খুনের মামলায় অপ্রকৃতিস্থতার অজুহাত ও সাক্ষ্য আইনের ১০৫ ধারায় প্রমাণের দায়িত্ব | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৫
প্রশ্ন ৮। (খ): খুনের মামলায় অপ্রকৃতিস্থতার অজুহাত ও সাক্ষ্য আইনের ১০৫ ধারায় প্রমাণের দায়িত্ব | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৫
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় আসামির নির্দোষিতার প্রাথমিক অনুমান (Presumption of Innocence) একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মূলনীতি। রাষ্ট্রপক্ষকেই সকল যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের ঊর্ধ্বে আসামির অপরাধ প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু আসামী যখন দাবি করে যে সে সাধারণ ব্যতিক্রমের (General Exceptions) অধীনে অপরাধের দায়মুক্ত—যেমন ঘটনা সংঘটনের সময় সে অপ্রকৃতিস্থ (Insane) ছিল—তখন প্রমাণের দায়িত্ব কার উপর বর্তাবে? অত্র সমস্যাভিত্তিক প্রশ্নে C-কে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত B দাবি করে যে সে অপ্রকৃতিস্থতার কারণে কৃতকর্মের প্রকৃতি জানত না। এই অপ্রকৃতিস্থতা প্রমাণে B-এর কোনো আইনি দায়িত্ব আছে কি না তা সাক্ষ্য আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী
অত্র সমস্যার সাথে সাক্ষ্য আইন ও দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট সংবিধিবদ্ধ বিধানাবলী:
- The Evidence Act, 1872, Section 105: আসামী কোনো ব্যতিক্রমের আওতাভুক্ত তা প্রমাণের দায়িত্ব (Burden of proving that case of accused comes within exceptions):
“When a person is accused of any offence, the burden of proving the existence of circumstances bringing the case within any of the General Exceptions in the Penal Code, or within any special exception or proviso contained in any other part of the same Code, or in any law defining the offence, is upon him, and the Court shall presume the absence of such circumstances.”
- The Penal Code, 1860, Section 84: অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির কার্য (Act of a person of unsound mind): ঘটনা সংঘটনকালে মানসিক বিকৃতির কারণে কাজের প্রকৃতি বা তা বেআইনি তা বুঝতে অক্ষম থাকা।
- Section 101 ও 102 Evidence Act: প্রমাণের সাধারণ দায়িত্ব।
৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা
আইনি বিশ্লেষণ ও প্রমাণের দায়িত্বের প্রকৃতি
সাক্ষ্য আইনের ১০৫ ধারা অনুযায়ী B-এর আইনি দায়িত্ব ও পরিস্থিতি নিম্নরূপ:
- ১. প্রমাণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব B-এর নিজের উপর (Burden on the Accused):
- যেহেতু B দণ্ডবিধির সাধারণ ব্যতিক্রমের (General Exceptions) অন্তর্ভুক্ত ধারা ৮৪ এর অপ্রকৃতিস্থতা (Insanity) দাবি করেছে, সেহেতু সাক্ষ্য আইনের ১০৫ ধারা অনুযায়ী এই অপ্রকৃতিস্থতা প্রমাণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব B-এর নিজের উপরই বর্তাবে।
- ১০৫ ধারার শেষাংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আদালত অনুমান করে নেবেন যে এমন কোনো অপ্রকৃতিস্থতার পরিস্থিতি ঘটনার সময় বিদ্যমান ছিল না (The Court shall presume the absence of such circumstances)। সুতরাং আসামীকেই এই আইনি অনুমান খণ্ডন করতে হবে।
- ২. কোন সময়ের অপ্রকৃতিস্থতা প্রমাণ করতে হবে?
- B-কে প্রমাণ করতে হবে যে ঘটনাটি সংঘটনের ঠিক সেই মুহূর্তে (Crucial moment of crime) সে এমন মানসিক বিকৃতিতে আক্রান্ত ছিল যে সে তার কাজের ভালো-মন্দ বা প্রকৃতি অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ অক্ষম ছিল। ঘটনার পূর্বে বা পরে সাধারণ মানসিক অস্বাভাবিকতা যথেষ্ট নয়; প্রমাণ করতে হবে সংবিধিবদ্ধ আইনি অপ্রকৃতিস্থতা (Legal Insanity, not mere medical insanity)।
- ৩. প্রমাণের মানদণ্ড (Standard of Proof):
- রাষ্ট্রপক্ষকে যেখানে খুনের অভিযোগ “সন্দেহাতীতভাবে” (Beyond all reasonable doubt) প্রমাণ করতে হয়, আসামির ক্ষেত্রে প্রমাণের মানদণ্ড ততটা কঠোর নয়।
- আসামীকে কেবল দেওয়ানি মামলার মতো সম্ভাবনার ভারসাম্য (Preponderance of probabilities) বা যুক্তিসঙ্গত সম্ভাব্যতা প্রমাণ করলেই চলবে।
৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স
১. দহিয়াবাঈ বনাম গুজরাট রাজ্য (AIR 1964 SC 1563): ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, ১০৫ ধারায় আসামির প্রমাণের দায় রাষ্ট্রপক্ষের মতো কঠোর নয়; আসামী যদি এমন সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে পারে যা তার মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের সৃষ্টি করে, তবে আসামী ৮৪ ধারার সুবিধা পাবে।
২. রাষ্ট্র বনাম মোহাম্মদ আলী (20 DLR 441): চিকিৎসাগত মানসিক ব্যাধি (Medical insanity) এবং আইনের চোখে অপ্রকৃতিস্থতা (Legal insanity) এক নয়; কাজের পরিণতি বোঝার অক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে।
৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত
অতএব আইনি সুস্পষ্ট অভিমত হলো: C-কে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত B-এর মানসিক অপ্রকৃতিস্থতা প্রমাণের সম্পূর্ণ সংবিধিবদ্ধ আইনি দায়িত্ব B-এর নিজের উপরই বর্তাবে (ধারা ১০৫, সাক্ষ্য আইন)। B-কে উপযুক্ত ডাক্তারি সাক্ষ্য, পূর্বের আচরণ ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের মাধ্যমে সম্ভাবনার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে আদালতকে সন্তুষ্ট করতে হবে।
🏛️ সম্পর্কিত প্রশ্নপত্র: এই প্রশ্নটি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষা ২০২৫-এর প্রশ্নপত্রে অন্তর্ভুক্ত। সম্পূর্ণ বিগত বছরের প্রশ্নব্যাংক দেখতে আমাদের মূল আর্কাইভে প্রবেশ করুন।

