরিমানা ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।

⚖️
২. প্রতারণার দাবি করতে হলে অকাট্য তথ্যপ্রমাণ থাকতে হবে:
শুধুমাত্র মৌখিক অভিযোগ দিয়ে প্রতারণা প্রমাণ করা যায় না। প্রতারণার প্রতিটি উপাদানের সুস্পষ্ট দলিল প্রমাণ ছাড়া আদালতের ডিক্রি প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না।

📑
৩. শুরুতেই ৭ আদেশ ১১ বিধির দরখাস্ত দিন:
বিবাদী পক্ষ যদি দেখেন যে মামলাটি পূর্বে নিষ্পত্তি হয়েছে বা আইন দ্বারা বারিত, তবে দীর্ঘ বিচারিক শুনানিতে না গিয়ে শুরুতেই আরজি খারিজের আবেদন করা সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

🏛️
৪. ধার্যকৃত রেস জুডিকেটা এড়াতে নতুন পক্ষ ব্যবহার ব্যর্থ হয়:
মূল ভাড়াটিয়া বা ঋণখেলাপির বদলে নতুন কোনো প্রতিনিধির নামে মামলা দিলেও যদি দাবির উৎস একই থাকে, তবে তাও রেস জুডিকেটার অধীনে বাতিল হবে।

💡
৫. ১৫১ ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা যেকোনো পর্যায়ে প্রযোজ্য:
আদালতের অপব্যবহার বন্ধ করতে আদালত ৭ আদেশ ১১ বিধির বাইরেও ১৫১ ধারার অধীনে স্বাধীনভাবে অযৌক্তিক আরজি বাতিল করতে পারেন।

৮. মামলার সারসংক্ষেপ ও পূর্ণাঙ্গ রেফারেন্স টেবিল
বিষয় / ক্ষেত্র বিবরণ ও আইনি তথ্য
মামলার নাম ও নম্বর Din Islam Sikder Vs. Afroza Begum and others, Civil Revision No. 661 of 2025
আদালতের নাম ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ | মাননীয় বিচারপতি মো: আলী রেজা (Mr. Justice Md. Ali Reza)
বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ দরখাস্তকারী পক্ষে: শেখ সাইফুজ্জামান (জামান) ও মো: রইস উদ্দিন
প্রতিপক্ষ পক্ষে: মো: মোশাররফ হোসেন
মূল মোকদ্দমা ও অধস্তন আদালত স্বত্ব মোকদ্দমা নং ১৭/২০২৩ (পূর্বতন ১১৯২/২০২১), ৩য় যুগ্ম জেলা জজ আদালত, ঢাকা (আরজি খারিজ: ০৭.০৩.২০২৩)
আপিল মোকদ্দমা দেওয়ানী আপিল নং ১১৭/২০২৪, ৬ষ্ঠ অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত, ঢাকা (আপিল খারিজ: ০৯.০১.২০২৫)
প্রাসঙ্গিক আইনি বিধানাবলী Code of Civil Procedure, 1908 (Order 7 Rule 11, Section 11 Res Judicata, Section 12, Section 115, Section 151 Inherent Power)
উদ্ধৃত গুরুত্বপূর্ণ নজিরসমূহ 7 MLR (AD) 258 (Abdul Jalil Vs. Islami Bank); 53 DLR (AD) 12; 4 ALR (AD) 44; 8 ALR (AD) 283.
হাইকোর্টের চূড়ান্ত আদেশ রুল খারিজ (Rule Discharged), স্থিতাবস্থা প্রত্যাহার, আরজি খারিজের অধস্তন আদালতের আদেশ চূড়ান্ত বহাল।
শুনানি ও রায়ের তারিখ শুনানি: ২৪ জুন, ৫ জুলাই, ১২ জুলাই ও ১৬ জুলাই ২০২৬ | রায় প্রদান: ৩০ জুলাই ২০২৬ | আপলোড: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অফিসিয়াল রায়ের লিংক ও PDF 📄 সুপ্রিম কোর্টের অফিসিয়াল PDF ডাউনলোড
🏛️ সুপ্রিম কোর্ট জাজমেন্ট পোর্টাল
আইন প্রকাশ (Ain Prokash) — বাংলাদেশের আইন শিক্ষা, সুপ্রিম কোর্টের নির্ভরযোগ্য রায় এবং জুডিশিয়াল প্রশ্নব্যাংকের গবেষণা ও প্রকাশনা মাধ্যম।

Related Articles

Back to top button