১০০ বছরের পুরনো সিএস রেকর্ডে জমির শ্রেণি নির্ধারণ নয়, অগ্রক্রয়ে বসতভিটা যাচাইয়ে শেষ খতিয়ান বিবেচ্য: হাইকোর্ট

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও যুগান্তকারী আইনি সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ প্রজাস্বত্ব আইনের অধীন অগ্রক্রয় মামলায় এক অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও দিকনির্দেশনামূলক আইনি সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। হাইকোর্ট স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে, শতবর্ষ পূর্বে প্রস্তুতকৃত সিএস (C.S.) খতিয়ানের তথাকথিত ‘ডাঙা’ শ্রেণির ওপর নির্ভর করে কোনো নালিশি ভূমির বর্তমান প্রকৃত চরিত্র ও শ্রেণি নির্ধারণ করা আইনসম্মত নয়। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬(১৬) ধারার [Section 96(16) SAT Act] বিধান অনুযায়ী কোনো বসতভিটা বা বসতবাড়ির (Homestead) ভূমি অগ্রক্রয়যোগ্য (Pre-emptable) নয়। আর নালিশি ভূমি প্রকৃতপক্ষে বসতভিটা কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিতর্কিত বিক্রয় দলিল সম্পাদনের ঠিক অব্যবহিত পূর্বে প্রণীত ও চূড়ান্ত প্রকাশিত সর্বশেষ খতিয়ান (Last prepared khatian immediately before sale) বিবেচনা করা বাধ্যতামূলক। যেহেতু বিচারিক আদালত ও আপিল আদালত উভয়ই উক্ত সর্বশেষ খতিয়ান পর্যালোচনা ব্যতিরেকে পরস্পরবিরোধী রায় দিয়েছিলেন, সেহেতু হাইকোর্ট উভয় আদালতের রায় বাতিল করে জমিন সরেজমিনে তদন্ত ও সর্বশেষ খতিয়ান প্রমাণের সুযোগ দিয়ে মামলাটি নিম্ন আদালতে পুনঃবিচারের জন্য প্রেরণ (Remand) করেছেন।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও সুদীর্ঘ বিচারিক ইতিহাস (Facts & Procedural History)

মামলাটি ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল সহকারী জজ আদালতে ২০১১ সালে দায়েরকৃত অগ্রক্রয় বিবিধ মোকদ্দমা Pre-emption Miscellaneous Case No. 12 of 2011 থেকে উদ্ভূত।

মামলার মূল ঘটনা ও বিচারিক বিবরণ নিম্নরূপ:

