সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ৯ ধারায় দখল পুনরুদ্ধার আরজি ও উপাদান – বার কাউন্সিল লিখিত ২০১৭

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১৭: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭

প্রশ্ন: ৩। (ক) সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তির দখল পুনরুদ্ধারের মোকদ্দমার আবশ্যকীয় উপাদানসমূহ কি কি? ৯ ধারার অধীনে আরজির মূল বিষয়বস্তু, ডিক্রির বিরুদ্ধে প্রতিকার এবং ৮ ধারার মোকদ্দমার সাথে এর মৌলিক পার্থক্য বিশদভাবে আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. আইনশাস্ত্রীয় দর্শন ও পটভূমি

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (The Specific Relief Act, 1877)-এর ৯ ধারা মূলত দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একটি শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেতুবন্ধন। এই ধারার মূল আইনি দর্শন হলো—“আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (Possession is nine points of the law)”। আইনের বৈধ প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তি, এমনকি ভূমির প্রকৃত মালিকও যদি গায়ের জোরে বা জোরপূর্বক কোনো শান্তিপূর্ণ দখলদারকে বেদখল করে, তবে সমাজ ও রাষ্ট্রে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। তাই প্রকৃত স্বত্ব যা-ই থাকুক না কেন, আইনের বরখেলাপ করে দখলচ্যুত ব্যক্তিকে দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়ায় পূর্বের দখলে ফিরিয়ে দেওয়াই ৯ ধারার মূল উদ্দেশ্য।

২. ৯ ধারার মোকদ্দমার আবশ্যিক আইনি উপাদানসমূহ (Essential Ingredients)

বিজ্ঞ আদালতে ৯ ধারার অধীনে স্থাবর সম্পত্তির দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি লাভ করতে হলে বাদীকে সুস্পষ্টভাবে নিম্নলিখিত ৫টি অপরিহার্য উপাদান প্রমাণ করতে হয়:

  1. স্থাবর সম্পত্তির প্রকৃতি ও বাদীর দখল: মোকদ্দমার বিষয়বস্তু অবশ্যই কোনো স্থাবর সম্পত্তি (যেমন জমি, বসতভিটা, দালানকোঠা ইত্যাদি) হতে হবে এবং বেদখলের ঠিক পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত বাদী উক্ত সম্পত্তিতে অবিচ্ছিন্ন ও শান্তিপূর্ণ বাস্তব দখলে (Actual physical possession) ছিলেন।
  2. বাদীর সম্মতি ব্যতিরেকে বেদখল: বাদীর কোনো প্রকার সম্মতি, চুক্তি বা অনুমতি ব্যতিরেকে তাকে উক্ত সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ বা দখলচ্যুত করা হয়েছে।
  3. আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে (Without Due Course of Law): দেওয়ানি আদালত বা ফৌজদারি আদালতের কোনো বৈধ উচ্ছেদ পরোয়ানা বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সম্পূর্ণ বলপ্রয়োগে বা কূটকৌশলে বেদখল কার্যকর করা হয়েছে।
  4. সংক্ষিপ্ত তামাদির মেয়াদ (৬ মাস): তামাদি আইন, ১৯০৮-এর প্রথম তফসিলের ৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বেদখল সংঘটিত হওয়ার তারিখ হতে সর্বোচ্চ ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে বিজ্ঞ আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে। ৬ মাস ১ দিন অতিবাহিত হলেও ৯ ধারার মামলা তামাদিতে চূড়ান্তভাবে খারিজযোগ্য।
  5. সরকারের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা বারিত: ৯ ধারার শেষাংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বা কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ৯ ধারার অধীনে দখল পুনরুদ্ধারের কোনো মোকদ্দমা দায়ের করা যাবে না।

৩. ৯ ধারার অধীনে আরজির মূল কাঠামো ও বিশেষ বিবরণী

দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৭ অনুযায়ী আরজি প্রণয়নের সাধারণ শর্তাবলি ছাড়াও ৯ ধারার আরজিতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে:

  • স্বত্বের দাবি সম্পূর্ণ বর্জন: আরজিতে বাদী নিজের স্বত্ব বা মালিকানা প্রমাণের কোনো ঐতিহাসিক দলিল বা খতিয়ান প্রমাণের আশ্রয় নেবেন না। আরজির একমাত্র মেরুদণ্ড হবে পূর্ব দখল ও বেআইনি উচ্ছেদ।
  • বেদখলের সুনির্দিষ্ট তারিখ, সময় ও ঘটনাপঞ্জি (Cause of Action): কোন তারিখে, কয়টার সময় এবং কীভাবে বিবাদীগণ দলবদ্ধভাবে বাদীকে বেদখল করেছে, তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ দিতে হবে, যাতে আরজি পাঠেই স্পষ্ট হয় যে মামলাটি ৬ মাসের মধ্যে দায়ের করা হয়েছে।
  • সহ-শরিকদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্যতা: উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, সকল সহ-শরিক সম্পত্তির প্রতিটি ধূলিকণায় সমান অংশীদার। ফলে এক সহ-শরিক অপর সহ-শরিকের বিরুদ্ধে ৯ ধারায় নিছক দখল পুনরুদ্ধারের মামলা করতে পারে না; সেক্ষেত্রে দেওয়ানি কার্যবিধির অধীনে বাটোয়ারা মোকদ্দমা বা যৌথ দখলের প্রতিকার চাইতে হয়।
  • কোর্ট ফি (Court Fees Act, 1870): সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারার নিয়মিত স্বত্বের মামলায় যেখানে পূর্ণ অ্যাড-ভ্যালেরম (মূল্যানুপাতিক) কোর্ট ফি দিতে হয়, ৯ ধারার সংক্ষিপ্ত মোকদ্দমায় তার অর্ধেক (৫০%) কোর্ট ফি প্রদান করলেই আরজি গ্রহণযোগ্য হয়।