  • নালিশি জমি ও অগ্রক্রয়ের দাবি: ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল থানার বনগাঁও মৌজার এস.এ. ৭৭ নম্বর খতিয়ানের এস.এ. ৩০৫৭ নম্বর দাগের ৪ শতাংশ জমি নিয়ে এই মামলার সূত্রপাত। উক্ত খতিয়ানের রেকর্ডীয় প্রজা কলিমুদ্দিন, বাতাস মাহমুদ, ফিরজান বিবি, বুদারু মোহাম্মদ, সমিরুদ্দিন, খুরশেদ আলী এবং আদের মোহাম্মদ। সমিরুদ্দিন নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করায় তার ওয়ারিশ হিসেবে ১ নম্বর প্রতিপক্ষ মো: আলিমুদ্দিন উক্ত খতিয়ানের সহ-শরিক হন।
  • বিতর্কিত বিক্রয় ও দলিল: ২০১১ সালের ১০ মার্চ তারিখে ১৬৬৭ নম্বর রেজিস্ট্রি কবলা দলিলের মাধ্যমে ২ নম্বর প্রতিপক্ষ মো: আদের বকশ ৪ শতাংশ জমি দরখাস্তকারী মো: বাবুল ইসলামের নিকট বিক্রয় করেন।
  • অগ্রক্রয় মামলার কারণ ও আরজির বক্তব্য: অগ্রক্রয়কারী আলিমুদ্দিন দাবি করেন যে, ২০১১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বাবুল ইসলাম জমি মাপজোখ করতে এলে তিনি বিক্রির কথা জানতে পারেন এবং পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর দলিলের সার্টিফাইড কপি তুলে অবগত হন। তিনি দাবি করেন, তিনি উক্ত খতিয়ানের ওয়ারিশসূত্রে সহ-শরিক, তার বাড়ি নালিশি জমির সাথে লাগানো, জমিটি তাদের উঠান হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং ক্রেতা একজন সম্পূর্ণ বহিরাগত (Stranger purchaser)। তাই ৯৬ ধারায় তিনি জমিটি অগ্রক্রয় (Pre-emption) পাওয়ার হকদার।
  • ক্রেতার লিখিত আপত্তি ও বসতভিটার দাবি: ক্রেতা বাবুল ইসলাম লিখিত আপত্তি দাখিল করে জানান, তিনি কোনো বহিরাগত নন; বিক্রেতা তার দাদার চাচাত ভাই। তিনি আরও জোরালো দাবি করেন যে, তিনি ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নালিশি জমিতে বসতবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন। নালিশি জমিতে তার থাকার ঘর, শোবার ঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, লাকড়ির ঘর, টিউবওয়েল এবং পায়খানা বিদ্যমান। ফলে জমিটি বসতবাড়ি (Homestead), যা প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬(১৬) ধারা অনুযায়ী কোনোভাবেই অগ্রক্রয়যোগ্য নয়।
  • সহকারী জজ আদালত কর্তৃক মামলা খারিজ: বিচারিক আদালতে বাদীপক্ষে ২ জন এবং বিবাদীপক্ষে ৩ জন সাক্ষী জবানবন্দি দেন। রাণীশংকৈল সহকারী জজ ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিত রায়ে অগ্রক্রয় মামলাটি সরাসরি খারিজ করে দেন।
  • যুগ্ম জেলা জজ আদালতের উল্টো রায়: উক্ত খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে অগ্রক্রয়কারী আপিল দায়ের করলে (Misc Appeal No. 12 of 2015), ঠাকুরগাঁওয়ের ১ম যুগ্ম জেলা জজ ২০১৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আপিল মঞ্জুর করে বিচারিক আদালতের রায় উল্টে দেন এবং অগ্রক্রয়ের পক্ষে রায় প্রদান করেন। আপিল আদালত যুক্তি দেন যে, পুরনো সিএস খতিয়ানে জমির শ্রেণি ‘ডাঙা’ লেখা রয়েছে, কাজেই এটি বসতবাড়ি নয়।
  • হাইকোর্টে দেওয়ানী রিভিশন: যুগ্ম জেলা জজের এই রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে ক্রেতা বাবুল ইসলাম হাইকোর্ট বিভাগে Civil Revision No. 710 of 2017 দায়ের করেন এবং রুল নিশি লাভ করেন।

২. বাদি ও বিবাদি পক্ষের আইনি অবস্থান ও দ্বন্দ্ব (Pleadings of the Parties)

🛡️ দরখাস্তকারী ক্রেতার যুক্তি (Petitioner)

  1. বসতভিটা অগ্রক্রয়যোগ্য নয়: প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬(১৬) ধারার স্পষ্ট বিধান মতে বসতভিটার জমি অগ্রক্রয় করা যায় না। নালিশি জমিতে শোবার ঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, টিউবওয়েল ও ল্যাট্রিন রয়েছে।
  2. সিএস রেকর্ডের শ্রেণি অচল: ১০০ বছরেরও বেশি পূর্বে প্রণীত সিএস রেকর্ডের ‘ডাঙা’ শব্দের ভিত্তিতে বর্তমানের বসতভিটা অস্বীকার করা আইনের মারাত্মক ভুল।
  3. মামলার কারণে ত্রুটি: অগ্রক্রয়কারী যথাসময়ে নোটিশ পেয়েছিলেন এবং তামাদির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর কাল্পনিক কারণ দেখিয়ে মামলা দায়ের করেছেন।

🏛️ অগ্রক্রয়কারী প্রতিপক্ষের যুক্তি (Opposite Party)