৪. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ধারা ৮ বনাম ধারা ৯

তুলনার ভিত্তি ধারা ৮ (নিয়মিত স্বত্বের মোকদ্দমা) ধারা ৯ (সংক্ষিপ্ত দখল পুনরুদ্ধার মোকদ্দমা)
মামলার ভিত্তি সম্পত্তির বৈধ স্বত্ব বা মালিকানা (Title)। নিছক পূর্ববর্তী শান্তিপূর্ণ দখল (Prior Possession)।
তামাদির মেয়াদ বেদখল বা স্বত্ব অস্বীকারের তারিখ থেকে ১২ (বারো) বৎসর (অনুচ্ছেদ ১৪২/১৪৪)। বেদখলের তারিখ হতে মাত্র ৬ (ছয়) মাস (অনুচ্ছেদ ৩)।
কোর্ট ফি জমির বাজার মূল্যের ওপর সম্পূর্ণ অ্যাড-ভ্যালেরম কোর্ট ফি। ধারা ৮-এর নির্ধারিত কোর্ট ফির ঠিক অর্ধেক।
সরকারের বিরুদ্ধে সরকারের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য। সরকারের বিরুদ্ধে কোনো মোকদ্দমা চলে না।
আপিল ও রিভিউ আদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত আপিল ও রিভিউ দায়ের করা যায়। ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিউ সরাসরি নিষিদ্ধ।

৫. ৯ ধারার ডিক্রির বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষের আইনগত প্রতিকার

৯ ধারার কোনো আদেশ বা ডিক্রির বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হলে সংবিধিবদ্ধভাবেই আপিল (Appeal) এবং রিভিউ (Review) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সংক্ষুব্ধ বিবাদীর সামনে ২টি কার্যকর আইনি প্রতিকার উন্মুক্ত থাকে:

  1. দেওয়ানি রিভিশন (Revision under Section 115 CPC): যদি নিম্ন আদালত বিচারিক এখতিয়ার প্রয়োগে কোনো মৌলিক ভুল করে (যেমন তামাদিতে বারিত মামলা ডিক্রি দেওয়া বা এখতিয়ারহীন আদেশ), তবে দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫ ধারার অধীনে বিজ্ঞ জেলা জজ আদালত কিংবা মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানি রিভিশন দায়ের করা যায়।
  2. ধারা ৮ ও ৪২-এ নিয়মিত স্বত্ব ঘোষণার মামলা: ৯ ধারার ডিক্রি কোনো পক্ষের স্বত্ব নির্ধারণ করে না। তাই প্রকৃত মালিক বা সংক্ষুব্ধ পক্ষ সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ও ৪২ ধারা অনুযায়ী স্বত্ব সাব্যস্তপূর্বক খাস দখল পুনরুদ্ধারের জন্য ১২ বছরের মধ্যে নিয়মিত দেওয়ানি মোকদ্দমা দায়ের করে জমি ফেরত পেতে পারেন।

৬. উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী নজিরসমূহ

  • সোলেমান বনাম ইসমাইল (48 DLR 167): মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ সুস্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, ৯ ধারার বিচারে একমাত্র বিচার্য বিষয় হলো বাদীর দখল এবং বেআইনি উচ্ছেদ; বিবাদীর স্বত্ব বা মালিকানার কোনো প্রকার সাক্ষ্য এখানে গ্রাহ্য হবে না।
  • আব্দুল হামিদ বনাম খোদেজা খাতুন (21 DLR 286): সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, ৬ মাসের তামাদি কোনোভাবেই ধারা ৫ দ্বারা বৃদ্ধি করা যায় না এবং সরকারের বিরুদ্ধে এ ধারায় কোনো আদেশ প্রদান আইনত বাতিল।

৭. উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ৯ ধারায় দখল পুনরুদ্ধার হলো সমাজে বাহুবল প্রতিরোধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দেওয়ানি হাতিয়ার। স্বত্বহীন দখলদারও যদি বেআইনিভাবে উচ্ছেদ হয়, তবে আইন তাকে সম্মানের সাথে দখলে পুনর্বাসিত করে প্রমাণ করে যে বলপ্রয়োগের স্থান আইনের জগতে নেই।

Related Articles

Back to top button