  1. সহ-শরিক হিসেবে অগ্রাধিকার: অগ্রক্রয়কারী এস.এ. খতিয়ানের বৈধ ওয়ারিশ সূত্রে সহ-শরিক এবং ক্রেতা একজন বহিরাগত ব্যক্তি।
  2. সিএস রেকর্ডে জমিটি ‘ডাঙা’: মূল স্বত্ব রেকর্ডে জমিটি বসতভিটা হিসেবে রেকর্ডভুক্ত নয়, বরং চাষযোগ্য বা পতিত ‘ডাঙা’ জমি; তাই ৯৬(১৬) ধারার ব্যতিক্রম প্রযোজ্য নয়।
  3. উঠান হিসেবে ব্যবহার: জমিটি তাদের বাড়ির সংলগ্ন বহিরাঙ্গন বা উঠান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, যা হস্তান্তর করায় তাদের বসবাস বিঘ্নিত হচ্ছে।

৩. আইনি বিধান: প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬(১৬) ধারা ও বসতভিটার সুরক্ষা

অগ্রক্রয় (Pre-emption) হলো একটি বিশেষ সংবিধিবদ্ধ অধিকার, যা কোনো তৃতীয় পক্ষ বা বহিরাগত ব্যক্তির অনুপ্রবেশ রোধ করে সহ-শরিকদের পারিবারিক বা জোতের অখণ্ডতা রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। তবে আইনপ্রণেতাগণ একই সাথে অন্যের ব্যক্তিগত আবাসন বা বসতবাড়ির নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ধারা ৯৬(১৬):

“Nothing in this section shall apply to the transfer of— (a) any homestead; or (b) any land which is used for commercial or industrial purpose…”

আইনি তাৎপর্য: ৯৬ ধারার ১৬ উপ-ধারার দ্ব্যর্থহীন নির্দেশ হলো— কোনো জমি যদি ‘বসতভিটা’ (Homestead) হয়, তবে সেই হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ৯৬ ধারার কোনো বিধানই প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ, বসতভিটা বিক্রি হলে কোনো সহ-শরিক বা সংলগ্ন জোতের মালিক তার বিরুদ্ধে অগ্রক্রয় মামলা দায়ের করতে পারবেন না। যদি কেউ বসতভিটার ওপর অগ্রক্রয় মামলা করেন, তবে তা আইনত অচল (Not maintainable in law)।

৪. হাইকোর্ট বিভাগের চুলচেরা আইনি বিশ্লেষণ ও বিচারিক পর্যবেক্ষণ

মাননীয় বিচারপতি মো: সোহরাওয়ার্দী নিম্ন আদালতের নথি, সাক্ষীদের মৌখিক সাক্ষ্য এবং উভয়পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক গভীর অভিনিবেশ সহকারে পর্যালোচনা করেন। রায়ে মহামান্য আদালত নিম্নোক্ত মৌলিক আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করেন:

ক. মূল বিচার্য বিষয় ছিল জমির প্রকৃত চরিত্র (Character of Suit Land):

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন যে, এই রিভিশন মামলার নিষ্পত্তির জন্য একমাত্র মৌলিক বিচার্য বিষয় হলো— নালিশি জমিটি বাস্তবে বসতভিটা (Homestead) কি না? স্বয়ং অগ্রক্রয়কারী তার আরজিতে উল্লেখ করেছেন যে জমিটি তাদের বহিরাঙ্গন বা উঠান (Outer courtyard) হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অন্যদিকে ক্রেতা দাবি করেছেন যে তিনি সেখানে দীর্ঘকাল ঘরবাড়ি, গোয়ালঘর, রান্নাঘর ও নলকূপ স্থাপন করে সপরিবারে বসবাস করছেন। সুতরাং বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হলো জমির বাস্তব রূপ।

খ. শতবর্ষের পুরনো সিএস রেকর্ড জমির বর্তমান প্রকৃতির মাপকাঠি নয়:

আপিল আদালত সিএস রেকর্ডের ‘ডাঙা’ শব্দের ওপর ভিত্তি করে জমিটিকে বসতবাড়ি নয় বলে রায় দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে বিচারপতি সোহরাওয়ার্দী এক ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ দেন:
“It appears that after preparing the C.S. khatian, more than 100 years elapsed. Therefore, relying on the C.S. khatian, the nature of the land cannot be ascertained.”
অর্থাৎ, সিএস জরিপ সম্পন্ন হওয়ার পর এক শতাব্দীরও বেশি (১০০ বছর) সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। মানববসতি, নগরায়ণ এবং কৃষিভূমির রূপান্তর একটি চলমান সামাজিক ও ভৌগোলিক প্রক্রিয়া। শতবর্ষ আগে যে জমিটি পতিত বা ‘ডাঙা’ ছিল, কালের আবর্তে সেখানে মানুষের স্থায়ী বসতবাড়ি ও পারিবারিক আবাস গড়ে ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক। ফলে শতবর্ষী প্রাচীন সিএস রেকর্ডের ওপর চোখ বন্ধ করে নির্ভর করে একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান ভূমির প্রকৃতি নির্ধারণ করা আইনের চরম বিকৃতি।

গ. বিক্রয় দলিলের অব্যবহিত পূর্বের সর্বশেষ খতিয়ান বিবেচ্য (Relevance of Last Prepared Khatian):

হাইকোর্ট সুনির্দিষ্ট আইনি নীতি নির্ধারণ করে বলেন:
“To determine whether the suit land is homestead or not, the last khatian prepared immediately before selling the suit land is relevant and should be considered to ascertain whether the suit land is a homestead or not.”
জমি বিক্রির দিন বা বিক্রয় দলিলের তারিখের পূর্বে সরকার কর্তৃক প্রণীত সর্বশেষ চূড়ান্ত খতিয়ানই (যেমন এস.এ., আর.এস. বা বি.এস. খতিয়ান) প্রমাণ করবে সরকারি রেকর্ডে জমিটির শ্রেণি কী ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, নিম্ন আদালতে বিচার চলাকালে কোনো পক্ষই উক্ত বিতর্কিত কবলা দলিলের ঠিক অব্যবহিত পূর্বে প্রণীত সর্বশেষ খতিয়ানটি দাখিল বা প্রমাণ করেনি।

ঘ. ন্যায়বিচারের স্বার্থে অতিরিক্ত সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য রিমান্ড (Remand for Fresh Evidence):

যেহেতু নালিশি জমি বসতভিটা কি না তা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আবশ্যকীয় রেকর্ডীয় দলিল আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি, সেহেতু অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো এক পক্ষের অনুকূলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিলে ন্যায়বিচারের অপলাপ (Miscarriage of justice) ঘটবে। তাই উভয় পক্ষকে সর্বশেষ খতিয়ান ও জমিনের বর্তমান শ্রেণি প্রমাণের পূর্ণাঙ্গ সুযোগ প্রদান করে মামলাটি সহকারী জজ আদালতে রিমান্ডে পাঠানোই আইনসঙ্গত সমাধান।

৫. হাইকোর্টের চূড়ান্ত আদেশ ও বিচারিক নির্দেশনা (Final Decision & Directions)

সার্বিক আইনি মূল্যায়ন শেষে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ নিম্নোক্ত চূড়ান্ত আদেশ ঘোষণা করেন:

  • উভয় আদালতের রায় বাতিল: রাণীশংকৈল সহকারী জজ আদালত কর্তৃক ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির খারিজ আদেশ এবং ঠাকুরগাঁওয়ের ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত কর্তৃক ২০১৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির আপিল মঞ্জুরের রায়— উভয় রায়ই সম্পূর্ণ বাতিল ও রদ করা হলো।
  • মামলা রিমান্ডে প্রেরণ: প্রি-এমপশন বিবিধ মোকদ্দমা নং ১২/২০১১ ট্রায়াল কোর্টে (সহকারী জজ আদালত, রাণীশংকৈল) রিমান্ডে পাঠানো হলো।
  • নতুন সাক্ষ্য গ্রহণের স্বাধীনতা: নালিশি জমির প্রকৃত শ্রেণি ও বসতভিটা সংক্রান্ত দাবির সপক্ষে উভয় পক্ষকেই অতিরিক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও সর্বশেষ খতিয়ান দাখিলের পূর্ণ স্বাধীনতা (Liberty to adduce further evidence) প্রদান করা হলো।
  • স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার: হাইকোর্ট কর্তৃক ২০১৭ সালের ১৩ মার্চ তারিখে প্রদত্ত স্থিতাবস্থা/স্থগিতাদেশের অন্তর্বর্তী আদেশ প্রত্যাহার করা হলো।
  • ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ: বিচারিক আদালতকে নিম্ন আদালতের নথি প্রাপ্তির পর থেকে পরবর্তী ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে নিশ্চিতভাবে মোকদ্দমাটির পুনর্বিচার সম্পন্ন করার কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হলো।

৬. আইনি কারণ ও রেশিও ডেসিডেন্ডাই (Ratio Decidendi)

এই রায়ের মৌলিক আইনি নীতিসমূহ (Core Legal Principles):

  1. সিএস রেকর্ডের প্রাসঙ্গিকতার সীমাবদ্ধতা: ব্রিটিশ আমলে প্রণীত সিএস রেকর্ড স্বত্বের উৎস অনুসন্ধানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, শতবর্ষ পর জমির বর্তমান ব্যবহারিক রূপ বা শ্রেণি নির্ণয়ে তা চূড়ান্ত প্রামাণ্য ভিত্তি হতে পারে না। সময়ের ব্যবধানে প্রকৃতির পরিবর্তন বিচারিক বিবেচনায় নিতে হবে।
  2. ‘Homestead’ নির্ধারণের সময়বিন্দু: হস্তান্তরের মুহূর্তে জমিটির শ্রেণি কী ছিল, তা-ই অগ্রক্রয় মামলার ক্ষেত্রে নির্ধারক। আর তা প্রমাণের সর্বশ্রেষ্ঠ দালিলিক ভিত্তি হলো হস্তান্তরের ঠিক অব্যবহিত পূর্বে চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত খতিয়ান।
  3. ৯৬(১৬) ধারার অনমনীয় সুরক্ষা: প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬(১৬) ধারা কোনো শর্তাধীন বিধান নয়; এটি একটি নিরঙ্কুশ প্রতিরোধ (Absolute statutory bar)। জমিটি একবার বসতভিটা প্রমাণিত হলে অগ্রক্রয়কারী সহ-শরিক হলেও মামলা সরাসরি বাতিল হবে।
  4. অসম্পূর্ণ তথ্যে রায় দেওয়া নিষেধ: যেখানে আইনগত অধিকার বা অব্যাহতি নির্ধারণে একটি দালিলিক প্রমাণ (সর্বশেষ খতিয়ান) অপরিহার্য, সেখানে পক্ষগণের ব্যর্থতায় আদালত অন্ধ অনুমান নির্ভর সিদ্ধান্ত না দিয়ে পক্ষগণকে সেই দলিল দাখিলের সুযোগ দিয়ে রিমান্ডে পাঠাতে বাধ্য।

৭. প্র্যাকটিসিং আইনজীবীদের জন্য ৫টি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক সতর্কতা
১. নিছক প্রাচীন সিএস খতিয়ানের ওপর নির্ভর করবেন না:

জমির শ্রেণি সংক্রান্ত বিরোধে সিএস খতিয়ান যত আকর্ষণীয়ই হোক, তার সাথে আর.এস., এস.এ., বি.এস. বা সিটি জরিপের সর্বশেষ খতিয়ান অবশ্যই আরজি বা লিখিত জবাবের সাথে দাখিল ও একজিবিট করতে হবে।

২. বসতভিটার প্রতিরক্ষায় স্থানীয় তদন্ত কমিশন (Local Inspection):

ক্রেতা হিসেবে যদি বসতভিটার দাবি করতে চান, তবে শুধু মুখের কথা বা সাক্ষীর সাক্ষ্য নয়; দেওয়ানী কার্যবিধির ৩৯ আদেশ ৭ বিধি বা ২৬ আদেশ ৯ বিধিতে একজন অ্যাডভোকেট কমিশনার দিয়ে জমিনের ঘরবাড়ি, টিউবওয়েল ইত্যাদির সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে নেওয়া অতীব কার্যকর কৌশল।

৩. ৯৬(১৬) ধারার স্পষ্ট আপত্তি প্রাথমিক পর্যায়েই উত্থাপন করুন:

লিখিত আপত্তিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে হস্তান্তরিত জমিটি ‘বসতভিটা’ হওয়ায় মামলাটি ৯৬(১৬) ধারার কারণে আইনত অচল ও খারিজযোগ্য।

৪. আরজিতে অসাবধানতাবশত বসতবাড়ির বিবরণ দেবেন না:

অনেক সময় অগ্রক্রয়কারী আরজিতে লিখে ফেলেন ‘জমিটি আমাদের বাড়ির উঠান বা আঙিনা’। এই ধরনের বক্তব্য বিবাদীর বসতভিটা প্রমাণের পক্ষে শক্তিশালী সহায়ক প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

৫. রিভিশনাল কোর্টে নতুন দলিল প্রমাণের সুযোগ না চেয়ে রিমান্ডের আবেদন:

অপ্রমাণিত খতিয়ান সরাসরি রিভিশনে বিচার করা যায় না; এমন ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতে অতিরিক্ত সাক্ষ্য ও দলিল প্রমাণের জন্য মামলা রিমান্ডে পাঠানোর প্রার্থনা করাই সঠিক আইনি পথ।

৮. মামলার রেফারেন্স ও বিচারিক তথ্যের সারসংক্ষেপ
মামলার শিরোনাম ও নম্বর দেওয়ানী রিভিশন নং ৭১০ / ২০১৭ (Civil Revision No. 710 of 2017)
উচ্চ আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (মাননীয় বিচারপতি মো: সোহরাওয়ার্দী / Mr. Justice Md. Shohrowardi)
পক্ষসমূহ মো: বাবুল ইসলাম (দরখাস্তকারী/ক্রেতা) বনাম মো: আলিমউদ্দিন ও অন্যান্য (প্রতিপক্ষ/অগ্রক্রয়কারী ও বিক্রেতা)
বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ দরখাস্তকারী পক্ষে: জনাব লুৎফর রহমান, অ্যাডভোকেট | প্রতিপক্ষ পক্ষে: জনাব মো: মজিবুর রহমান, অ্যাডভোকেট
অধস্তন আদালতের মামলা ও রায় ১. সহকারী জজ আদালত, রাণীশংকৈল, ঠাকুরগাঁও (বিবিধ মোকদ্দমা নং ১২/২০১১, রায়: ১৮.০২.২০১৫ – মামলা খারিজ)
২. ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, ঠাকুরগাঁও (বিবিধ আপিল নং ১২/২০১৫, রায়: ০৬.০২.২০১৭ – আপিল মঞ্জুর)
মূল আইনি বিষয়বস্তু ও আইন রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ধারা ৯৬(১৬); শতবর্ষের সিএস রেকর্ড বনাম সর্বশেষ খতিয়ান; বসতভিটার অগ্রক্রয়যোগ্যতা; দেওয়ানী কার্যবিধির ১১৫(১) ধারা ও রিমান্ড।
হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রুল অ্যাবসলিউট (Rule Absolute); উভয় আদালতের রায় বাতিল এবং জমির শ্রেণি ও বসতভিটা প্রমাণের জন্য ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশসহ ট্রায়াল কোর্টে রিমান্ড।
শুনানি ও রায়ের তারিখ শুনানি: এপ্রিল, জুন ও জুলাই ২০২৬ | চূড়ান্ত রায় প্রদান: ২২ জুলাই ২০২৬ | আপলোড: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অফিসিয়াল রায়ের লিংক ও PDF 📄 সুপ্রিম কোর্টের অফিসিয়াল PDF ডাউনলোড
🏛️ সুপ্রিম কোর্ট জাজমেন্ট পোর্টাল
আইন প্রকাশ (Ain Prokash) — বাংলাদেশের আইন শিক্ষা, সুপ্রিম কোর্টের নির্ভরযোগ্য রায় এবং জুডিশিয়াল প্রশ্নব্যাংকের গবেষণা ও প্রকাশনা মাধ্যম।

Related Articles

Back to top button